আর্সেনিক দূর করতে ব্যবহার করা যাবে চায়ের পাতা

অপরাজিত বন্দ্যোপাধ্যায়

কলকাতা ২০শে মার্চ— জলে আর্সেনিক তাড়াতে এবার ব্যবহার করা যাবে চায়ের পাতা। পানীয় জলে আর্সেনিক দূষণ ঠেকাতে নয়া কৌশলের খোঁজ দিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। দুই বছর বেশি সময় রাজ্যের পানীয় জলকে আর্সেনিক দূষণ নিয়ে লাগাতার গবেষণা করে সম্প্রতি এমনই সাফল্য পেলেন অধ্যাপক ভট্টাচার্য। আগামী দুই মাসের মধ্যেই প্রাকৃতিক উপাদান তৈরি ঐ পদার্থকে ব্যবহারিক প্রয়োগের পথে নামবে কেন্দ্র।

অধ্যাপক চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, শুধু ফেলা দেওয়া চায়ের পাতা নয়, ভূগর্ভস্থ জলের আর্সেনিক তাড়াতে গাছের পাতা, নারকেলের মালা, ডাবের খোলাকে ব্যবহার করেও ভালো ফল মিলেছে। গবেষণা ফলের সবটাই তিনি হাতেনাতে প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তবে ফেলা দেওয়া ওইসব উপাদানের সামান্য গুণগত মানের পরিবর্তন করতে হয়। আর সেই কারণের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক পেটেন্টের আবেদন করতে বাধ্য হয়েছেন।

আবিষ্কারক বিজ্ঞানী অধ্যাপক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, প্রথমে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের একটি বৈজ্ঞানিক প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী সংস্থা হিসাবে তাঁর বিভাগ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ শুরু করে। ইউরোপীয়ানের ইউনিয়নের দুই দেশ বেলজিয়াম এবং স্পেনের সঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই গবেষণায় যোগ দিয়েছিল কলকাতার আইসার। ওই গবেষণা চলতে চলতেই রাজ্যের আর্সেনিক দূষক ঠেকাতে নতুন পরিকল্পনার কথা মাথায় আসে অধ্যাপক ভট্টাচার্যের।

ভূগর্ভস্থ জলের পরিশোধন করতে প্রধানত দুটি পরিস্রুতকরণ পদ্ধতির সন্ধান মিলেছে। একটি প্রাকৃতিক শোষক (বায়ো অ্যাবজরবেন্ট) পরিশোধন আর দ্বিতীয়টি ন্যানো প্রযুক্তির ছাঁকনি। সাধারণভাবে কী কী থেকে ওই প্রাকৃতিক শোষক তৈরি করা যায় সেই দিকে নজর ছিল অধ্যাপক ভট্টাচার্যের। কারণ এতে তৈরি ফিল্টার ক্যানডেল খরচ পড়ে খুব কম। ফেলে দেওয়া চা, গাছের বড় পাতা, নারকেলের মালা কিংবা ডাবের খোলা আকছারই পাওয়া যায়।

অন্যদিকে, ছাঁকনি হিসাবে এর আগে অনেক ন্যানো পদ্ধতি তৈরি কাপড়ের সন্ধান পাওয়া গেলেও তা সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। কারণ এই ছাঁকনির কাপড় দিয়ে জল পড়ার গতি ছিল বেশ কম। এখানে পরিবেশে সহজে মিশতে পারা এক প্রাকৃতিক উপাদানকে ওই ফিল্টারে ব্যবহার করে সাফল্য এসেছে। কারণ ওই উপাদান জলের আর্সেনিককে ‘দলা’ পাকিয়ে দেয়। ফলে বড় কাপড়েই ওই আর্সেনিক ছাঁকার কাজটি হয়ে যায়। জলের ফ্লো’-তে কোন প্রভাব পড়ে না।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দেখানো দুটো পদ্ধতিই নজর কেড়েছে কেন্দ্রের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তরের। এই জন্যই কেন্দ্রের ওয়াটার টেকনোলজি ইনিশিয়েটিভ প্রোগ্রামে (ডব্লিউ টি আই) পাঠানো মাত্রই তা অন্তর্ভুক্তি হয়েছে। কম খরচে দেশীয় প্রযুক্তিতে জলের ফিল্টার বানাতে কেন্দ্র নতুন পরিকল্পনা শুরু করেছে। প্রত্যন্ত গ্রাম, গ্রামাঞ্চলে পরিশুদ্ধ পানীয় জলের সমস্যা কাটাতে ড. ভট্টাচার্যের এই খোঁজকে কাজে লাগানো হবে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ব্যবহারিক পরীক্ষা শুরু করবে কেন্দ্র।

রাজ্যের আর্সেনিকের সমস্যা ক্রমাগত বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উত্তর ২৪পরগনা, দক্ষিণ ২৪পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকা আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত। আর্সেনিক দূষণ ঠেকাতে এর আগে অনেক পদ্ধতির খোঁজ মিললেও কোনটিই সাধারণ মানুষের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য হয়নি। এবারের প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি এবারের প্রাকৃতিক পরিশোধকের দাম অনেক কম। সাধারণ গ্রামীণ মানুষও অনেক কম দামে তা ব্যবহার করতে পারবেন।

জলের দূষণ নিয়ে এর আগে বহু গবেষণা করেছেন অধ্যাপক চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। দক্ষিণ ২৪পরগনার বানতলার ট্যানারি থেকে নোংরা জলে থেকে মারাত্মক তেজস্ক্রিয় ক্রোমিয়ামকে নিষ্ক্রমণ করতে তিনিই পথ দেখিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করতে গিয়ে চামড়া শিল্পের উপজাত নোংরা জল পরিবেশবান্ধব হয়েছে। অধ্যাপক ভট্টাচার্য এখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান (ডিন) হিসাবে কাজ করছেন।

তিনি জানাচ্ছেন, জনস্বাস্থ্যকর গবেষণায় কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক অনুদান এখন পড়তির দিকে। তাই আরো গবেষণা মাঝপথে থেমে আছে। তবুও বিভিন্ন সংস্থাদের সঙ্গে যৌথভাবে জলের পরিশুদ্ধতা নিয়ে তিনি নানা গবেষণা চালিয়ে চলেছেন। জল পরিশোধনের বিভিন্ন গবেষণায় অধ্যাপক চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের সঙ্গে একক কিংবা যৌথভাবে গবেষণা করছেন ড. সিদ্ধার্থ দত্ত, ড. অভিজিৎ ভাওয়াল, ড. পাপিতা দাস প্রমুখ।