রোজভ্যালির উত্তরবঙ্গের ৭এজেন্টের
দিকে এখন নজর ই ডি-সি বি আই-র

নিজস্ব সংবাদদাতা

মাথাভাঙা, ১১ই জানুয়ারি— কয়েক বছর আগেও ছিল সামান্য পান মশলার বিক্রেতা। আর সেখান থেকেই রাতারাতি কোটিপতি হয়ে গিয়েছিলেন রোজভ্যালির এজেন্ট হওয়ার দৌলতে। বেশ কয়েকজন আবার রোজভ্যালির টাকার লোপাট করে নিজেরাই নতুন চিট ফান্ড খুলে বসেছিলেন। কোচবিহারের তিনজন, দার্জিলিঙের তিনজন ও জলপাইগুড়ির একজন এজেন্টের দিকে এখন নজর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের। এই সমস্ত এজেন্টদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন দুই কেন্দ্রীয় সংস্থার গোয়েন্দারা।

উত্তরবঙ্গের মতো প্রান্তিক এলাকা থেকে এজেন্টরা এত বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছে সেটা যে কাউকে চমকে দিতে পারে। কোচবিহারের দিনহাটার এক এজেন্ট উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী রাজ্য সিকিম, বিহার এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন এলাকায় নিজের অধীনে ছোট ছোট এজেন্ট নিয়োগ করেছিলেন। গৌতম কুণ্ডুর কাছের লোক হওয়ার সুবাদে দিনহাটার ওই এজেন্ট সাহেবগঞ্জ রোডে রোজভ্যালির বোর্ড লাগিয়ে নিজের বাড়িতেই অফিস খুলে বসেছিলেন। বেকারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা কমিশনের লোভ দেখিয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। রোজভ্যালির উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি অফিস নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। বাজার থেকে তোলা ওই টাকার বড় একটি অংশই জমা পড়েছিল তাঁর নিজের অ্যাকাউন্টে। কয়েক বছর আগেও সাধারণ মানুষ দেখেছেন সাইকেলে করে ওই ব্যক্তি শহর ও গ্রামের দোকানে দোকানে গিয়ে পান মশলা ও গুটকা বিক্রি করতেন। জানা গিয়েছে, তাঁর ভাই ও অন্যান্যরা এখন আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক। গৌতম কুণ্ডু গ্রেপ্তারের পর রোজভ্যালির বোর্ড খুলে দিয়ে উচ্চ শিক্ষার ডিগ্রি দেওয়ার বোর্ড লাগিয়ে এখন নতুন ব্যবসা শুরু করেছেন তিনি।

ই ডি এবং সি বি আই-র তালিকায় রয়েছে মাথাভাঙার হিন্দুস্থান মোড়ের একই পরিবারের দুই ভাই। এঁরাও গৌতম কুণ্ডুর অত্যন্ত কাছের লোক ছিলেন। রোজভ্যালির নাম করে বাজার থেকে বহু কোটি টাকা তুলে নিজেরাই একটি চিট ফান্ড খুলেছিলেন। এঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সোনার অলংকার কেনার ফাঁদ পেতে কোটি কোটি টাকা তুলে চম্পট দিয়েছেন দুই ভাই। বর্তমানে এঁরা সিকিমের গ্যাঙটক ও শিলিগুড়িতে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। এঁদের মাধ্যমেই ফালাকাটার কুঞ্জনগরে একটি রিসর্ট করেছিল গৌতম কুণ্ডু। গৌতম ঘনিষ্ট ধূপগুড়ির আরেক এজেন্ট একইভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। রোজভ্যালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ওই ব্যক্তি ময়নাগুড়িতে দুটি চা বাগান কিনেছেন। আসামেও এক আত্মীয়ের নামে সম্পত্তি কিনেছেন তিনি। উত্তরবঙ্গের এই এজেন্টদের সম্পত্তির উৎস জানা অত্যন্ত জরুর।

উত্তরবঙ্গের চিট ফান্ডের জাল বিছিয়ে প্রায় ১০০কোটি টাকা তুলেছিল রোজভ্যালি। এই কোম্পানির বিভিন্ন প্রকল্পে ৬০/৭০হাজার এজেন্ট নিয়োগ হয়েছিল। উত্তরবঙ্গে সারদার চাইতেও বড় দুর্নীতির জাল বিছিয়েছিল রোজভ্যালি। রোজভ্যালিকাণ্ডে তদন্তের গতি আসায় প্রতারিত আমানতকারীরা টাকা ফেরতের আশায় বুক বাঁধছেন।

রোজভ্যালির বিভিন্ন প্রকল্পে বেশ কিছু লোভনীয় চমক দেওয়া হয়েছিল। এখানে টাকা রাখলে সুদ দেওয়া হতো ১১.২% থেকে ১৭.৬৫% পর্যন্ত। তবে মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন প্রকল্পের টাকা ফেরত দেওয়া হতো না। ব্যাঙ্ক বা ডাকঘরের তুলনায় সুদ বেশি হওয়াতে সাধারণ মানুষ লোভে পড়ে রোজভ্যালিতে টাকা রাখতে শুরু করেন। শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গের সাত জেলাতে আমানতের পরিমাণ ১০০কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০১৫সালে ২৩শে মার্চ রোজভ্যালির কর্তা গ্রেপ্তারের পর মাথায় হাত পড়ে আমানতকারীদের। ইতিমধ্যেই মালদহের গাজোলে ছয় একর জমির উপর হোটেল তৈরি করেছে রোজভ্যালি। ফালাকাটায় তৈরি হয়েছে রিসর্ট, কোচবিহারেও বেশ কিছু জমি রয়েছে রোজভ্যালির নামে। দার্জিলিঙ ও গ্যাঙটকেও বেশ কিছু এলাকায় বেশ কয়েকটি হোটেল লিজ নিয়েছিল রোজভ্যালি।

সম্প্রতি সি বি আই ফের তদন্ত শুরু করায় আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছেন উত্তরবঙ্গের সাত লক্ষ আমানতকারীরা। ইতিমধ্যেই চিট ফান্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সংগঠন চিট ফান্ড সাফারার্স অ্যান্ড এজেন্ট ইউনিট ফোরাম আন্দোলনে নামা প্রস্তুতি নিচ্ছে। কয়েকমাস আগে তারা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় শিবির করে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ই ডি এবং সি বি আই-র কাছে পাঠিয়েছিল। এবার আগামী ১২ই জানুয়ারি ফের তারা গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লক্ষ্য একটাই, রোজভ্যালিতে টাকা রেখে প্রতারিত ও সর্বস্বান্ত হওয়া সাধারণ মানুষ যাতে তাঁদের কষ্টার্জিত জমানো অর্থ ফেরত পান।