বেঙ্গল কেমিক্যালসকে বাঁচাতে
ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১১ই জানুয়ারি— শতাব্দী পার হওয়া দেশের প্রথম ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা বেঙ্গল কেমিক্যালসকে বেসরকারি মালিকানার হাতে তুলে দিতে চায় মোদী সরকার। নীরব রাজ্যের তৃণমূল সরকার।

‘নেই শিল্পে’র পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে কাজ হারাবেন শ্রমিকরা। কাজ হারাবেন দেশজুড়ে থাকা বেঙ্গল কেমিক্যালসের ১১টি ডিপো, ৪৬০টি স্টক, ৯টি এজেন্সিতে কাজ করা শ্রমিক কর্মচারীরা। বন্ধ হওয়ার পরে এ রাজ্যের পানিহাটি ও মানিকতলা ইউনিট। বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা উত্তর প্রদেশের কানপুর ও মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ের ইউনিটও। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের কেমিক্যালস ও ফার্মাসিউটিক্যালস মন্ত্রকের নির্দেশিকা পৌঁছেছে ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড’, সংক্ষেপে বি সি পি এল-র ম্যানেজিং ডিরেক্টরের কাছে। একই সঙ্গে বন্ধ হতে চলেছে কর্ণাটক ও রাজস্থানের দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ফার্মাসিউটিক্যালস কারখানা।

গত ৩রা আগস্ট কেন্দ্রীয় সরকারের কেমিক্যালস ও ফার্মাসিউটিক্যালস মন্ত্রকের আন্ডার সেক্রেটারি অনিল জৈনের সই করা নির্দেশিকা পৌঁছায় বেঙ্গল কেমিক্যালসসহ তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টরদের কাছে। স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ঝাঁপ ফেলতে হবে ‘লোকসানে চলা ও রুগ্‌ণ’ বেঙ্গল কেমিক্যালস কারখানার। দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে বেঙ্গল কেমিক্যালসের সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বেঙ্গল কেমিক্যালস প্রতিষ্ঠা করেন ১৯০১সালের ১২ই এপ্রিল। ১৯৮০সালে বেঙ্গল কেমিক্যালসের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ হয়। ১৯৮১ সালের ২৭শে মার্চ গড়ে ওঠে নতুন সাজে ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড’।

কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি পুরানো। লোকসানে চলছে বেঙ্গল কেমিক্যালস। অথচ ২০১৫সালে বেঙ্গল কেমিক্যালসের উৎপাদন, ২০১৪ সালের থেকে বেড়েছে তিনগুণ। ২০১৪ সালের এপ্রিল-মার্চ পর্বে উৎপাদন ছিল ১৯.৭০কোটি টাকার, তিনগুণ বেড়ে ২০১৫ সালের এপ্রিল-মার্চ পর্বে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪.৭৩ কোটি টাকায়। বেড়েছে উৎপাদিত সামগ্রীর বিক্রিও। ২০১৩-২০১৪ আর্থিক বর্ষে উৎপাদিত সামগ্রীর বিক্রি ছিল ১৯.০৩ কোটি টাকার, ২০১৪-২০১৫ আর্থিক বর্ষে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩.০১ কোটি টাকায়।

‘হেরিটেজ’ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেঙ্গল কেমিক্যালসের পুনরুজ্জীবনের দাবিতে বারে বারে সোচ্চার হয়েছেন সি আই টি ইউ নেতৃবৃন্দ। ২০১৪ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি তৎকালীন কেন্দ্রীয় কেমিক্যালস ও ফার্মাসিউটিক্যালস মন্ত্রী শ্রীকান্তকুমার জেনাকে চিঠি লিখে বেঙ্গল কেমিক্যালসের পুনরুজ্জীবনের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন সি পি আই (এম) সাংসদ এবং সি আই টি ইউ-র সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তপন সেন। উপদেষ্টা সংস্থা ‘ইক্রা’ পরামর্শ দিয়েছিল ২৩৫কোটি টাকা খরচ করলে সফলভাবেই পুনরুজ্জীবন সম্ভব বেঙ্গল কেমিক্যালসের। অনীহা দেখায় কেন্দ্রীয় সরকার।

বেঙ্গল কেমিক্যালসের উদ্বৃত্ত জমি এবারে বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড (বি সি পি এল) ছাড়াও যে সংস্থাগুলির জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলি হলো হিন্দুস্থান অ্যান্টিবায়োটিকস লিমিটেড (এইচ এ এল), ইন্ডিয়ান ড্রাগস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস (আই ডি পি এল) এবং রাজস্থান ড্রাগস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস (আর ডি পি এল)।

বেঙ্গল কেমিক্যালসসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ কারখানাগুলিকে বাঁচাতে, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থাগুলি বাঁচাতে বুধবার কলকাতার গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউতে বেঙ্গল কেমিক্যালসের দপ্তরের সামনে যৌথভাবে প্রতিবাদসভা সংগঠিত করে সি আই টি ইউ, ডব্লিউ বি এম এস আর ইউ এবং বেঙ্গল কেমিক্যালস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন। সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে মিছিল করে শ্রমিক-কর্মচারীরা এই সভায় যোগ দেন। এদিনের সভায় সি আই টি ইউ পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সভাপতি শ্যামল চক্রবর্তী বলেন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যালস। অথচ সেই সংস্থাকেও রেয়াত করছে না মোদী সরকার। দেশের সমস্ত সম্পদ বেচে দিলেও তৃণমূলের মুখে একটিও কথা নেই। নোট বাতিলের আন্দোলনে তৃণমূল কোমর বেঁধে নেমেছে গরিবের স্বার্থে নয়, নিজেদের লুট করা কোটি কোটি টাকা বাঁচাতে, অভিযুক্ত নেতা মন্ত্রীদের বাঁচাতে। সি আই টি ইউ পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সম্পাদক দীপক দাশগুপ্ত বলেন বেঙ্গল কেমিক্যালসসহ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থাগুলিকে বাঁচানোর লড়াই দেশ বাঁচানোর লড়াই। মোদী সরকার কর্পোরেটদের মুনাফার স্বার্থেই অর্থনীতির মেরুদণ্ড রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে দুর্বল করতে চাইছে। এ রাজ্যের তৃণমূল সরকারও একই পথে হাঁটছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেই রুখতে হবে দেশের সম্পদ বিক্রির চক্রান্ত।

এদিনের প্রতিবাদসভায় সি আই টি ইউ নেতা অনাদি সাহু বলেন, যখন বেঙ্গল কেমিক্যালস, ব্রিজ অ্যান্ড রুফসহ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে বিক্রির পরিকল্পনা চলছে একই সময়ে বি আই এফ আর তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদী সরকার। বি আই এফ আর তুলে দেওয়ার ফলে রাজ্যের বি আই এফ আর তালিকাভুক্ত শ্রমিক কর্মচারীদের বকেয়া টাকা পাওয়ার কোন বিকল্পই রইলো না। শ্রমিক কর্মচারীদের ন্যায্য বকেয়া আদায়ের দাবিতে লড়াই আন্দোলনই একমাত্র পথ। এদিনের সভায় বক্তব্য রাখেন ডব্লিউ বি এম এস আর ইউ-র রাজ্য সম্পাদক সুমহান চক্রবর্তী, এফ এম আর এ আই-র সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক শান্তনু চ্যাটার্জি। তাঁরা বলেন, ক্যানসার, এইচ আই ভি-সহ আরও অনেক মারণ রোগ থেকে জীবন রক্ষার ওষুধের দাম বেড়েছে গড়ে ২২শতাংশেরও বেশি। খোদ প্রধানমন্ত্রীর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এব্যাপারে ইতিমধ্যেই অনুমোদন দিয়েছে। মোট ৭৬টি এমন জীবনদায়ী ওষুধ রয়েছে তালিকায়, যা রোগীর প্রাণরক্ষায় জোগান দিতে হলে পরিবারেরই প্রাণান্তকর অবস্থা হবে। একই সঙ্গে চলছে রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ সংস্থাগুলিকে বন্ধ করার চিন্তা বিদেশি কোম্পানিগুলির স্বার্থে। এর ফলে ওষুধের দাম আরো বাড়বে। জীবনদায়ী ওষুধ কিনতে সর্বস্বান্ত হবেন মানুষ। বেঙ্গল কেমিকেলস ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মৃণাল রায়চৌধুরি বলেন, কোনভাবেই বেঙ্গল কেমিকেলসকে বিক্রি মেনে নেবেন না শ্রমিক-কর্মচারীরা। সভায় সভাপতিত্ব করেন বেঙ্গল কেমিকেলস ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি নেপালদেব ভট্টাচার্য।

এদিন বেঙ্গল কেমিকেলসের ডিরেক্টর অফ ফিনান্সের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন নেতৃবৃন্দ। প্রতিনিধি দলে ছিলেন নেপালদেব ভট্টাচার্য, অনাদি সাহু, মৃণাল রায়চৌধুরি এবং ডব্লিউ বি এম এস আর ইউ-র সম্পাদক অর্ণব নাগ।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement