কাজ নেই রাজ্যে পি এস সি-ও দখল

এরাজ্যে কাজ কোথায়? কথাটা এখন মুখে মুখে ঘোরে।

কাজ মানে তো সিন্ডিকেটের কারবার। আর আছে সিভিক ভলেন্টিয়ারে যৎসামান্য আয়ের বন্দোবস্ত। সেখানে শাসকদলে তকমা ছাড়া ঢোকার কোন রাস্তা নেই। অবশ্য তাতেও শাসকদলের কর্মীদের নেতা-নেত্রীর পকেটে প্যাকেট না রেখে অনিশ্চিত এই কাজটুকুও পাওয়ার‍‌‍‍ েজা নেই। সেতো গেলো একরকম। সরকারি কাজের যেটুকু যা তাতেও চলছে দখলদারীর রাজত্ব। টেটের অভিজ্ঞতা এখনও টাটকা। লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতীকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সেখানও শাসকদলের দৌরাত্ম্য। যোগ্যতা হতে হবে নেতা মন্ত্রীদের আত্মীয় পরিজন, অথবা ফেলো কড়ি মাখো তেল। স্কুল সার্ভিস কমিশনের অবস্থা তথৈবচ। মিউনিসিপাল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ নোটিস গত পাঁচ বছরে কে কবে কোথায় দেখেছে বলা মুশকিল। শিক্ষিত যুবদের আরেকটা নিয়োগ সংস্থা পাবলিক সার্ভিস কমিশন, সেখানেও নিয়োগ নেই বহুদিন। তবু বেকারদের চাকরির আকা‍‌ঙ্ক্ষা পি এস সি এখনও আশার দরজা। সেই পি এস সি-কে দলের কবজায় আনতে রাজ্য সরকার ভাঙলো পাবলিক সার্ভিস কমিশনের স্বশাসন। সংবিধানকে তোয়াক্কা না করে স্বশাসিত সংস্থায় দখলদারির পথেই গেল মমতা ব্যানার্জির সরকার।

দেশের সংবিধানে পি এস সি স্বীকৃত। সরকারি চাকরিতে নিয়োগে নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতা রাখতেই এই সাংবিধানিক বিধি ব্যবস্থা রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ইউ পি এস সি, আর রাজ্য সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে পি এস সি তারই অঙ্গ, এক স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা।

কিন্তু রাজ্যের সেই বিধিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এহেনও পি এস সি-কে সরাসরি অর্থ দপ্তরের অধীনে আনার জন্য কাজ নীরবে সেরে ফেলছে রাজ্য সরকার। মমতা সরকারের এই সিদ্ধান্তে কার্যত স্বশাসনের ক্ষমতা হারাচ্ছে পাবলিক সার্ভিস কমিশন। মোদী সরকার সম্প্রতি বি আই এফ আর তুলে দেওয়ায় মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য ছিল: প্ল্যানিং কমিশন তুলে দেওয়া হয়েছে। বি আই এফ আর তুলে দেওয়া হলো। যা কিছু পুরানো স্ট্রাকচার দেশে চলছিলো তা সবই বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এদিকে ঘটনা হলো, দিল্লিতে যা হচ্ছে তার হবহু প্রতিচ্ছবি আমরা দেখছি মমতা ব্যানার্জির প্রশাসনিক কার্যকলাপে। সংশোধনী এনে পি এস সি-র স্বশাসনকে লাটে তোলার ব্যবস্থা করেছে তাঁর সরকার। ইউ পি এস সি থেকে পি এস সি- সকলেই কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের অধীনে থাকলেও কোনো মন্ত্রক দ্বারা পরিচালিত হয় না। সংস্থার নিরপেক্ষতা রক্ষা করতে এমনই বিধান সংবিধানের। কিন্তু পি এস সি-কে এখন থেকে রাজ্যের অর্থ দপ্তরের আওতায় এনে প্রকাশ্যে অমিত মিত্রের কথায়, আসলে মমতা ব্যানার্জির ইচ্ছেতে ওঠবোস করার পাকা বন্দোবস্তো করে নিচ্ছে এরাজ্য। শুধু তাই নয়, পি এস সিকে নিজেদের তাঁবে আনতে আরও একটি মারাত্মক সংশোধনী এনেছেন মমতা ব্যানার্জি। যে ধারা সংবিধান দিয়েছিল এরাজ্যের ক্ষেত্রে তার নয়া সংশোধনীতে পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে পছন্দের বশংবদ কর্মীদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে। হায়, পি এস সি-র সাংবিধানিক স্বচ্ছতা আর নিরপেক্ষতা! যা সংবিধান সূত্রে প্রাপ্ত। এখানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাড়াঁলো নিয়োগের স্বচ্ছতায়। এস এস সি, টেটসহ সরকারি চাকরির নিয়োগের দুর্নীতির প্রসঙ্গ এরাজ্যে বহু চর্চিত। পশ্চিমবঙ্গের বেকার যুব সম্প্রদায় তা বুঝছেন জীবন দিয়ে। তার মধ্যে বোধহয় একটু আশার জায়গা ছিল পি এস সি। এরাজ্যে শিক্ষা থেকে চাকরি, টাকা দিয়ে কেনাটাই এখন দস্তুর। পি এস সি-তে এতদিন যেটুকু যা বাধা ছিল তাও এবার সরিয়ে দিচ্ছে রাজ্য সরকারের সংশোধনী। সংবিধান স্বীকৃত একটি সংস্থাকে সরকার নিজের কবজায় আনতে এমন কোন সংশোধনী আনতে পারে কিনা, এপ্রশ্ন তোলা মমতা ব্যানার্জির শাসনে অর্থহীন।

বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে সিদ্ধান্ত ছিলো রাজ্যের সরকারি চাকরিতে সব নিয়োগ হবে পি এস সি-র মাধ্যমে। মমতা ব্যানার্জির সরকার ইতিমধ্যেই গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি-সহ রাজ্যের সরকারি চাকরির প্রায় সব নিয়োগ নিজেদের কবজা নিয়ে এসেছে। বলাই বহুল্য, সেই নিয়োগের পেছনে অর্থই যে একমাত্র যোগ্যতা নিয়ন্ত্রক তা নিয়ে রাজ্যবাসীর কোন সংশয় নেই। বেকার যুবদের জীবনের স্বপ্ন নিয়ে এমন ছিনিমনি বোধ হয় এরাজ্যেই সম্ভব। তবে আশার আলো একটাই, যুবরা তা মেনে নিতে বিন্দুমাত্র রাজি নয়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement