বিদায়ী ভাষণের আবেগ
ঢাকতে পারেনি ওবামার ব্যর্থতাকে

সংবাদসংস্থা

শিকাগো, ১১ই জানুয়ারি— বহুবার বলেছেন, তবু শেষবারের মতো বললেন: ‘হ্যাঁ, আমরা পারি।’

আসলে সিদ্ধান্ত টানার জন্য মুখবন্ধ মাত্র, উপসংহার: ‘হ্যাঁ, আমরা পেরেছি।’

এই প্রথম, কোনও মার্কিন রাষ্ট্রপতির বিদায়ী ভাষণ ওয়াশিংটন ডিসির বাইরে। শিকাগোর শহরতলিতে, ম্যাককরমিক কনভেনশন সেন্টারে আঠারো হাজারের উদ্বেল জনতার কেন্দ্রে তিনি তখন দৃশ্যতই ‘রকস্টার’। তিনি বারাক হোসেন ওবামা। দেশবাসী উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণে। মঙ্গলবার রাতের আকাশে তখন আলোর রোশনাইয়ে ভাসছে মার্কিন পতাকা, তার আগেই সুর বেঁধে দিয়েছে রক ব্যান্ড ইউ-টু। সমর্থকদের সম্মিলিত দাবি, ‘আরও চার বছর, আরও চার বছর’।

৫১-মিনিটের ভাষণ। কখনও আটবছরের স্মৃতি রোমন্থন করলেন, দাবি করলেন তাঁর সময়ের অগ্রগতি-সাফল্য, কখনও-বা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন, আবার কখনও চোখ ভেজালেন স্ত্রী মিশেলকে উষ্ণ আলিঙ্গনে। ৪,৩০০শব্দের ভাষণে একবারই মাত্র উচ্চারণ করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম। যদিও, গোটা ভাষণেই ছিল ট্রাম্পের প্রতি অস্বীকৃতি। সতর্ক করলেন ট্রাম্পের উগ্র বর্ণবিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষ, মুসলিম-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে। সজাগ করলেন গণতন্ত্র রক্ষার জন্য। তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন ‘মার্কিন মূল্যবোধ’, যদিও তাঁকে বলতে হয়েছে, ‘আমরা এমন একটি জাতি, যে জাতি গঠিত হয়েছে অভিবাসীদের নিয়েই এবং চিরকাল আমরা অভিবাসীদের জাতি হয়েই থাকব।’

‘আজ যদি আমি বলি, আট বছর আগে এই আমেরিকা মহামন্দা থেকে মুখ ঘুরিয়েছে, চাঙ্গা করেছে অটো ইন্ডাস্ট্রিকে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ঘটিয়েছে আমাদের ইতিহাসে দীর্ঘতম বিস্তার, যদি আমি বলি, কিউবার জনগণের সঙ্গে আমরা খুলেছি একটি নতুন অধ্যায়, একটিও গুলি খরচ না করে ঝাঁপ বন্ধ করেছি ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির, খতম করেছি ৯/১১-র মূলচক্রীকে, যদি আমি বলি, আরও ২কোটি নাগরিকের জন্য আমরা সুনিশ্চিত করেছি স্বাস্থ্যবিমাকে— আপনারা নিশ্চিত বলবেন, আমাদের দৃষ্টিশক্তি ছিল বেশ উঁচুতে।’ খানিক থেমে ওবামার দাবি, ‘কিন্তু, এসবই আমরা করেছি, এসবই আপনার করেছেন। আপনার পরিবর্তন করেছেন। আপানাদের জন্যই, প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপে, আজ আরও উন্নত আমেরিকা, যখন শুরু করেছিলাম, এখন তার চেয়ে অনেক শক্তিশালী অবস্থানে।’

সামাজিক অগ্রগতির এমন চিত্তাকর্ষক রেকর্ড, বিদেশনীতির এমন সাফল্যের পরেও কেন তাঁর দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে রাজনীতিতে তথাকথিত আনকোরা ট্রাম্পের কাছে হারতে হলো, তার কোনও ব্যাখ্যা যথারীতি এড়িয়ে গিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি। একবারও বলেননি হিলারি ক্লিন্টনের ব্যর্থতা আসলে তাঁর পরাজয়।

ওবামার আট বছর মানে— নয়া উদারনীতির বিনিয়ন্ত্রণ, বেসরকারিকরণ, কঠোর ব্যয়সংকোচ, কর্পোরেট বাণিজ্যের দৌরাত্ম্যে দুর্বিষহ মানুষের জীবন। তাঁরা হারিয়েছেন কাজ, হারিয়েছেন পেনশন। তাঁরা হারিয়েছেন নিরাপত্তার সমস্ত রক্ষাকবচ। প্রায় ৫কোটি মানুষ, সাড়ে ৩২কোটি জনসংখ্যার ১৫শতাংশ, গরিব। বেকারির হার সরকারি হিসেবেই ৫শতাংশ, আসলে ১০শতাংশের কাছাকাছি। চার দশক ধরে মার্কিন শ্রমজীবী জনগণের মজুরি দাঁড়িয়ে আছে একই জায়গায়। কমে চলেছে ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান। আক্রান্ত মধ্যবিত্তরা। গত মাসেই প্রকাশিত সমীক্ষায় অসহায় আর্তনাদ, ২৩ বছরে এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কমেছে গড় আয়ু। আট বছর মানে বিপুল অঙ্কের ‘ডোল’ আর্থিক ক্ষেত্রকে। তবু বিকাশের অর্থনীতিতে রক্তাল্পতা। বেড়েছে অবিচার, অসাম্য, সামাজিক বৈষম্য। ২০০৮, শেষ তিনমাসে কর্পোরেট মুনাফা যেখানে ছিল ৬৭,১০০কোটি ডলার, ২০১৬তে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১লক্ষ ৬৩হাজার কোটি ডলারে। এই সময়ে ধনিশ্রেষ্ঠ ৪০০জন মার্কিন নাগরিকের সম্পদের অঙ্ক ১.৫৭ট্রিলিয়ন (এক লক্ষ কোটি) ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ২.৪ট্রিলিয়ন ডলার।

যে কারণে মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটারদের ৫২শতাংশই বলেছিলেন, নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো অর্থনৈতিক সংকট। দ্বিতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর ১৮শতাংশের চেয়ে যা ছিল অনেক উপরে। ৬৮শতাংশই বলেছিলেন, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা চার বছর আগের তুলনায় হয় একই আছে, না হলে আরও খারাপ হয়েছে। ৩৯শতাংশ বলেছিলেন, তারা এমন একজন প্রার্থীকে চান যিনি ‘আনতে পারেন পরিবর্তন’।

বিদায়ী ভাষণে তবু দাবি করেছেন, ‘প্রতিদিন আমি শিখেছি আপনাদের থেকে। আপনারাই আমাকে তৈরি করেছেন আরও উন্নত একজন রাষ্ট্রপতি, আরও উন্নতমানের একজন মানুষ।’ আসলে কোনও শিক্ষাই নেননি। যে কারণে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি পেয়েছে ধনীদের সমর্থন, আর হারিয়েছে গরিব-মধ্যবিত্তের ভোট।

এই সময়েই শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন মার্কিন ‘দ্রোন’ রাষ্ট্রপতি ওবামা।

আর এই সময়ই সাত-সাতটি যুদ্ধ। প্রতিদিন দ্রোন হামলা। পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, লিবিয়াতে। তিনজন মার্কিন নাগরিকসহ ৩হাজারের বেশি মৃত্যু। মার্কিন স্পেশাল অপারেশন ফোর্স এখন ১৩৮টি দেশে, বিশ্বের ৭০শতাংশ দেশে।

এই সময়ে চলেছে আফগানিস্তানে যুদ্ধ। ইরাকে এখনও ইয়াঙ্কি সেনা। মার্কিন দ্রোন হত্যা করেছে লিবিয়া ও তার রাষ্ট্রকে। গুড়িয়ে দিয়েছে নৃশংসভাবে। সিরিয়ার সার্বভৌমত্বকে অবজ্ঞা করে হামলা চালিয়েছে ভাড়াটে সেনা দিয়ে। ইউক্রেনের অভ্যুত্থানে স্থানীয় অলিগার্কি ও ফ্যাসিবাদী শক্তিকে দিয়েছে মদত। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা বসছে ইউরোপে, এশিয়াতে। ইরানের সঙ্গে চুক্তি হলেও, তা এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের অপেক্ষায়।

কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্প্রতিষ্ঠার কিছু পদক্ষেপ নিলেও, এখনও দস্তুরমতো জারি রয়েছে অবরোধ। আট বছরে রয়ে গিয়েছে গুয়ানতামো সেনা ঘাঁটি।

এই সময়েই ‘এশিয়া কেন্দ্রবিন্দু’ নীতি দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনায় নতুন করে জ্বালানি জুগিয়েছে। ফিরিয়ে এনেছে গত শতকের ‘ঠান্ডা যুদ্ধের’ আবহ।

এই সময়েই লাতিন আমেরিকায় অভ্যুত্থানে মদত, ভেনেজুয়েলায় নিষেধাজ্ঞা, মাদুরো সরকারকে হটাতে মদত।

তিনি যেমন কেনেডি কিংবা বিল ক্লিন্টন নন, তেমন ট্রাম্পও নন। জানে বিশ্ব। মিশেলকে রেখে তাই বলেছেন, ‘পঁচিশ বছর ধরে তুমি শুধু আমার স্ত্রী, কিংবা আমার সন্তানের মা না, আমার প্রিয়তম বন্ধু। তুমি সবার জন্য খুলে দিয়েছ হোয়াইট হাউসকে। আমায় গর্বিত করেছ, গর্বিত করেছ দেশকে।’

শুনতে ভালো লাগলেও, মুহূর্তের জন্য আবেগ ছুঁয়ে গেলেও আসলে হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা ছিলেন ওয়াল স্ট্রিটের বন্ধু। সেকারণেই অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট। অকুপাই আন্দোলন। তাঁর নীতিরই ‘বাইপ্রোডাক্ট’ ট্রাম্প, যিনি দায়িত্ব নিতে চলেছেন ন’দিন বাদে।

=================



যাবার বেলায়...



প্রায় ৫কোটি মানুষ গরিব।

কর্মসংস্থানের সঙ্কট তীব্র, বেকারির হার প্রায় ১০শতাংশ।

হতাশ দেশের জনগণই।

নোবেল শান্তি পেলেও মার্কিন সেনা হস্তক্ষেপ একের পর এক দেশে।