মাদুরদহ সত্যবৃত্তি বিদ্যাালয়

  ২২শে আগস্ট , ২০১৬

‘‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে/ মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ ...’’ বহুশ্রুত রবীন্দ্রগানখানি যখন সমবেত শিশুকণ্ঠে ধ্বনিত হয় তখন রোটারি সদনের উপস্থিত শ্রোতাদের হৃদয়ে সুর ও বাণীর আশ্চর্য মেলবন্ধনে ঢেউ তোলে। উপলক্ষ—দক্ষিণী প্রয়াসের শিক্ষাবিভাগ ‘মাদুরদহ সত্যবৃত্তি বিদ্যারলয়ে’র চতুর্দশ বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান। প্রদীপ জ্বালিয়ে উদ্বোধন করেন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি তাপস দত্ত, প্রধানশিক্ষিকা অনুভূতি প্রকাশ এবং প্রধান অতিথি ইউ এস কনসাল জেনারেলের স্ত্রী রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মেরিয়াঙ হল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে গানে অংশ নিলেন মেরিয়াঙ হল। চোদ্দবছর আগে সমাজসেবী নলিনী মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে মাদুরদহ গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে যে শিক্ষাদানের প্রয়াস শুরু হয়েছিল আজ চোদ্দ বছর পর ৪০০জন ছাত্রছাত্রী, ৪০জন শিক্ষিকা ও ১০জন শিক্ষাকর্মীর এবং বহু শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রচেষ্টায় বিদ্যালয় আজ প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে। সরকারি শিক্ষাসংসদের অনুমোদিত এই বিদ্যালয়। এখানে নিখরচায় ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনা, বইপত্র, পোশাক, পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা আছে। পড়ুয়াদের মানসিক বিকাশে খেলাধুলা, নাটক, গান, নাচ, স্বাস্থ্যচর্চা সব একই সাথে চলে নিয়মিত ও ধারাবাহিক।

বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে ‘নবরস’ নামে নৃত্য আলেখ্য প্রযোজনাটি ভাবনা ও প্রয়োগে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শিশু জন্মাবার পর মায়ের সঙ্গে তার নিবিড়তা, কান্না-হাসি দোলদোলানির মধ্যে শিশুর বেড়ে ওঠা পর্যন্ত কালপর্বের কিছু অনুভূতি-ভঙ্গিমাকে নয়টি রসের আধারে ভাষ্যে-গানে ও নাচের মাধ্যমে উপস্থাপিত হলো বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে। তারিফ করার মতো। তবে আরো চর্চা এবং অনুশীলন দাবি করে। দক্ষিণী প্রয়াসের এই উদ্যোগ চোদ্দ থেকে আরো অনেক চোদ্দর দিকে এগিয়ে চলুক শুভাকাঙ্ক্ষীর পরশে।

শুধু চায়ের জন্য...

শ্রাবণের এক মেঘ-ভার সন্ধেটা অন্যরকম ভাবে পাওয়া গেলো। গল্পে-আড্ডায়-স্মৃতিকথায় ওঠে এলো ‘চা-কথা’। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের রহস্য-গল্পে ধূমায়িত চা, কিংবা রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের লেখায় চা, অথবা ‘চা’ আতিথেয়তায় শম্ভু মিত্র— সবই উঠে এলো। দক্ষিণ কলকাতার গোলপার্কের ‘ফার্স্ট ফ্লাস’ চা-বারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী আসরে ছিলেন চা-সেলিব্রিটিরা! যাঁদের সৃষ্টির পরতে-পরতে দরকার ‘ধূমায়িত চা’। ছিলেন সংগীতশিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায়, সিধু, অভিনেতা রোহন ও আরও অনেকে। এই নজর-কাড়া পরিবেশে তাঁরাই শোনালেন চায়ের জন্য জীবনের কথা। বাঙালির অন্দরমহল থেকে বহির্মহল পর্যন্ত চায়ের অপরিহার্যতার কথা-ই বার বার উচ্চারিত হলো বিশিষ্টদের কথায়। তবে অভিনেতা রোহন ‘চা’ পান না-করলেও বললেন, আর ক’দিন পর দার্জিলিঙ-এ শুটিং-এ যাচ্ছি তাই একবার চায়ে চুমুক দেবই। কেন? পরখ করব চায়ের ‘ফার্স্ট ফ্লাস’-প্রেম। বলতে কি, কলকাতায় হয়তো শুধু চা-বার হাতে গোনা। সেটা আবার দক্ষিণ কলকাতায়ই। ফের গোলপার্কের একটি বিখ্যাত বিরিয়ানির দোকানের কাছেই পাশের গলিতে হলো ‘ফার্স্ট ফ্লাস’ নামে চা-বার। এখানে মিলবে শুধু লাল চা। ভিন্ন স্বাদের। সবই দার্জিলিঙের। চাইলে পছন্দের চা পাতা কিনতে পারবেন। চা-বার বললে ভুল বলা হবে, রয়েছে লাইব্রেরি। চা পান করতে করতে হাতে তুলে নিতে পারবেন বই ও সাহিত্য পত্রিকা। আছে বই বিপণির ব্যবস্থাও। খুঁজে নিতে পারবেন মনের মতো বই। সাম্প্রতিক পত্র-পত্রিকাও। দেওয়াল জুড়ে প্রায় ৪৬টি মন-কাড়া রঙিন এবং সাদা-কালো ছবি। এখানেও মিলবে চা-বাগান রোমাঞ্চকর সব ছবি। রয়েছে হাতে তৈরি জুয়েলারি জিনিস। সব মিলিয়ে অন্যরকম চা-বার। উদ্যোক্তা তাপসী বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভশিস মৈত্র সংযোজন করে বললেন, শুধু চা নয়, এখানে পাবেন মনের মতো ‘টা’-ও।

খরচ বাঁচিয়ে

উৎসব বলতে সাধারণত সামাজিক, ধর্মীয় এবং ঐতিহ্যগত প্রেক্ষাপটে পালিত আনন্দ অনুষ্ঠানকে বোঝায়, তা আমরা সব্বাই জানি। বাংলায় প্রচলিত লোকায়ত উৎসবের মধ্যে রয়েছে পয়লা বৈশাখ, চৈত্র সংক্রান্তি, নবান্ন, পৌষ মেলা ইত্যাদি। মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে রয়েছে ইদলফেতর ও ইদুজ্জোহা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বার্ষিক উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে আনন্দদায়ক উৎসব হচ্ছে শরৎকালীন শারদীয় উৎসব। এই উৎসবে আপামর সকলেই মেতে ওঠেন। ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ নেই। অন্তত মনের দিক থেকে। কিন্তু যাঁরা আঁধারে রয়েছেন, তাঁদের কথা কে ভাবে? হ্যাঁ, ভেবেছে বেহালার এস বি পার্ক সর্বজনীন। সারা বছরের নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড তো রয়েছেই। তবে এবার অন্য একটি ভাবনা তাদের নাড়া দিয়েছে। উৎসবের খরচ বাঁচিয়ে এবার আঁধারে-থাকা মাদকাসক্তদের জন্য কিছু করা।

কী করবে? এমনই প্রশ্ন ছিলো উদ্যোক্তাদের কাছে। বললেন, ড্রাগ অ্যাডিক্টটেডদের আমরা খুঁজে বার করে তাদের পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে কথা বলে নিয়ে যাবো পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সেখানে তাদের চিকিৎসা করাবো। এই মারণ নেশা থেকে মু্ক্তির পথ দেখিয়ে ফিরিয়ে দেবো জীবনের মূল স্রোতে। এ উপলক্ষে একটি থিম সঙও প্রকাশিত হয়েছে। গেয়েছেন গীতিকার-সুরকার-শিল্পী নীপবীথি ঘোষ এবং তাঁর সহশিল্পীরা। আর মৃৎশিল্পী ভবতোষ সুতারের হাতের ছোঁয়ায় পাওয়া যাবে এক বার্তা। যে বার্তায় মানুষ হয়ে মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করবে বেহালার মানুষ। তাঁদের এই উদ্যোগে সাধুবাদ জানিয়েছেন সি এ বি এ-র কোষাধ্যক্ষ বিশ্বরূপ দে-র মতো বিশিষ্টরা।

কোরক

বরাবরই একটু অন্যধরনের সাহিত্যচর্চার আগ্রহী কোরক সাহিত্য পত্রিকা। প্রাক্‌ শারদ সংখ্যার বিষয়ে সেই অভিনবত্ব ধরা পড়েছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবারের ভাবনার বিষয়। এবং এই মানুষের তথাকথিত যে সে মানুষ নন বরং সেইসব মানুষ যাঁদের নাম শুনতে হৃদয়ে সম্ভ্রম জাগে। তুফান তোলে মনজগতে। যদি জিজ্ঞাসা করা যায় কেমন ছিল রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের মধ্যকার সম্পর্ক? দুই বিপরীত মুখী মানুষ হলেও জগত সংসারে এঁদের অবদান ভোলার নয়। আমরা অনেকেই খবর রাখি বা রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্রর বন্ধুত্ব যেমন নিখাত ভালবাসায় গড়া, তেমনি রবীন্দ্রনাথ-দ্বিজেন্দ্রলালের সম্পর্ক ছিল অনেকটাই একটি বড় ফাটলের ইতিহাস। আবার রবীন্দ্রনাথ ও চিত্তরঞ্জনের সম্পর্ক ছিল রৌদ্র-মেঘের লুকোচুরি খেলার মতন। একই সময়ে কাছাকাছি বসবাস করলেও রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দের পারস্পরিক সাক্ষাৎকার কেন হয়ে উঠলে না সেঠাও ভাবনার বিষয়। এসবের পাশাপাশি সম্পাদক তাপস ভৌমিক উল্লেখ করেছেন সম্পর্ক মানে মৈত্রী, বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সংযোগ বা টানাপোড়েন। একটা সময়ে একজনের সঙ্গে আর একজনের মানসিক ঐক্য তৈরি হয়, নিজেদের ভিতরে আকর্ষণ অনুভূত হয়, গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। সেই বন্ধুত্বের মেয়াদ দীর্ঘদিন, আমৃত্যু থাকতে পারে, আবার কখনো-বা সামান্য মতান্তরে বৈরিতায় পৌঁছে যায়, তেমনই পারস্পরিক মতান্তর বা মনান্তরের ইতিহাসও কম নেই। মানব হিতৈষী ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে এমনই কিছু সম্পর্কের কথা কোরকের পাতায় পাতায়।

কোরক খুঁজবার চেষ্টা করেছে রামমোহন-দ্বারকানাথ ঠাকুর, মধুসূদন-গৌরদাস বসাক, রামমোহন-ডিরোজিও, জলধর সেন-কাঙাল হরিনাথ, বিদ্যাসাগর-শম্ভুচন্দ, আশুতোষ-রামানন্দ, রামকৃষ্ণ-গিরিশ-বিনোদিনী, উপেন্দ্রকিশোর-যোগীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম-শরৎ, প্রমথ চৌধুরি-ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত-বীরবল, প্রফুল্লচন্দ্র-রাজশেখর, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ-সত্যেন বসু-মেঘনাদ সাহা, জগদীশচন্দ্র-অবলা বসু-নিবেদিতা, বুদ্ধদেব-জীবনানন্দ, দেবব্রত-সুচিত্রা, সুকান্ত-অরুনাচল, গান্ধীজী-সুভাষচন্দ্র, অন্নদাশঙ্কর-মণীন্দ্রলাল-অচিন্ত্যকুমার, বিষ্ণু দে ও তাঁর তিন বন্ধু সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, যামিনী রায় ও জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র আর একই অঙ্গে দুই রূপ সমরেশ বসু-কালকূট —এদের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক। যে সম্পর্ক বাংলা সাহিত্যে অমূল্য রতন উপহার দিয়েছে। ছাত্রর সঙ্গে শিক্ষকের যেমন সম্পর্ক হওয়া উচিত ঠিক তেমনই লেখক ও পাঠকের মধ্যেকার সম্পর্ক নিবিড় না হলে সাহিত্যের কদর করবার মানুষের খামতি থেকে যাবে। এই বিশ্বাস থেকে সম্পাদক প্রাক্‌ শারদ সংখ্যাটি পাঠকের দরবারে তুলে দিয়েছেন। যেমন কোরক হাতে নিলেই জানতে ইচ্ছে করবে ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং আচার্য সুকুমার সেনের সম্পর্ক কেমন ছিল? এমন হরেক প্রশ্ন মনের মাঝে উদয় হবে।



চিরন্তন

সাগর ঘোষ, শিবনাথ সিংহ, সানি সিং, আকাশ পাইন, রোহিত দাস, সার্থক ভৌমিক, দেবাশিস মণ্ডল। এরা সহায় সম্বলহীন। মা-বাপ-হারা। এদের কারুর বাড়ি নলপুর, সুভাষগ্রাম, ক্যানিং, যাদবপুর, নৈহাটি। অভিভাবক বলতে তেমন কেউ নেই। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় স্থান হয়েছে মধ্য কলকাতার বৌবাজার এলাকার একটি অনাথ আশ্রমে। দ্য রিফিউজি’তে। শুধু এরা নয়, এদের মতো অনেক অসহায় মেয়েরাও আছে এই এখানে। এদের সংখ্যা ৩০০। শ্রাবণের বর্ষণস্নাত শেষ বিকেলে এদের হাতে রাখি পরিয়ে দিলো বেস্ট ফ্রেন্ডস সোসাইটির উদ্যোক্তারা। রাজীব লোধা, সগুফ্‌তা, সহেলী, আনন্দ্‌ এরাই পরিয়ে দিলো প্রীতির রাখি। সঙ্গে প্রত্যেককে এক বাক্স খাবার। অপরিচ্ছন্ন মুখেও খুশির ঝলক মিললো মিলিয়ে-যাওয়া আলোয়। বছরভর এই বিশেষ দিনগুলোর জন্য হা-পিত্যেশ হয়ে উড়ো পথের দিকে চেয়ে থাকে এই অসহায় মুখগুলো। শুধু রাখি নয়, শারদোৎসবেও মেতে ওঠে ওরা। পায় নতুন পোশাক। বসন্ত উৎসবেও হাজির হয় বেস্ট বেস্ট ফ্রেন্ডস সোসাইটি। এদের পাশে থাকে। রেঙে ওঠে রঙের উৎসব। সবার রঙে রঙ মেশাতে মেশাতে সক্কলে গেয়ে ওঠে রবীন্দ্র-গান। দখিন দুয়ারে ওড়ে ফাগ। রাখির আনন্দই-বা কীসের কম? কেন এই উৎসব শোনালো ছোট্টরাও। তাদের শিখিয়েছে দিদিমণি-মাস্টাররা। ওদের মুখেও ফেরে রবীন্দ্রনাথ। বঙ্গভঙ্গ এবং রাখিবন্ধন। বেশ ভালো লাগে। এই ভালো লাগা তো চিরন্তন।

সমকালের সময়োচিত ভাবনা

কবিতা-আবৃত্তি-গল্প-কথা-আলাপচারিতায় একটি বৈঠকী আড্ডা—এ এক অভিনব পরিকল্পনা। সমকাল এভাবেই সমগ্র অনুষ্ঠানটি সাজিয়েছিল। বাচিল শিল্পের নবীন-প্রবীন শিল্পীদের নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দিবসে বাংলা আকাদেমি সভাঘর ছিল উজ্জ্বল আলোকমালায় অভিষিক্ত। আলো জ্বেলে গেলেন বিপ্লব চক্রবর্তী, বহ্ণিশিখা গোস্বামী, সৌমেন চট্টোপাধ্যায় (বহরমপুর), নিবেদিতা গঙ্গোপাধ্যায়, মলয় পোদ্দার, শ্রাবণী চক্রবর্তী (চিত্তরঞ্জন), সোমনাথ দে, চায়না চট্টোপাধ্যায় (কোচবিহার), নরেশ নন্দী, অনন্যা চক্রবর্তী। বিখ্যাত বাচিকশিল্পীদের মাঝে বসে নবীন বাচিকশিল্পীরা আড্ডা দেবেন কবিতা-আবৃত্তি শিল্পের বর্তমান ভবিষ্যৎ নিয়ে। প্রবীণেরা কখনো আবৃত্তি শুনতে চাইবেন, কখনও বা আবৃত্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে মতামত বিনিময় করবেন। আবৃত্তি পরিবেশন কিভাবে করলে সকলের হৃদয় স্পর্শ করা যায় হাতে কলমে পাঠ গ্রহণ করলেন। হাসি মজা ঠাট্টা আবার সিরিয়াস আবৃত্তি করার আগে শ্রোতাদের মনের দরজা কিভাবে খুলতে হবে তা নিয়েও ছিল মনোজ্ঞ বিশ্লেষণ। বাসুদেব নন্দীর ভাবনা পরিকল্পনায় সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দেবলীনা ভট্টাচার্য।

শিল্প সৃজনে গণনাট্য

‘গণনাট্য’ শব্দটি শুনলেই শরীর মনে এক ধরণের শিহরণ খেলে যায়। প্রগতি সংস্কৃতি আন্দোলনে গণনাট্যের ভূমিকাকে অস্বীকার করার একটা প্রবণতা ইদানিং তথাকথিত সংস্কৃতিকর্মীদের ফ্যাসান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ, পশ্চিমবঙ্গ-এর বিরুদ্ধে লড়াই করেই সমাজ সংস্কৃতির বহমান ধারাকে সমাজ প্রগতির লক্ষ্যে উত্তরণ ঘটাতে সচেষ্ট রয়েছে। শহর কলকাতায় একই কাজে ব্রতী গণনাট্য। এবার সংগঠনের চতুর্দশ সম্মেলনকে সফল করে তুলতে সম্প্রতি সরশুনা উচ্চ বিদ্যালয়ে এলাকার প্রগতি ও সংস্কৃতি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের নিয়ে কনভেনশনের মধ্য দিয়ে অভ্যর্থনা সমিতি গঠন করা হয়। নির্মল মুখোপাধ্যায়, প্রভাত ঘোষ ও মৃণাল চক্রবর্তী যথাক্রমে সভাপতি, সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন।

কনভেনশনে কলকাতা জেলার সম্পাদক পীযূষ সরকার বলেন আমরা এক ভয়ঙ্কর ক্রুর সময়ের মধ্যে আছি। দেশে গৈরিকীকরণের দাপট, সাম্প্রদায়িকতার বিপদ এক ভিন্নমাত্রা নিয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি-মূল্যবোধের প্রটিটি উপাদানকে ধ্বংস করা, মুক্ত চিন্তা, স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার হরণ করার ষড়যন্ত্র চলছে। এর বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ সৃজন-প্রযোজনা নিয়ে মানুষের দরবারে হাজির হচ্ছে। রাজ্য সম্পাদক গোরা ঘোষ বলেন বিগত তিয়াত্তর বছর ধরেই গণনাট্য সাধারণ মানুষের স্বপ্ন-সাহস-সাধকে ধারাবাহিকভাবে মানুষের সামনে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মননে গ্রগতিশীল ভাবনাকে গঁথে দিত নিরলস পরিশ্রম করে চলেছে। কিনও শক্তিই এই পথচলাকে স্তব্ধ করতে পারবে না। এছাড়া বক্তব্য রাখেন নির্মল মুখোপাধ্যায়, কৌস্তভ চট্টোপাধ্যায়, বেণু চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। আগামী পঁচিশে সেপ্টেম্বর সংগঠনের জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলন শেষে সাংস্কৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে। গণনাট্য উন্মেষ শাখা সম্মেলনকে সামনে রেখে সরশুনা অঞ্চলে বেশকিছু প্রচার অনুষ্ঠানে শামিল হবে। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে কলকাতা জেলা কমিটি রাণুচ্ছায়া মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে। সম্মেলন প্রাঙ্গণে প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী চিত্তপ্রসাদের জন্মশতবর্ষে বিশেষ প্রদর্শনী হবে।



পলিশেডে চাষ

মাঠ জুড়েই পলিশেডে চাষবাস। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকরা এই কাজে এগিয়ে চলেছেন। নিজেদের উদ্ভাবনী চিন্তা ভাবনার ফসল এই পলিশেড নির্মাণ। প্রায় বছর কুড়ি আগে হুগলীর সিঙ্গুর ব্লকের মির্জাপুর গ্রামের এক – দু’জন কৃষক পলিশেড তৈরি করেন জমিতে। আর এই শেডের নিচে শুরু করেন চাষবাস। বিশেষ করে ভরা বর্ষায় জলদি কপির চারা তৈরি করেন পলিশেডে। এভাবেই নিজেদের জমিতে জলদি কপির চাষ বাড়াতে থাকেন। এই পদ্ধতিতে আসে যথেষ্ট সাফল্য। গ্রাম বাংলায় একটি প্রবচন আছে — পাশাপাশি বাস লাগালাগি চাষ। তা দেখেই পাশাপাশি পলিশেডে চাষবাসের আগ্রহ বাড়তে থাকে। এখন গোটা মাঠেই ছড়িয়ে পড়েছে সাদা পলিথিনের ছাউনিযুক্ত পলিশেডে। সেখানে চলছে জলদি ফুলকপির বীজতলা তৈরির ব্যস্ততা। ইতিমধ্যেই চারা তুলে মূল জমিতে রোপণের কাজও চলছে। যা শারদোৎসবের আগেই বাজারে আসবে। বহু কৃষকই এভাবে পলিশেড বানিয়ে চাষবাস করছেন। এই মাঠের কৃষক দিবাকর গরাং ও বাপন কোলে জানালেন, প্রবল বৃষ্টির ঝাপটা থেকে কপিচারা রক্ষা পায়। বৃষ্টির জলের তোড়ে গোড়ার মাটি ক্ষয়ে যাওয়ার কোন সম্ভবনা থাকেনা। ফলে ভরা বর্ষার হাত থেকে চারা অক্ষত – অটুট থাকে। কোন ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হয় না। এই সময়কালে এখানে পর্যাপ্ত চারা তৈরির ফলে পাশের ব্লকগুলির কৃষকরা এখান থেকে চারা কিনে নিয়ে গিয়ে চাষ করছেন। এছাড়াও এই পলিশেডের ছাউনিতে বর্ষাকালে পালং, মূলো, ধনেপাতা ও গাছ পেঁয়াজসহ রকমারি সবজি চাষ করে নজর কেড়েছেন গোরাচাঁদ কোলে। এইভাবে পলিশেডে চাষ করে আয়ের পথও বাড়িয়েছেন কৃষকরা।

উত্তর গ্রাম চরিত

নদীর নাম মেচি। তীরে বসবাসকারী মানুষজনের সমষ্টিগত নাম মেচ। ব্রাত্য তাঁরা দীর্ঘদিনের। বাংলার উত্তরাঞ্চলে বহুকালধরে নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে ভালোই আছেন দেশি, পলি, মেচ, রাভা, টোটো, রাজবংশীরা। তাঁদের সংস্কৃতি বর্জিত নয়। উত্তরাঞ্চলে এঁদের লোকভাষা বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ তথাপি সর্বজনীন। সমাজাশ্রিত গণ্ডিবদ্ধতা আছে, আছে বিশ্বজনীন লোকসংস্কৃতি। মেচ জনগোষ্ঠীর জীবনবৃত্তে নৃত্যের স্থান অনন্য। উৎসবে আচার-অনুষ্ঠানে এদের নৃত্য লালিত্য, আবেগ, নান্দনিক ঐশ্বর্য কৃতিত্বের দাবি করতেই পারে, তবু এঁরা উপেক্ষিত। একথা আমরা জেনেছি শিশির মজুমদারের ‘উত্তর গ্রাম চরিত’ গ্রন্থ থেকে। উত্তর গ্রাম চরিতের দুটি ভাগ ‘বারোমাসিয়া’ ও ‘পাশোমি’। বারোমাসিয়াতে লেখকের কষ্টকল্পিত অবদান উত্তরবঙ্গের অবিভক্ত পশ্চিম দিনাজপুরের ব্রত, আচার, পুজো-পার্বন-মেলা ইত্যাদির কথা। উত্তরবঙ্গের লোকসমাজের বারোমাসের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা। বৈচিত্রময় জীবনযাপনের সুস্পষ্ট ছবি। পাশোসিতে আছে বিবিধবিষয়ের বিচিত্র বিবরণ। মানুষ ভ্রমণের যান স্বল্প সময়ের জন্য, প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখেন, গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, বাক্য বিনিময় হয় টুকিটাকি, তারপরই চলে আসেন। উত্তর গ্রাম চরিতের লেখক মাঝে মাঝে দু-একবার ওপাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে গিয়েই চলে আসেননি। মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। গ্রামের মানুষের সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন করেছেন। উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা না হয়েও বাংলা সাহিত্যের অনালোচিত, স্বল্পালোচিত বিষয় বস্তুর আকার আয়তন তথ্যের সম্ভারে বিন্যাস করেছেন। সম্প্রতি কলকাতা প্রেস ক্লাবে পারুল প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটির আনুষ্টানিক প্রকাশ অনুষ্ঠানে লেখকসহ বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন।

ভবিষ্যতের ‘দিশা’

আর পাঁচটা মেয়ের মতো স্বপ্ন দেখেছিলো নন্দিনী সরকার। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে থাকবে। পৃথা দাস ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে আশ্রয় পেয়েছিলো মাসির বাড়ি। কিন্তু সেখানে জুটেছিলো লাঞ্ছনা। শম্পা হাজরার বাবা গত বারোবছর ধরে শয্যাশায়ী। একই অসহায় অবস্থা সোনম গুপ্তারও। নন্দিনীর কোনও সন্তান না-হওয়ায় শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে ফের আশ্রয় বাপের বাড়িতে। এদের মতো আরও কুড়িজন অসহায়কে খুঁজে বার করে বাগুইআটির চার্নক হাসপাতালের উদ্যোক্তারা। তাঁদের উদ্যোগেই নিয়ে আসা হয় চার্নক হেল্‌থ কেয়ার ইনস্টিটিউটে। এখানেই ‘দিশা’র ব্যবস্থাপনায় এই অসহায়দের নিখরচায় টানা এক বছর ধরে ‘হেল্‌থ কেয়ার’ সহযোগী হিসেবে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কারণ? ওরা আগামীদিনে স্বনির্ভর হয়ে শুধু নিজের জন্য নয়, কেউ সংসারের হাল ধরবে, কেউ বাবার চিকিৎসার জন্য, কেউবা ভাইকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবে। হ্যাঁ, তাঁদের ইচ্ছে পূরণ হলো গত শনিবার দুপুরে। চার্নকের উদ্যোক্তারা তাঁদের শুধু প্রশিক্ষণ-ই দিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে দেয়নি, হতে ধরিয়ে দিলো এই হাসপাতালের ‘হেল্‌থ কেয়ার’ সহযোগীর নিযোগপত্র। ঐদিন ওদের চোখে-মুখে শুধু খুশির ঝিলিক নয়, যেন নতুন করে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাওয়া গেলো। একে-একে মাইক হাতে নিজেদের নিরন্ন সংসারের দুখের কাহিনি শোনালেন। গাল দিয়ে গড়িয়ে-পড়া নোনতা অশ্রু এদিন অন্য স্বাদ এনে দিলো। এখানেই শেষ নয়, দিশা-উদ্যোগ আগামী বছরও এ রকম কুড়িজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তাঁরাও এদিন হাজির ছিলেন। চার্নকের কর্ণধার প্রশান্ত শর্মা জানালেন, আমাদের এমন কর্মসূচি চলবে। লক্ষ্য অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের ‘দিশা’ দেওয়া।

আকিরা কুরোসোয়া

নন্দন চলচ্চিত্র চর্চা কেন্দ্র সম্পর্কে অনেকের অনেক অভিযোগ আছে। এখানে ছবি প্রদর্শনের ব্যাপারেও কর্তৃপক্ষের নানান অজুহাত আছে। সবই যে চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এমনটা বলা যাবে না। দেশ বিদেশের ছবি দেখার সুযোগ চলচ্চিত্র উৎসব ছাড়া সচরাচর মেলে না। রাজ্য সরকার বিরোধী রাজনৈতিক ছবি বা সামান্যতম সমালোচনা থাকলে সে ছবির নন্দনে প্রবেশাধিকার পায় না। তবু ভাল কর্তৃপক্ষের ঘুম অবশেষে ভেঙেছে। দেশে বিদেশের প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্রকারদের বাছাই করা ছবির প্রদর্শন সম্প্রতি শুরু হয়েছে। যেমন আগামী সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে প্রতি রবিবার সকাল দশটায় আকিরা কুরোসোয়ার চারটি জগৎ বিখ্যাত ছবি দেখান হবে। চার, এগারো, আঠারো ও পঁচিশ তারিখ যথাক্রমে রসোমন, ইকিরু, সেভেন সামুরাই ও রেড ব্রেড প্রদর্শিত হবে।

সাংস্কৃতিক খবর

কাজল চক্রবর্তী সম্পাদিত সাংস্কৃতিক খবরের এবারের সংখ্যাটি নানা কারণে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে কবি দিনেশ দাস ও তরুণ সান্যাল সবিশেষ পরিচিত। স্বনামধন্য এই দুইকবি ব্যক্তিত্বকে নিয়েই প্রামাণ্য তথ্য, অপ্রকাশিত কাবিতা, জীবনপঞ্জী, সাহিত্যকীর্তি, গ্রন্থতালিকা, যাপিত জীবন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মতাদর্শের সংগ্রাম লিপিবদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি কবিতার পাণ্ডুলিপি এবং কবিদ্বয়কে উৎসর্গীকৃত এই প্রজন্মের লেখকদের কাব্যশৈলির সঙ্গে আজকের পাঠকসমাজ পরিচিত হতে পারবেন। আবার একথাও বলা অযৌক্তিক হবে না যে এঁদের সাহিত্য সৃজন নিয়ে অনুসন্ধিষ্ণু গবেষকরা কাজ করতে পারবেন। দিনেশ দাস প্রসদঙ্গে লিখেছেন আশিস সান্যাল, প্রণব চট্টোপধ্যায়, কমল তরফদার, তরুণ মুখোপাধ্যায়, অনন্ত দাশ, জিয়াদ আলি, গণেশ বসু, সুনীল দাশ, সুমিতা চক্রবর্তী, অনুনয় চট্টোপাধ্যায়, শান্তনু দাস প্রমুখ। কবিকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন কবিতায় কৃষ্ণ ধর,, মতি মুখোপাধ্যায়, সাতকর্ণী ঘোষ, রানা চট্টোপাধ্যায়, অমল কর, নরেশ মণ্ডল, অলক ভৌমিক, কাজল চক্রবর্তী প্রমুখ। তরুণ সান্যাল প্রসঙ্গে কলম ধরেছেন কমল দে সিকদার, মানিক মুখোপাধ্যায়, শুভংকর ঘোষ, চারু খান, সুস্নাত দাশ, জয়তী রায়, সুধীর করণ, গণেশ বসু, শতরূপা সান্যাল, অনন্ত দাশ, আশিস সান্যাল, সুমিতা চক্রবর্তী, কেয়া সান্যাল, অজিত ত্রিবেদী, দীপেন রায়, মহাশ্বেতা সান্যাল, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ও বিশ্বরূপ সান্যাল। তরুণ সান্যাল প্রসঙ্গে রাম বসুর লেখাটি এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, কমলেশ সেনের কবিতা সম্ভবত পুনর্মূদ্রণ উল্লেখ থাকলে ভালো হতো।





Current Affairs

Featured Posts

Advertisement