দুর্দশা সাধারণের, ছাড় ধনীদের
বাজেটে কমতে চলেছে কর্পোরেট কর

নিজস্ব প্রতিনিধি

নয়াদিল্লি, ১১ই জানুয়ারি— কেন্দ্রীয় বাজেটে কমতে চলেছে কর্পোরেট কর। নোট বাতিলের ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট নেমে এসেছে। আগাম অনুমানেও স্পষ্ট, মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির হার হ্রাস পাবে। ম্যানুফ্যাকচারিং সহ শিল্পের নানা ক্ষেত্রে উৎপাদন শ্লথ হচ্ছে। প্রকাশ্যে যাই বলা হোক না কেন, নোট বাতিলের সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে চিন্তিত অর্থ মন্ত্রকের শীর্ষ পদাধিকারীরাও। এই প্রেক্ষিতে ‘গরিবের স্বার্থ’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপর্যুপরি ঘোষণা সত্ত্বেও কর্পোরেট মহলকে ‘উৎসাহ’ দিতে কর ছাড়ের পথে যাচ্ছে মোদী সরকার। ইঙ্গিত এমনই। বাজেট ১লা ফেব্রুয়ারি। কর্পোরেট করের হার একধাপে অনেকটাই কমিয়ে আনা হবে ধারণা করা হচ্ছে।

বস্তুত গত বছরের বাজেটের সময়েই অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি কর্পোরেট মহলকে আশ্বাস দিয়েছিলেন চার বছরে ধাপে ধাপে করের হার ২৫শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। এখন ধাক্কাতেই এই হারে কর নামিয়ে আনা হতে পারে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

সাধারণভাবে কর্পোরেট করের হার ৩০শতাংশ বা তার বেশি। সারচার্জ ও অন্যান্য উপাদান ধরে তা ৩৪শতাংশ পর্যন্ত হয়। ভারতের কর্পোরেট মহলের অভিযোগ, এই করের হার বেশি। বাস্তবে অবশ্য কর্পোরেট কর প্রদানের গড় হার দাঁড়িয়েছে ২৩শতাংশ। একথা জেটলিও স্বীকার করেছিলেন তাঁর গতবারের বাজেট ভাষণের সময়ে। ঢালাও কর ছাড়, বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ফলে কর্পোরেট কর থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব এভাবে কমে এসেছে।

সংসদে অর্থমন্ত্রীরই পেশ করা আরেকটি হিসেবে দেখা গেছে কী বিপুল পরিমাণ কর ছাড় দেওয়া হয় কর্পোরেটকে। প্রত্যক্ষ কর এবং পরোক্ষ কর উভয় ক্ষেত্রেই এই ছাড় চলছে। ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এই তিন অর্থবর্ষে প্রত্যক্ষ কর হিসাবে কর্পোরেট আয়কর, ব্যক্তিগত আয়করে ছাড় দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে ৯৩হাজার ৪৭ কোটি টাকা, ১লক্ষ ১৮হাজার ৫৯৩কোটি টাকা ও ১লক্ষ ২৮হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা। পরোক্ষ কর হিসাবে অন্তঃশুল্ক, বহিঃশুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে তিন বছরে যথাক্রমে ৪লক্ষ ৫৬হাজার ৯৩৭ কোটি, ৪লক্ষ ৩৫হাজার ৭৫৬কোটি ও ৪লক্ষ ৮২হাজার ৪৮৯কোটি টাকা। মোট কর ছাড় তিন বছরে যথাক্রমে ৫লক্ষ ৪৯হাজার ৯৮৪ কোটি, ৫লক্ষ ৫৪হাজার ৩৪৯কোটি ও ৬লক্ষ ১১হাজার ১২৮ কোটি টাকা। চলতি আর্থিক বর্ষে এই ছাড়ের পরিমাণ কম তো নয়ই, বরং বেশিই হতে চলেছে।

এর পরেও কর্পোরেট মহলের দাবি করের হার কমাতে হবে। বস্তুত কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেট করের হার ১৮শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি পেশ করেছে। অরুণ জেটলির ঘোষিত বক্তব্য ছিল এমনিতেই ছাড় ইত্যাদি দিয়ে ২৩শতাংশের বেশি হারে কর মেলে না। তার বদলে ওই হারের ধারেকাছেই প্রকৃত কর হারকে নিয়ে আসা হোক, ছাড় বাতিল করা হোক। কিন্তু কর্পোরেট মহলের পালটা বক্তব্য, ছাড় বাদ দিয়ে ২৩শতাংশ হার হলে এখনের পরিস্থিতিই বহাল থাকবে। তাহলে কর কমানোর কোনো লাভ পাবে না কর্পোরেট মহল। তাই করের হার একলাফে ২০শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে তারা। পুরানো যুক্তিই তাদের তরফে সামনে আনা হয়েছে: করের হার যদি কম হয় তাহলে কর ফাঁকি কমবে। কালো টাকার প্রকোপ কমবে। যদিও কর কমিয়ে কর ফাঁকি আদৌ রোখা যায়নি।

নোট বাতিলের ধাক্কা পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। কাজ খুইয়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। কৃষি বিপর্যয়ের মুখে। কিন্তু নোট বাতিলের ফলে মন্দা হতে পারে যুক্তি দেখিয়ে কর্পোরেট মহলকে ছাড় দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে মোদী সরকার।

এমনিতেই কর্পোরেটকে যে ছাড় দেওয়া হয় তার অর্ধেকও নয় মৌলিক জনকল্যাণ খাতে ভরতুকি। ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬-তে সার, খাদ্য, পেট্রোপণ্য ও অন্যান্য জনকল্যাণ প্রকল্পে মোট ভরতুকি দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে ২লক্ষ ৫৪হাজার ৬৩২কোটি টাকা, ২লক্ষ ৫৮ হাজার ২৫৮কোটি টাকা, ২লক্ষ ৫৭হাজার ৮০১কোটি টাকা।

Featured Posts

Advertisement