মোদীজীর নোট বাতিলের পরবর্তী অধ্যায়

অশোক ভট্টাচার্য

২০১৬ সালকে বিদায় দিয়ে ২০১৭ সালকে দেশের মানুষ স্বাগত জানাচ্ছে। বহু মানুষ হিসেব করতে ব্যস্ত বিগত বছরটিতে কী পেলাম, কী পেলাম না।

বিগত বছরটিতে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে, একই সাথে সামাজিক ক্ষেত্রেও অনেক ঘটনা ঘটেছে। সব বিষয় নিয়ে কিছু লেখার মধ্যে না গিয়ে, বছরের শেষের ৫০টি দিন ও তার পরের কিছু দিনের কিছু কথার অবতারণা এই নিবন্ধে।

বছরের শেষের দিনে অনেকের চোখ ছিল টেলিভিশনের পর্দায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের দিকে। গত ৮ই নভেম্বর মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ৫০০ টাকা ও ১০০০ টাকা নোট বাতিল বা বি-মুদ্রায়নের সিদ্ধান্তের কথা শুনেছেন। এককথায় বলা যায় মানুষ হতাশ।

এরপর প্রায় প্রতিদিনই হয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বা অর্থমন্ত্রক বা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার প্রজ্ঞাপন বা বিবৃতির মাধ্যমে মানুষের নজরে নোট বাতিল বা ডি-মনিটাইজেশন সম্পর্কে অনেক কিছু এসেছে। একথা ঠিক এই কয়েক দিনের মধ্যে দেশের অনেক মানুষই অর্থনীতি বিষয়ে কিছু না কিছু অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। নোট বাতিল বিষয়টি আজ আর শুধুমাত্র কিছু অর্থনীতিবিদদের বিষয় হিসেবে আবদ্ধ নেই। বিষয়টি এখন সাধারণের। অর্থনীতি বিষয়টির সাথে জনগণের ভালোমন্দ জড়িত। অর্থনীতি শাস্ত্রটি আসলে নৈতিক দর্শনের একটি শাখা। অর্থনীতি সমাজ ও সভ্যতার পথ দেখায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিষয়টিকে এমনভাবে দেখাতে চাইছেন যেন তিনি এমন কিছু নতুন বিষয় নিয়ে মানুষকে ভাবিয়ে তুলছেন, যা অতীতে নাকি কেউ ভাবাতে পারেননি। কেউ কেউ আবার তাঁকে একজন বড় মাপের অর্থনীতিবিদ হিসেবে মনে করে তাঁর অতিরিক্ত সুখ্যাতি করাও শুরু করেছেন। কিছু মিডিয়া তাঁর হয়ে ঢাক বা‍‌জিয়েই চলেছে। যেমন আমাদের রাজ্যে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে দেবী বলে মনে করে তাঁর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করারও ইচ্ছে প্রকাশ করে থাকেন। কেউ কেউ মনে করেন রাজা কখনও মিথ্যা বলতে পারেন না। কেউ কেউ তাঁকে সবচাইতে বড় চিত্রশিল্পী, কবি, গায়িকা বলেও মনে করেন। যেমন মনে করতেন তামিলনাডুর বহু মানুষ কুমারী জয়ললিতাকে। তাঁর মৃত্যুর পর সে রাজ্যে অনেক মানুষ স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণও করেছেন। আমরা উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীকেও জানি, যিনি নিজেই নিজের মূর্তি উদ্বোধন করেছিলেন। এটা ঠিক এসব রাজনীতি দেশের কিছু রাজ্যে ছিল। ছিল না পশ্চিমবঙ্গে। আজ পশ্চিমবঙ্গও এই রাজনীতির বাইরে নয়।

(২)

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কি এমন নতুন কিছু জিনিস করেছেন দু’টি বড় অঙ্কের নোট বাতিল করে? না, আমাদের দেশে ১৯৪৬ ও ১৯৭৮ সালেও এরকম বড় অঙ্কের নোট তৎকালীন সরকার বাতিল করেছিল। নোট বাতিল বা বি-মুদ্রায়ন আমাদের দেশে কেন বিশ্বের যে কোনো দেশেই হয়ে থাকে। প্রতিটি দেশে এর জন্যে যথাযথ আইন আছে, আছে কিছু আগাম ব্যবস্থা নেবার রীতি। যেমন আমাদের দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আইনের ১৯৩৪-এর ২রা জানুয়ারি ২৬ ধারাতে এই নোট বাতিল করা হয়েছে। যে কোনো দেশের মুদ্রা সরকার স্বীকৃত আর্থিক বিনিময় মাধ্যম। যা অবশ্যই একটি Credit Note। দেখা যাচ্ছে ভারতে নোট বাতিলের আইন ও ধারাটি বহু পুরানো, ১৯৩৪ সালের। তাহলে নরেন্দ্র মোদীর কৃতিত্বটা কোথায়? তাঁর কৃতিত্ব একটি স্থানে আছে, তা হলো এর দ্বারা দেশের বা দশের ভালো হলো না মন্দ হলো, তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। তাঁর ওয়ান পয়েন্ট প্রোগ্রাম নিজেকে তুলে ধরা। সে কাজে অনেকটা সফল তিনি। অর্থনীতি এর দ্বারা কী ভালো হতে পারে? অর্থাৎ দেশের মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বা আয় বাড়বে কিনা, দেশের মোট গার্হস্থ্য উৎপাদন (জি ডি পি) বাড়বে কিনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে কিনা, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে কিনা, দুর্নীতি রোধ হবে কিনা, এসব বিষয় কিন্তু তাঁর এজেন্ডায় নেই। ৮ই নভেম্বরের তাঁর ভাষণে ও পরবর্তীকালে অর্থমন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তিতে কয়েকটি কথা বলা হয়েছে। তার মূল কথা হলো দেশে কালো টাকা উদ্ধার করা, বিশেষ করে নকল নোট খুঁজে বের করা, সন্ত্রাসবাদীদের হাতে যাতে এই টাকা না পৌঁছাতে পারে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, সর্বোপরি দুর্নীতি রোধ করা। খেয়াল করে দেখবেন তাঁর সরকারের কোনো ঘোষণাতেই কিন্তু নগদহীন ডিজিটাল অর্থনীতির লেনদেনের কথা বলা হয়নি। বিষয়টিকে আনা হয়েছে অনেক পরে। তিনি পরিকল্পিতভাবেই এমন কিছু শব্দ শুরুতে ব্যবহার করেছিলেন যা স্পর্শকাতর ও ভাবাবেগ সুলভ। বুঝে শুনেই তার এসব শব্দ ব্যবহার। এক বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী স্যামুয়েল জনসনের ভাষায় একজন শেকড়বিহীন রাজনীতিবিদের শেষ আশ্রয় হলো আগ্রাসী দেশপ্রেম (Petriotism is the last refuge of a scoundrel)। এক উগ্র দেশাত্মবোধের ভাবাবেগের আশ্রয় নিয়ে তার এই ঘোষণা, উল্লেখ করা প্রয়োজন। নগদহীন বা ডিজিটাল অর্থনীতির উদ্যোগ ইতিপূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া, ইউরোপের অনেকগুলি দেশ এই উদ্যোগ নিলেও তাদের অভিজ্ঞতা ভালো নয়।

(৩)

নতুন বছরে আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই সিদ্ধান্তে বা পদক্ষেপে ভারতীয় অর্থনীতি সার্বভৌমত্ব কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল হয়েছে। একথা বলা হয়ে থাকে সার্ব‍‌ভৌমত্ব ও মুদ্রা কিছুটা সাযুজ্যপূর্ণ। (Sovereignty and money scam to be co-terminus)। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা, কালো টাকা উদ্ধার করা, নকল নোট খুঁজে বের করা, সন্ত্রাসবাদকে দুর্বল করা, এসব উদ্দেশ্যের সাথে কোনো মানুষেরই দ্বিমত থাকতে পারে না। দেশের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থের সাথে তা যুক্ত। কে না চায় দেশের প্রতিটি মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫লক্ষ টাকা করে ঢু‍কে যাক। সবাই চাইবে। কে না চাইবে বিদেশের ব্যাঙ্কে যে লক্ষ কোটি কোটি টাকা যা জমা করে রেখেছে কিছু কর্পোরেট মালিক, কালোবাজারি বা চোরা কারবারি, সেই অর্থ উদ্ধার করে নিয়ে আসা হোক। কে না চাইবে ঋণ খেলাপি বা কর না প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং এসব অর্থ দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হোক। সবাই চাইবে। কিন্তু সত্যিই কি নরেন্দ্র মোদীজীর এজেন্ডায় এসব আছে? সন্দেহ ও উদ্বেগের স্থান এখানেই। এসব নিয়েই আলোচনায় দেশ এখনও উত্তাল। নতুন বছরে এসবের হিসেব নিকেশের পালা এখন চলছে। কারণ ৫০দিন ইতিমধ্যেই অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। দুর্নীতি, কালো টাকা ইত্যাদির স্থানে এখন চলে এসেছে ডিজিটাল অর্থনী‍‌তির কথা।

(৪)

এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে দেশ-বিদেশের কোনো অর্থনীতিবিদরাই প্রধানমন্ত্রীর নগদহীন অর্থনীতির রাজনীতির সাথে সহমত পোষণ করতে পারছেন না। প্রধানমন্ত্রী বলছেন নগদ লেনদেন মানেই দুর্নীতি, নগদ অর্থ মানেই নকল টাকা, কাগুজে মুদ্রা মানেই গুরুত্বহীন একটি কাগজ, এসব কথার সাথে বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদরা সহমত পোষণ করছেন না। তাদের একজন তো প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই সিদ্ধান্তকে ১৯৭২ সালে উগান্ডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইদ্দি আমিনের ৩মাসের মধ্যে সব ভারতীয়দের দেশ ত্যাগ করার নির্দেশের সাথে তুলনা করেছেন। বলেছেন ইদ্দি আমিনের সিদ্ধান্তে উগান্ডার কয়েক হাজার মাত্র মানুষ, যারা আবার উচ্চবিত্তের ধনী মানুষ, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ভারতের ক্ষেত্রে আপামর জনগণ এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেউ কেউ এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি তুঘলকি কাণ্ড, চরম অব্যবস্থা এবং জনগণের অর্থ সংগঠিত ও আইনসম্মতভাবে লুট (Organised loot and legalised plunder) বলে অভিহিত করেছেন। একজন তো এই সিদ্ধান্তকে দর্শকাসনে পরিপূর্ণ একটি নাট্যপ্রেক্ষাগৃহে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটিয়ে পদপৃষ্ট করে দর্শকদের মৃত্যুর সাথে তুলনা করেছেন। কেউ বলেছেন এই সিদ্ধান্ত গরিব, দলিত ও আদিবাসীদের ভবঘুরেতে পরিণত করছে। ভারতে নগদ লেনদেন হয়ে থাকে দেশের আর্থিক লেনদেনের ৯০ শতাংশ। চীনের ক্ষেত্রে ৮০ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ৪৬শতাংশ। নগদ অর্থনীতির সাথে একটি দেশের সামাজিক ও আর্থ-সামাজিক সম্পর্কও সম্পৃক্ত। নগদ লেনদেন মানেই দুর্নীতি, নকল টাকা একথা সঠিক নয়।

(৫)

দেশের প্রতিটি ক্ষেত্র প্রধানমন্ত্রীর নোট বাতিল ও নগদহীন অর্থনীতির রাজনীতির ফলে ইতিমধ্যেই চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অসংগঠিত ক্ষেত্র, কৃষি, মজুরিভিত্তিক শ্রমিকরা। এই যে এক দুর্ভোগ ও দুর্দশার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ১৩০ কোটি মানুষের দেশকে ফেলে দিলেন তা অহেতুক, অকারণে। প্রধানমন্ত্রীর মনে হয়েছে তাই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। তিনি খুব পরিকল্পিতভাবে সংসদকে বারেবারে এড়িয়ে যাচ্ছেন। সাংসদদের মুখোমুখি হতে তিনি ভয় পাচ্ছেন। এখন তো বোঝা যাচ্ছে দুর্নীতি রোধ, কালো টাকা, সন্ত্রাসবাদ এসব কোনো বিষয়ই নয়, আসল কথা তাঁর মরজি, তাঁর ইচ্ছে। তিনি চান তার ভাবমূর্তি। তিনি ভোটে জিতেছেন সুতরাং জনগণ তাকে যা ইচ্ছে তাই করার অধিকার দিয়েছেন। এমনটাই মনে করছেন তিনি। সত্যি সত্যি প্রধানমন্ত্রী জনগণের বহু কষ্ট, শ্রমের মধ্য দিয়ে অর্জিত অর্থ ছিনিয়ে নিয়েছেন। প্রায় ১৫লক্ষ কোটি টাকা যা ব্যাঙ্কে প্রবেশ করেছে। তার বেশির ভাগই সাধারণ মানুষের। সাথে কিছু কালো টাকাকে সাদা করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, তাও সবাই বুঝতে পারছেন। আমাদের দেশের যত কালো টাকা বা দুর্নীতির সৃষ্টি হয়ে থাকে তার সিংহভাগ কর্পোরেট ক্ষেত্রের দুর্নীতি। কালো টাকা সৃষ্টির মূল উৎসই এই ক্ষেত্র। সত্যিই যদি কালো টাকা উদ্ধার করার তাঁর সদিচ্ছা থাকে তবে চলতি আর্থিক বছরেই ১.১৪ লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট ক্ষেত্রের ঋণকে তামাদি ঘোষণা করলেন কেন? কেন বিজয় মালিয়ার মতো একজন দুর্নীতিগ্রস্তর ব্যাঙ্ক ঋণের টাকা মাপ করে দেওয়া হলো? কেনই বা প্রতি বছর কর্পোরেট ক্ষেত্রকে যে কর বা শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়ে থাকে, যা ছিল বছরে ৫লক্ষ কোটির বেশি নয়, মোদীজীর আমলে তা বৃদ্ধি পেয়ে বছরে ৬লক্ষ কোটি টাকা হলো? গত কয়েক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যঙ্ক থেকে নেওয়া ১১লক্ষ কোটি টাকার ঋণ অস্তিত্বহীন বা অনাদায়ে (Non Performing Assets) হয়ে আছে কেন? কেন চিট ফান্ডে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?

(৬)

ভারতের বাস্তবতা না বুঝে তিনি ভারতের আর্থিক ব্যবস্থাকে নগদহীন করতে চাইছেন। অথচ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের মাত্র ৫৩শতাংশ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তাও সকলে ব্যবহার করে না। বাকিদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই। ঘটা করে যে জনধন যোজনা চালু করা হলো তার মধ্যে ৭২শতাংশের অ্যাকাউন্টে অর্থ রয়েছে শূন্য (বিশ্ব ব্যাঙ্ক জুলাই ২০১৫)। কার্যত ভারতের অর্থনীতি ও বাজারগুলি শুকিয়ে যাচ্ছে। জি ডি পি ক্রমহ্রাসমান, পরিযায়ী শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে যাচ্ছে। পঞ্চায়েত, পৌরসভার কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বিভিন্ন রাজ্যে অর্থনৈতিক কার্যাবলির অধোগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন ৫০দিনে বহু পৌরসভার কর আদায় বেড়েছে। তা কিন্তু সাময়িক। ইতিমধ্যে কেরালা রাজ্য সরকার কয়েকজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের নিয়ে নোট বাতিলের নীতি কিভাবে সেই রাজ্যের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তা নিয়ে সমীক্ষা করতে একটি কমিটি গঠন করেছে। বিশেষ করে যে রাজ্যের অর্থনীতির মূল ভিত্তি বিদেশ থেকে টাকা প্রেরণ (Remitence), পর্যটন, সমবায় ব্যবস্থা, আর্থিক ব্যবস্থা ইত্যাদি খতিয়ে দেখবার জন্যে এই কমিটি সম্প্রতি তাঁদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে রাজ্য সরকারের কাছে। তাতে বিপুল ক্ষতির প্রমাণ মিলেছে সেই রাজ্যে। একই অবস্থা অন্যান্য রাজ্যেও।

নরেন্দ্র মোদীজী স্বচ্ছ ভারতের স্লোগান দিয়ে যেভাবে সরকারি অর্থ ব্যয় করে প্রচারের ফানুস তুলেছিলেন, কাজের কাজ কী হয়েছে সে নিয়ে উঠছে অনেক প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী এখন নতুন স্লোগান দিয়েছেন স্বচ্ছ ভারতের মতো, ভারতকে দুর্নীতি মুক্ত ও অপরিষ্কার মুদ্রা পরিষ্কার করার। অথচ দেশের দুর্নীতি ও কালো টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের, বিগত ইউ পি এ সরকার থেকে কিছু কম ভূমিকা আছে কি? নইলে তার দলের নেতাদের বিরুদ্ধে, কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্যের তাঁর দলীয় মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও কালো টাকা সৃষ্টি ও ব্যবহারের অভিযোগ আসে কিভাবে? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নামও যেখানে এসে যাচ্ছে। হিসেব বহির্ভূত কোটি কোটি টাকার যারা মালিক তাদের অনেকেই তাঁর দলের নেতা বা মন্ত্রী। এক বিয়েতেই ৫০০ কোটি টাকা খরচ করার মতো সামর্থ্য রাখে এসব নেতারা। তাহলে এই দলের শাসনে কি ভারত স্বচ্ছ ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত হতে পারে? রাজনীতিতে হিংসা, দুর্নীতি কালো টাকা এখন তার আমলে আরোও বেশি বেড়ে গেছে।

এমন একটি দল এ রাজ্যে নোট বাতিল কাণ্ডের বিরোধিতায় গলা চড়াচ্ছে, তাদেরও কি কোনো নৈতিক অধিকার আছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খোলার? এই দলটি আদ্যপ্রান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত। যখন সেই দলের নেত্রীর সহকর্মীরা একের পর এক জেল যাত্রা শুরু করেছেন, মাঝে নেত্রী কিছু ম্যানেজ করতে পারলেও, আবার সেই যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। নোট বাতিল পরবর্তীকালীন পর্বে এসবেরও হিসেব নিকেশের মধ্যে নিতে হবে।

(৭)

অর্থনীতির সাধারণ যে কোনো ছাত্রই বোঝেন ব্যাঙ্কের হাতে এখন অতিরিক্ত টাকা জমা রয়েছে। অথচ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেবার আবেদনকারীর বা ঋণ গ্রহীতার সংখ্যাও অনেক কম। স্বাভাবিকভাবে সুদের হার কম হওয়াই স্বাভাবিক। বিনিয়োগকারী ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছে না। কারণ উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কম। কারণ মানুষের হাতে টাকা নেই। মানুষ অতি প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া অন্য কিছু কিনতে আগ্রহী হচ্ছে না, ফলে উৎপাদক, উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে কর্মী ছাটাই হবে। নতুন করে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে না। মানুষের আয় আরও কমবে। সরকারও ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে কোথাও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে না। সামগ্রিকভাবে এভাবে দেশের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যাবে। এত বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস ও অকর্মণ্য হয়ে থাকবে। যা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। এর সাময়িক সুরাহা হতে পারে জনগণের টাকা জনগণকে ফিরিয়ে দিয়ে। অহেতুকভাবে এর ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ অনৈতিক, অসাংবিধানিক ও অমানবিক। এখন প্রয়োজন অর্থ ও পণ্যের লেনদেন ও বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।