কিষানমান্ডিতে গিয়ে বিক্রিতে উৎসাহ নেই কৃষকদের

ধান কেনায় রাজ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে কোচবিহার জেলা

নিজস্ব সংবাদদাতা

মাথাভাঙা, ২০শে মার্চ — কোচবিহার জেলায় ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারছে না কোচবিহার জেলা খাদ্যদপ্তর। রাজ্যের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ইতিমধ্যে দু’বার কোচবিহারে ঘুরে গেছেন। সারা রাজ্যের মধ্যে ধান কেনাতে সব চাইতে পিছিয়ে এই জেলা।

কৃষকেরা খোলাবাজারে কম দামে ধান বিক্রি করলেও সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে উৎসাহী নন। এই বিষয়ে শীতলকুচির ধানচাষি সৌমেন বর্মণ বলেন, কৃষকরা তো আর আর্থিক ক্ষতি মেনে নিয়ে কম দামে সরকারের কাছে ধান বিক্রি করবে না।

তাঁর কথায় সুর মেলালেন গোঁসাইয়ের হাটের অবিনাশ বর্মণ। কৃষকরা কিষানমান্ডিতে গিয়ে ধান বিক্রি করলে সরকার ১৪৯০টাকা দিচ্ছে। একথা ঘোষণা করা হলেও বাস্তব ছবিটা একেবারেই আলাদা। কিষানমান্ডিতে ধান বিক্রি করতে গেলে কুইন্টাল পিছু চার থেকে পাঁচ কেজি বাট্টা কেটে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও পরিবহণ বাবদ বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। যেখানে ২কিমি গেলেই হাটে পৌঁছে ধান বিক্রি করা যায়, সেখানে ৪০কিমি দূরে কিষানমান্ডিতে ধান বিক্রি করতে যেতে হয় কৃষকদের। তাই কৃষকরা কিষানমান্ডিতে ধান বিক্রির উৎসাহ হারাচ্ছেন।

ধান কেনা ও ওজন করে লরিতে তুলতে কৃষকদের কাছ থেকে লেবার চার্জ বাবদ কখনও ১০টাকা আবার কখনও ৫টাকা করে কাটা হচ্ছে। অথচ কিষানমান্ডিতে ধান ওজন করে নেওয়া ও লরি লোডিং করার জন্য রাজ্য সরকার প্রতি কুইন্টাল ১০টাকা করে দেয় মিল মালিকদের। তাই কিষানমান্ডিতে ধান বিক্রি করতে যাওয়া কৃষকদের অভিজ্ঞতা মোটেই ভালো নয়।

একই অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন মেখলিগঞ্জের ধানচাষি অধীর রায়। তাঁর অভিযোগ, কিষানমান্ডিগুলোতে ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেখুন ওখানে কৃষকদের নামের আড়ালে শাসকদলের ঘনিষ্ঠ ফড়েরাই ধান বিক্রি করছে। কৃষকদের অভাবী বিক্রির সুযোগ নিয়ে তারা কম দামে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে কিষানমান্ডিতে বিক্রি করছে। আর একটু বড় ফড়েরা অধিক লাভের আশায় কিষানমান্ডিতে ধান বিক্রি না করে ধান বিক্রি করছে ভিন রাজ্যে।

মাথাভাঙা, মেখলিগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষকদের অভিযোগ, ভালো বা খারাপ ধানের গুণগত মান বিচার না করেই কুইন্টাল পিছু বাট্টা বাবদ ৪/৫কেজি ধান কেটে নেওয়া মানা যায় না। তাছাড়াও ধান বিক্রির পরে ব্যাঙ্কের মাধ্যমে টাকা পেতে বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করতে হয়। ব্যাঙ্কের লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয় টাকার জন্য। এই সমস্ত দুর্ভোগ এড়াতেই ছোট মাঝারি কৃষকরা কম দামে ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন ফড়েদের কাছে।

জেলার ১২টি ব্লকের কিষানমান্ডিতে ধান কিনতে এসে মিল মালিকদের লরি অনেকদিনই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১২টি ব্লকের মধ্যে ৪টি ব্লকে সরকার ডাইরেক্ট পারচেজিং সেন্টার খোলার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে কর্মীর অভাবে যেখানে খাদ্যদপ্তরের দরজা খুলে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে জেলা খাদ্যদপ্তরের আধিকারিকরা। সেখানে ডাইরেক্ট পারচেজিং সেন্টার চালু হবে কাদের নিয়ে। তবুও মন্ত্রীর নির্দেশ বলে কথা। তৈরি করা হয়েছে একটি মোবাইল টিম। এই টিম ৪টি ব্লকে ঘুরে ঘুরে ধান কিনবে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারের এই পরিকল্পনাও কার্যত কাগজে কলমে থেকে যাবে। কর্মীর অভাবে ধান কেনা হবে না খাদ্য দপ্তরের। কৃষকদের অভিযোগগুলি নিয়ে জেলা খাদ্য ও খাদ্য সরবরাহ দপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কিষানমান্ডিতে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার সময় কুইন্টাল পিছু ৪কেজি করে বাট্টা নেওয়া হয়। তবে ধান ওজন ও লরি লোডিং করার সময় ১০টাকা লেবার চার্জ নেবার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

খাদ্যদপ্তর কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য একের পর এক নির্দেশ জারি করলেও প্রশাসনিক পরিকল্পনাহীনতার জন্যই জেলাজুড়ে কৃষকের অভাবী বিক্রি চলছে।