ইমরানের পর এবার ডাক পড়বে কে ডি সিংয়ের

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৩ই সেপ্টেম্বর , ২০১৪

নয়াদিল্লি, ১২ই সেপ্টেম্বর- তৃণমূল কংগ্রেসের আরো দুই সাংসদ সি বি আই এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের তদন্তের বৃত্তে পড়েছেন। রাজ্যসভার এই দুই সদস্যকে জেরায় ডাকা হবে এবং যথেষ্ট তথ্য কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের হাতে আছে বলে খবর। আহমদ হাসান ইমরানকে ইতোমধ্যেই এক দফায় জেরা করেছে ই ডি। এবার সারদা তদন্তের সূত্রেই তৃণমূল কংগ্রেসের আরেক সাংসদ কে ডি সিংকে ডাকা হতে পারে। কে ডি সিং নিজেই অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে চিট ফান্ডের মালিক। তাঁর অ্যালকেমিস্ট সংস্থা নিয়ে বহু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহেই অ্যালকেমিস্ট হোল্ডিংসের লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। এর মধ্যেই ই ডি এবং সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অফিস (এস এফ আই ও) সারদার টাকা অন্যত্র বিনিয়োগের সূত্র সন্ধান করতে গিয়ে ফের কে ডি সিংয়ের যোগাযোগের সংবাদ পেয়েছে।

ইমরান এবং কে ডি সিং উভয়ের ক্ষেত্রেই সারদার টাকা বিদেশে চালানের অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবারই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সাংবাদিক সম্মেলনে ইমরানের মাধ্যমে চিট ফান্ডের অর্থ প্রতিবেশী দেশে চালানের প্রসঙ্গ ওঠে। রাজনাথ বলেন, আইনী পদ্ধতিতেই যা ব্যবস্থা নেবার নেওয়া হবে।

গোয়েন্দারা তথ্য পাচ্ছিলেন, সীমান্তের চোরাপথ পেরিয়ে সারদার বিপুল অঙ্কের অর্থ এসেছে বাংলাদেশের মৌলবাদী সংগঠন জামাতের হাতে। এই যোগাযোগের মুখ্য সূত্র বলেই ইমরানের নাম উঠেছে। ইমরান আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিষিদ্ধ স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অব ইন্ডিয়া (সিমি)-র সঙ্গে যুক্ত হন। সিমি তখন তাঁকে দেয় সংগঠনের পশ্চিমবঙ্গ শাখার দায়িত্ব। এছাড়া তিনি জামাতে ইসলামী হিন্দ’র গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্টের যোগাযোগ ছিল ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের (আই ডি বি) সঙ্গে। আবুধাবি-কেন্দ্রিক আই ডি বি’র পক্ষে ভারতের পূর্বাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন ইমরান। ব্যাঙ্কের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, বাংলাদেশে জামাতের শীর্ষনেতা গোলাম আজমের ছেলে মামুল আল আজমের সঙ্গে রয়েছে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। বাংলাদেশের জামাত ঘনিষ্ঠ ‘নয়া দিগন্ত’ পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেছেন ইমরান।

ইডি সূত্রের খবর, ২০১০সালে ‘আজাদ হিন্দ’ নামে একটি উর্দু পত্রিকা এবং ২০১২সালে ‘কলম’ নামে একটি বাংলা পত্রিকা কেনেন সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেন। সেই দু’টি পত্রিকারই সম্পাদক ছিলেন ইমরান। বস্তুত, ১৯৮১-তে দরগা রোডে কলম নামে একটি সাময়িক পত্রিকা চালু করেন ইমরান। পরে ১৯৯৮তে সেখান থেকে উঠে আসেন ইলিয়ট রোডে। দরগা রোডের অফিস তখন ছিল সিমির ‘গেস্ট হাউস’। পরে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হন। সারদা বন্ধ হওয়ার সময় কলমের অ্যাকাউন্টে ছিল কয়েক লক্ষ টাকা। তদন্তকারীরা জেনেছেন, সারদা কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরে তৃণমূলের এক প্রভাবশালী শীর্ষ নেতার মধ্যস্থতায় ইমরানই ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন গড়ে কাগজ চালাতে থাকেন। বাংলাদেশে অর্থ চালানের এই অভিযোগের ভিন্নতর মাত্রা আছে বুঝেই গভীরে গিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে ই ডি এবং সি বি আই। ইমরান নিজে অবশ্য এই যোগাযোগের কথা অস্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে, সারদা-জামাত যোগাযোগের খবরে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে বাংলাদেশে। ঢাকার খবর, সেখানেও সংবাদমাধ্যমে এই খবর প্রকাশিত হওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে আওয়ামি লিগ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা শুক্রবার বলেছেন, ভারত আমাদের সুপ্রতিবেশী এবং বন্ধুরাষ্ট্র। ভারতের বিরুদ্ধে যারা বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে চেয়েছে, আমরা তাদের নস্যাৎ করেছি। এখন ভারত থেকে যারা টাকা দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা-বিরোধী মৌলবাদী সন্ত্রাসবাদী জামাতকে সহযোগিতা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ভারত সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। আওয়ামি লিগের কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্য খায়রুজ্জামান লিটন দাবি করেছেন, খুব দ্রুত এই বিষয়টি তদন্তের জন্য বাংলাদেশ সরকারেরও উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র কামরুজ্জামান বলেছেন, যারা এই মৌলবাদী শক্তিকে টাকা দিচ্ছেন বা দিয়েছেন, তারা অশুভ শক্তি। তিনি দুই দেশের পক্ষ থেকেই তদন্ত করার দাবি তোলেন।

এদিকে, মমতা ব্যানার্জির খুবই আস্থাভাজন এবং উত্তর ভারতে তৃণমূলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা কে ডি সিংয়ের সারদা-যোগাযোগের সূত্র সন্ধান হয়েছে মধ্য প্রাচ্যে সারদার টাকা চালানকে ঘিরে। হাওলা পথে সারদার টাকা সংযুক্ত আরব আমীরশাহীতে গচ্ছিত হয়েছে বলে খবর। এস এফ আই ও সূত্র জানিয়েছে, একটি বড় অর্থলগ্নী সংস্থায় সারদার টাকা জমা করা হয়েছিল। আল মাসাহ ক্যাপিটাল লিমিটেড নামে ওই সংস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিলো কে ডি সিংয়ের। এক সময়ে তিনি ওই সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যানও ছিলেন। সারদার এই টাকা চালানে কে ডি সিং ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের শীর্ষ মহলের আরও কেউ জড়িত বলে ধারণা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার।

কে ডি সিং নিজেই বেআইনী ভাবে আমানত সংগ্রহের অভিযোগে অভিযুক্ত। এক বছর আগেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি অ্যালকেমিস্ট হোল্ডিংসের অর্থ সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে বাজার থেকে অন্তত ৪০০কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছিল। তা ছাড়াও, অ্যালকেমিস্ট ইনফ্রা রিয়ালটি লিমিটেডও ১হাজার কোটি টাকার বেশি সংগ্রহ করেছিল। যদিও সেবির কাছে অ্যালকেমিস্ট ইনফ্রা দাবি করে তারা অ্যালকেমিস্ট গোষ্ঠীর অংশ নয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তদন্তের পরে গত ২০শে আগস্ট অ্যালকেমিস্ট সংস্থার অর্থ লগ্নীর রেজিস্ট্রেশনই বাতিল করে দিয়েছে। নন ব্যাঙ্কিং অর্থলগ্নী সংস্থা হিসাবে বেআইনী ভাবে টাকা তোলার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হওয়ায় এই ব্যবস্থা নেয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক।

রাজধানীর রাজনৈতিক মহলে কে ডি সিংয়ের সাম্প্রতিক গতিবিধি নিয়েও গুঞ্জন রয়েছে। দলের হয়ে বি জে পি-র সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার কাজ তিনিই করছেন বলে খবর। নতুন সরকার আসার পরে সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠিত হয়েছে। বিস্ময়কর ভাবেই তৃণমূলের যে দুই সাংসদকে সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে কে ডি সিং তাঁদের একজন। অন্যজন দীনেশ দ্বিবেদী। দলেরই অনেক অভিজ্ঞ ও বেশি সময়ের সাংসদদের বাদ দিয়ে কে ডি সিংকে ভূতল পরিবহন দপ্তরের সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান করার পিছনে বি জে পি-ঘনিষ্ঠতাই কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিমান পরিবহন এই মন্ত্রকেরই অধীন এবং কে ডি সিংয়ের বিমান পরিবহনের ব্যবসাও রয়েছে।

শুক্রবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনে প্রতিবেশী দেশে চিট ফান্ডের টাকা চালানে ইমরানের যোগাযোগের প্রশ্ন উঠেছিল। রাজনাথ বলেন, আইনী পথেই যা ব্যবস্থা নেবার নেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গে সি বি আই তদন্তে কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে কিনা, এই প্রশ্নে রাজনাথ বলেন, আগের সরকারের সময়ে এই প্রশ্ন হয়তো প্রাসঙ্গিক ছিলো। এখন নয়। এই সরকার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement