১০বছরেও শেষ হলো না স্মারকস্তম্ভের কাজ
পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তির দিন
কাটলো উপেক্ষা, অবহেলায়

নিজস্ব সংবাদদাতা   ২রা নভেম্বর , ২০১৬

পুরুলিয়া, ১লা নভেম্বর— উপেক্ষা আর অবহেলায় পেরিয়ে গেলো পুরুলিয়ার ৬১তম বঙ্গভুক্তির দিন। স্বাধীনতার পরবর্তী ৮বছর ধরে ধারাবাহিক আন্দোলনে পূর্বতন মানভূমের একাংশকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল পুরুলিয়া জেলা। ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তি হয়েছিল। ষাট বছরের সেই ইতিহাস নবীন প্রজন্ম জানেই না। সেই ইতিহাস জানাবার নেই কোনও উদ্যোগ। ঐতিহাসিক এই দিনটি পালনের কোনও উদ্যোগও নেই বর্তমান রাজ্য সরকারের। বামফ্রন্ট সরকার ভাষা সেনানিদের সম্মানে স্মারক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ শুরু করেছিল। পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তির পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে ২০০৬ সালে পুঞ্চার পাকবিড়রায় স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল ভাষা সেনানিদের। দশ বছর হয়ে গেলো সেই স্মারকস্তম্ভের কাজ শেষ হয়নি। অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সেদিনের ভাষা আন্দোলনের সেনানিদের অনেকেই আজ বয়সের ভারে ন্যূব্জ। অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের খবরও আর কেউ রাখে না। ইতিহাস যেমন অন্ধকারে—সেই ইতিহাসের সেনানিনাও অন্ধকারে। জেলার এক ইতিহাস-গবেষক সুভাষ রায়ের কণ্ঠে হতাশার সুর। তাঁর বক্তব্য, ১লা নভেম্বর দিনটি পুরুলিয়ার মানুষের কাছে অহংকারের দিন। এক অন্য অনুভূতি আর আবেগের দিন। চারদিকে এতো উৎসব, এত মেলা পালন করা হচ্ছে, সেখানে কি এই দিনটি যুক্ত হতে পারে না?

স্বাধীনতা পাওয়ার পর শেষ নয়—নতুন করে লড়াই-আন্দোলনের ক্ষেত্রভূমি হয়ে উঠেছিল তদানীন্তন মানভূম জেলা, শুরু হয়েছিল ভাষার প্রশ্নে দলমত নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষের দীর্ঘস্থায়‌ী আন্দোলন।

স্বাধীনতার পরে বিহার কংগ্রেসের মদতে এখানকার বাংলাভাষী মানুষদের ওপর জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেবার পরিকল্পিত চক্রান্ত শুরু হয়েছিল। পুরুলিয়ার তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের ও বিহার কংগ্রেসের চক্রান্ত মেনে নিতে পারেনি। ১৯৪৮সালে কংগ্রেস ভেঙে এ জেলায় তৈরি হয়েছিল লোকসেবক সংঘ। ১৯৫২ সালের জনগণনাতে লক্ষ্য করা গিয়েছিল ধানবাদ থেকে টাটা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা, কিন্তু চক্রান্ত করে দেখানো হয়েছিল যে মাতৃভাষা হিন্দি। বিহারের বঙ্গভাষী অঞ্চলকে বঙ্গভুক্তির ন্যায্য দাবিকে নস্যাৎ করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এবং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংহ উপস্থাপিত বাংলা-বিহার অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল ১৯৫৬সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি। প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল পুরুলিয়া। বিক্ষোভে উত্তাল মানভূমের লোকসেবক সঙ্ঘ বঙ্গ সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু হয়েছিল পুণ্ডরা থানার পাকবিড়রা গ্রাম থেকে ১০২৫জন ভাষা সেনানি পদব্রজে কলকাতা রওনা দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিন শতাধিক ছিলেন মহিলা। ২০শে এপিল, ১৯৫৬ সালে পদযাত্রা শুরু হবার পর বাঁকুড়া, বর্ধমান, হুগলী, হাওড়া প্রভৃতি জেলার মধ্য দিয়ে ১৮দিন পর ১৯৫৬সালের ৭ই মে তাঁরা কলকাতা পৌঁছলে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাঁদের। ১২দিন পর ছাড়া পেয়েছিলেন তাঁরা। বামপন্থীরাও সেই সময় মানভূমের বিহার ভুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। কে পানিক্কর কমিশনকে লোক সেবক সঙ্ঘ অসংখ্য প্রামাণ্য তথ্য ও নথি দিয়েছিল। সেই তথ্যকে স্বীকৃতি দিয়েছিল পানিক্কর কমিশন। আন্দোলনের চাপে প্রত্যাহৃত হয়েছিল বঙ্গ-বিহার সংযুক্তি বিল। নানা আলোচনা, দর-কষাকষির মাধ্যমে অবশেষে মানভূম জেলার অবলুপ্তি হয়েছিল। ধানবাদ, বোকারো প্রভৃতি এলাকাকে বাদ দিয়ে গঠন করা হয়েছিল পুরুলিয়া জেলা। ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর দিনটিতেই পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তি হয়েছিল। বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই এই ইতিহাস অজানা। আর বর্তমান সরকারের কাছে এই দিনটি উপেক্ষিত। তাই সরকারিভাবে কোনো অনুষ্ঠান পালন করা হয় না। এমনকি স্মারকস্তম্ভের কাজও থেকে গেছে অসমাপ্ত।