সরকার পাশে নেই
আত্মঘাতী ভাগচাষি মঙ্গলকোট

নিজস্ব সংবাদদাতা

মঙ্গলকোট, ১১ই জানুয়ারি — মুখ্যমন্ত্রী কোটি কোটি টাকা খরচ করে মাটি উৎসবে ব্যস্ত, সেই সময় মঙ্গলকোটের এক ভাগচাষি সরকারি সহায়ক মূল্যে ধান বিক্রি করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। আত্মঘাতী ভাগচাষির নাম কলেজ মাজি (২৯)। বাড়ি মঙ্গলকোটের ভাল্যগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের কুলসোনা গ্রামে। কলেজ মাজির আত্মহত্যার খবরে গোটা গ্রামে বিষণ্ণতা নেমে আসে।

কলেজ মাজির দাদা বুদ্ধদেব মাজি বলেছেন, তাঁর ভাই এবছর ধান চাষ করেছিলেন। দেড়বিঘা জমিতে ফুল কপি ও বেগুন চাষ করে খুবই লোকসান হয় তাঁর। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুদ্ধদেব মাজি বলেছেন, গ্রামে কোথাও সরকারি সহায়ক মূল্যে ধান কেনা হয়নি। তাই তাঁর ভাই কলেজ মাজিও ধান বিক্রি করতে পারেননি। এছাড়াও ফুল কপি চাষ করে চাষের খরচই ওঠেনি। বাজারে ফুল কপির দাম নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, বেগুন গাছে পোকা লেগে তাঁর দারুণ ক্ষতি হয়েছে। ফলে মহাজনের দেনা শোধ করার চাপ থাকলেও ফসল বেচতে না পেরে বেশ কিছুদিন ধরেই মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। এরপরই রবিবার বাড়িতেই কীটনাশক খান কলেজ মাজি। তাঁকে কাটোয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে শারীরিক পরিস্থিতি আরো অবনতি হলে বর্ধমানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। শুধু কলেজ মাজি নয়, কুলসোনা খুবই বর্ধিষ্ণু গ্রাম হিসাবে চিহ্নিত হলেও সেখানে ১০০শতাংশ কৃষকই সরকারি সহায়ক মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারেননি। ফলে চরম আর্থিক সংকটে আছেন কৃষক। তার উপর নোট বাতিলের কারণে সবজির দর তলানিতে ঠেকেছে। ফুলকপি, বাধাকপি, বেগুন, পালংশাক, টমেটো কোন সবজির লাভজনক দাম না পেয়ে কৃষক চরম সংকটে আছেন। কিন্তু কৃষকের পাশে না দাঁড়িয়ে সরকার এখন মাটি উৎসব নিয়ে ব্যস্ত। যে জেলায় সরকারি সহায়ক মূল্যে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ৪লক্ষ ৫০ হাজার মেট্রিক টন সেই বর্ধমান জেলাতে ধান কিনেছে সরকার মাত্র ৫হাজার মেট্রিক টন। সেটাও কিনেছে শাসকদলের ফড়ে ও দালালদের কাছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে মাটি উৎসবে মেতে থাকে যে সরকার সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কৃষকদের কথা ভাবার সময় কোথায়? মাটি উৎসব থেকে এক মুহূর্তের জন্যও কৃষকদের ভবিষ্যৎ, তাঁদের ফসলের লাভজনক দর, ফসলের বীমা এইসব নিয়ে মাথাব্যথা মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ফুটে ওঠেনি। তিনি মাটি উৎসবের মঞ্চকে দলীয় মঞ্চে পরিণত করে নোট বাতিলের তরজাতেই ব্যস্ত থেকেছেন।

সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে মাটি উৎসবের আঁচ কুলসোনা গ্রামে না পৌঁছলেও সেখানে শুধুই হাহাকার। কলেজ মাজিই ছিলেন তার পরিবারে একমাত্র রোজগেরে। তাঁর স্ত্রী, কন্যা সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও সরকারের তা নিয়ে কি বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা আছে? নাহলে শুধুমাত্র বর্ধমান জেলাতেই কলেজ মাজির আত্মঘাতীর পর সংখ্যা দাঁড়ালো ১৪৩। কিন্তু একজনের মৃত্যুও রাজ্য সরকার কৃষক আত্মহত্যা বলে স্বীকার করেনি। একজন আত্মঘাতী কৃষকের পরিবারের পাশেও দাঁড়ায়নি এই সরকার। কুলসোনা গ্রামে যে কৃষকরা ধান বিক্রি করতে পারেননি এক দানাও, তাঁরা বলছেন, আর কত কৃষকের আত্মহত্যার পর রাজ্য সরকার মানবে? অভাবী এই কৃষক পরিবারগুলোর দায় বা কে নেবে? অনেকেই বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী চিট ফান্ডের টাকা যাঁরা আত্মসাৎ করেছেন তাঁদের বাঁচাতেই ব্যস্ত। কিন্তু যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চাষ করেন তাঁর ফসলের লাভজনক দর নিয়ে মমতা ব্যানার্জিরা কখনো রাস্তায় নেমেছেন? আত্মঘাতী ভাগচাষি কলেজ মাজির বাবা নবকুমার মাজি বলেছেন, কৃষকের পাশে যদি সরকার না থাকে তাহলে তো গ্রামে আত্মহত্যার মিছিল চলতেই থাকবে।

Featured Posts

Advertisement