ওড়িশার শীর্ষ মাওবাদী নেতা গ্রেপ্তার
মূলস্রোতে ফেরা স্ত্রীর আশা স্বামীও ফিরবে

সংবাদ সংস্থা   ১৯শে জুলাই , ২০১৪

ভুবনেশ্বর, ১৮ই জুলাই — মাওবাদী মোকাবিলায় বড়সড় সাফল্য পেল পুলিস। ওডিশার ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’, অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মাওবাদী নেতা সব্যসাচী পণ্ডাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিস। বহু খুন, অপহরণসহ ৬০টির বেশি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত পণ্ডার মাথার দাম ছিল পাঁচ লক্ষ টাকা। বৃহস্পতিবার রাতে গঞ্জাম জেলার বেরহামপুর থেকে পুলিস তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

সব্যসাচী পণ্ডার গ্রেপ্তার হওয়ার খবর শুক্রবার রাজ্য বিধানসভায় উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক মাওবাদীদের হিংসার পথ পরিহার করে মূলস্রোতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। মাওবাদী নেতার স্ত্রী শুভশ্রী পণ্ডার আশা, তাঁর স্বামী মূলস্রোতে ফিরবেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘আমি পুলিসের সঙ্গে সহযোগিতা করব’। এখন রানপুর-কেন্দ্রিক জনমঞ্চ ওডিশা’র সভানেত্রী শুভশ্রী ওরফে মিলিকে পুলিস ২০১০সালে গ্রেপ্তার করে সি পি আই (মাওবাদী)-র সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ। ২০১২সালে তিনি মুক্তি পান। মূলস্রোতের রাজনীতিতে ফেরেন। যোগ দেন অমা ওডিশা পার্টি (এ ও পি)-তে। এদিন পণ্ডা তাঁর স্বামীকে অবিলম্বে আদালতে তোলার দাবি জানান।

২০১২সালে সি পি আই (মাওবাদী) থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর সব্যসাচী পণ্ডা ওডিশা মাওবাদী পার্টি নামে একটি নতুন পার্টি গড়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যে, ১৯৯৫সালে রায়গড়া ও গজপতি জেলায় তৈরি হওয়া চাষী মুলিয়া সমিতি ও কুই লয়েঙ্গা সঙ্ঘের প্রাণপুরুষ তিনি। এইসব অঞ্চলে মাওবাদী নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিতে এই সংগঠনগুলিই ছিল মূল ভিত্তি। পট্টনায়েক আরও জানান, তিনি ছিলেন বংশধারা ও ঘুমুসুরের ওডিশা রাজ্য সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। ২০১২সাল পর্যন্ত, সি পি আই (মাওবাদী)-র ওডিশা রাজ্য সাংগঠনিক কমিটির সম্পাদক।

২০০৮সালে ওডিশার কন্ধমালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা স্বামী লক্ষণানন্দ সরস্বতী ও তাঁর চার শিষ্যকে হত্যাসহ দুই ইতালিয় পর্যটককে অপহরণ, অ্যাম্বুলেন্স উড়িয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে সব্যসাচী পণ্ডার বিরুদ্ধে। সেইসঙ্গেই রয়েছে ২৫জন নিরাপত্তাকর্মী ও ৩৪জন সাধারণ মানুষকে হত্যার অভিযোগ। জানান নবীন পট্টনায়েক। তিনি বলেন, পণ্ডাকে গ্রেপ্তারের জন্য ‘আমি নিশ্চিত সমস্ত পুলিসবাহিনী, বিশেষত গোয়েন্দা শাখা ও বেরহামপুর পুলিস যারা এই অভিযানে ছিল, তাদেরকে এই অধিবেশন অভিনন্দন জানাবে’।

পণ্ডার গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাকে বড়সড় সাফল্য বলে বর্ণনা করে রাজ্য পুলিসের ডিজি সঞ্জীব মারিক জানান, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বেরহামপুরে বড়বাজার এলাকার একটি বাড়ি থকে পুলিস তাঁকে গ্রেপ্তার করে। কোনও গুলি বিনিময় হয়নি। উদ্ধার করা হয়েছে একটি রিভলভার, নগদ ২লক্ষ টাকা, ৫০০গ্রাম সোনা, ১০টি মোবাইল ফোন, দু’টি হার্ড ডিস্ক এবং পাঁচটি পেনড্রাইভ। মারিক আরও জানান, পণ্ডার বিরুদ্ধে ৬১টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এরমধ্যে ২১টি রায়গড়া জেলায়, ২৫টি গজপতিতে, ৯টি নয়াগড়ে, ৩টি কন্ধমালে, ২টি গঞ্জামে এবং একটি বেরহামপুরে।

৪৮ বছর বয়সী সব্যসাচী পণ্ডার জন্ম খুরদা জেলার রানপুরে ময়ূরহালিয়া গ্রামের একটি রাজনৈতিক পরিবারে। দাদু মদন সুন্দর পণ্ডা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, ১২বছর কারান্তরালে ছিলেন এক শীর্ষ ব্রিটিশ কর্তাকে খুনের অভিযোগে। বাবা রমেশচন্দ্র পণ্ডা ছিলেন প্রথমে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি, পরে সি পি আই (এম)-র নেতা। ছিলেন রানপুর কেন্দ্রের বিধায়ক।

২০১২সালে বহিষ্কার হওয়া ওডিশার শীর্ষ মাওবাদী নেতা সব্যসাচী পণ্ডা বলেন, ‘খুনের রাজনীতি’ ও ‘সুবিধাবাদ’-কে মদত দিয়ে আসছে সি পি আই (মাওবাদী)। মাওবাদীদের ওডিশা রাজ্য সাংগঠনিক কমিটির সম্পাদক ছিলেন পণ্ডা। তাৎপর্যপূর্ণভাবেই আত্মসমর্পণ বা মূলধারার রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার কোনও ইঙ্গিত দেননি তিনি। বরং, কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমের কাছে পাঠানো অডিও বার্তায় জানিয়ে দেন ইতোমধ্যেই তিনি ওডিশা মাওবাদী পার্টি নামে একটি নতুন পার্টি গড়েছেন।

এর আগে পার্টির কাজে অসন্তোষ জানিয়ে পণ্ডা ১৬পাতার চিঠি পাঠিয়েছিলেন পার্টির সাধারণ সম্পাদক গণপতির কাছে। তাতে তিনি পার্টির বিরুদ্ধে ‘আদিবাসীবিরোধী, সংখ্যালঘুবিরোধী এবং জনবিরোধী নীতি নেওয়ার’ তীব্র সমালোচনা করেন। সেইসঙ্গেই পাঁচ মিনিটের ভিডিও বার্তায় বলেন, তাঁর একসময়ের দলের নেতারা কোনও ন্যায্য কারণ ছাড়াই খতম অভিযানে বিশ্বাস করেন। ‘তাঁরা হত্যা করেছেন সি আই টি ইউ, এস ইউ সি, সি পি আই (এম এল) কর্মী-সমর্থক, এমনকি সাধারণ মানুষকে পর্যন্ত। এবং কোনও রকম ন্যায্য কারণ ছাড়াই। আমি ছিলাম খুনের রাজনীতি ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে এমন কাজের বিরোধী।’

‘যে পার্টিতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নেই, যে পার্টি কাজ করে সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে, সেই পার্টিতে দাস হিসেবে আমরা থাকতে চাই না।’ বলেন সব্যসাচী পণ্ডা তাঁর অডিও বার্তায়। ১৬পাতার চিঠিতে পণ্ডা বলেন, ‘সন্ত্রাস ও আতঙ্ক তৈরি করে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন’ গণপতি ও শীর্ষনেতারা। অডিওবার্তায় তিনি আরও জানান, বেসরকারী উদ্যোগের থেকে টাকা না তোলার জন্য পার্টির সিদ্ধান্ত থাকলেও, মাওবাদীরা প্রায়ই বিপুল অঙ্কের টাকা তুলত কর্পোরেটদের কাছ থেকে, যারা শিল্পের জন্য বিরাট সংখ্যার মানুষকে তাঁদের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করত। ‘এগুলি হল পার্টির জনবিরোধী এবং সঙ্কীর্ণ রাজনীতি, যা আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এবং শেষে আমরা পার্টি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ অডিও বার্তায় পণ্ডা এও জানিয়েছেন, গত বছর নভেম্বর মাসে এই ভুল কাজগুলি নিয়ে তিনি পার্টিকে সতর্ক করেছিলেন। পরিণতিতে তাঁকে তিনমাসের জন্য ‘পার্টির নজরবন্দী’তে রাখা হয়। সেইসঙ্গেই জানান তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা গঞ্জাম, গজাপতি, রায়াগড়া, কন্ধমাল জেলায় গরিব ও শোষিত মানুষের জন্য কাজ করে যাবেন। যা তাঁরা করে চলেছেন ১৯৯৫সাল থেকে।

এদিকে ছত্তিশগড়ে পুলিস ও নিরাপত্তাবাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে ৬জন মাওবাদীকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রত্যেকেরই মাথার দাম ঘোষণা করেছিল পুলিস। গ্রেপ্তার হওয়া ৬ মাওবাদী নেতা হলেন কার্জু, সোমনাথ, রতিরাম, রাইজু, রঞ্জু এবং রাজমন।