বিরাটদের মুখ থেকে জয়ের গ্রাস কাড়লেন স্মিথরা

প্রশান্ত দাস

রাঁচি,২০শে মার্চ— ঠিক কি করলে জয় আসতো! কি করতেন ধোনি থাকলে! চার বোলারকেই খেলিয়ে যেতেন? কাউকে এনে একটু ফাটকা খেলতেন না? চমক দিতে বৈচিত্র্য আনতেন? কিংবা স্লেজিং করে বিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন?

একে একে উঁকি দিয়ে গেল প্রশ্নগুলি। সমাধান সম্ভব নয়।

কতটুকুই বা দূরত্ব! দশ গজ, বা বিশ গজ। ছিলেন তো তিনি স্টেডিয়ামেই। জায়ান্ট স্ক্রিন তাঁর ছবি দেখালেই তো গ্যালারি ফেটে পড়ছিল। ধোনির উপস্থিতিতে মাত্র আটখানা সেরা বল করলেই তো ম্যাচ পকেটে চলে আসে। ওই যে কথায় রয়েছে, চায়ের কাপ ও ঠোঁটের দূরত্ব কিছুক্ষেত্রে যোজন পথ পেরিয়ে যায়! অনেক কিছুই করতে পারতেন বিরাট কোহলি, কিন্তু পারলেন কই? পিটার হ্যান্ডসকম্ব আর শন মার্শই তো বিরাটের সব পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিলেন। রবিবারের শেষ প্রহরে স্বপ্নের জাল বুনেছিল মন। ভারত জিতবে। অস্ট্রেলিয়া ক্যাঙারু শিশুর মতো একটু লাফালাফি করলেও ধরা দেবে। সোমবার বেলা যত গড়িয়েছে, ভারতের জয়ের সম্ভাবনাও ততই ঢলে পড়েছে পশ্চিম প্রান্তে। জয় তখন অতীত। অস্ট্রেলিয়া ড্র করেছে। ধোনি প্রেসিডেন্সিয়াল বক্সে বসে বসে চেয়ে চেয়ে দেখলেন দলের অপারগতা। চারদিনে অনেক ওঠাপড়া হয়েছে। নতুন নতুন বিতর্ক জন্ম নিয়েছে। নতুন নজির সৃষ্টি হয়েছে। কাঁধে হাত, স্মিথের ইনিংস, পূজারা-ঋদ্ধির ভিনটেজ যুগলবন্দি, জাদেজার টার্নার আরও কত কী! এত কিছুর পরেও যে দৃশ্য দেখার জন্য মন আনচান ছিল, সেই জয়ের দৃশ্যই দেখা গেলো না।

কাঁপা কাঁপা পায়েই পঞ্চমদিন শুরু করেছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু শেষমেশ আটকে যেতে হয়েছে ১২৪ রানের জুটি গড়ে তোলা হ্যান্ডসকম্ব ও মার্শের কাছে। প্রথম ইনিংসে অপরাজিত ১৭৮রানের ইনিংস খেলার পর সব চোখ স্মিথের উপরই আটকে ছিলো। প্রত্যাশার সেই চাপ নিতে পারেননি অসি অধিনায়ক। ম্যাট রেনশঁ’র সঙ্গে মিলে শেষদিনের শুরুটা ভালোই করেছিলেন। দিনের প্রথম সেশন শেষ হওয়ার আগেই জাদেজার শিকার। যেভাবে ওয়ার্নার, যেভাবে নাইটওয়াচম্যান নাথান লিয়ন আউট হয়েছিলেন। সেভাবেই জাদেজার বল সামান্য মোচড় নিয়ে অফ স্টাম্প উপড়ে দেয়। ২১ রানে ফিরে যান স্মিথ। তরুণ রেনশঁ যদিও তার আগের ওভারেই ঈশান্ত শর্মার বলের ফাঁদে ফেঁসে লেগ বিফোর হন। পরপর কয়েকটা বাউন্সারের পর আচমকাই লো-বল করেন ঈশান্ত। আম্পায়ার ইয়ান গোল্ড আর না বলতে পারেননি। দিনের শুরুও ভালোই হল। ৬৩ রানে ৪ উইকেট।

যা শুরু হয়েছিল তা শেষ করতে পারেনি ভারত। ম্যারাথন ইনিংস খেলেন হ্যান্ডসকম্ব আর মার্শ। গতকাল পূজারা আর ঋদ্ধির যে মহাকাব্যিক ইনিংস ভারতকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই স্বপ্নই ফিকে করতে থাকে মার্শের ৫৩ রানের ইনিংস। ভারত যে একেবারেই জ্বলে উঠতে পারেনি তা নয়। তবে সবাই নয়। অশ্বিন সমস্তদিনে ২৬ ওভার হাত ঘুরিয়েছেন। মোট ৩০ ওভার। দিনের শেষে জালে ম্যাক্সওয়েল ছাড়া আর কোনো উইকেটই ওঠেনি। তবে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যেখানে পিচ থেকে সাহায্য পান না সেখানে অশ্বিন এত ফিকে কেন? এক স্পিনারের ঘাটতি ঢেকেছেন অপরজন। জাদেজা ৪৪ ওভার বল করেছেন। ১৮ওভার মেডেন দিয়ে চার উইকেট। স্যার জাদেজাই স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। বাকিরা তার সঙ্গ দিতে পারলেন না। আবার ভারতীয় বোলাররা জেগে উঠলেও তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। মধ্যাহ্নভোজের পর যখন উইকেট নেওয়ার দরকার ছিল সবচেয়ে বেশি তখন কেউই জ্বলে উঠতে পারেননি। মার্শের উইকেট যখন নিলেন জাদেজা তখন ৩৫রানের লিড নিয়ে নিয়েছে অসিরা।

যক্ষের মতো উইকেট আগলে রেখেছেন পিটার হ্যান্ডসকম্ব। ২০০ বলে ৭২ রান করে অপরাজিত থেকেছেন। এক সময় মনে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংসে হারানো যাবে। মরীচিকা মনে হয়েছে জয়ের সম্ভাবনা। আলেয়ার মতো হাতছানি দিয়ে ডেকেছে শুধু। ভারত কাছে যেতে পারেনি। দিনান্তে ৫২ রানের লিড নেয় ব্যাগি গ্রিন ব্রিগেডই। ৬উইকেট হারিয়ে স্কোরবোর্ডে ২০৪ রান তোলেন। আসল জয় না হোক, নৈতিক জয় পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ভারতের জয়ের স্বপ্ন পূরণ না হলেও ড্রয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার।

অভিষেক টেস্টে বৃত্তি নিয়ে পাশ করেছে রাঁচি টেস্ট। স্টিভ স্মিথ বা বিরাট কোহলি পিচ নিয়ে কেউই অসন্তুষ্ট নন। বরং খুশিই খানিকটা। ধোনিও দেখলেন তিনি যে পিচ বাছাই করে দিয়েছিলেন শেষ দিন, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাতে প্রাণ ছিল। ধিকিধিকি হয়ে জ্বলেছে শেষ বল অবধি। শুধু তাতে জিয়ন কাঠি ছোঁয়ানোর দরকার ছিল। কোহলি ও তাঁর দল যা পারেনি। যিনি পারতেন তিনি দর্শকের ভূমিকায়। নামটা বলার জন্য কোনও পুরস্কার নেই!

স্কোরবোর্ড : অস্ট্রেলিয়া ৪৫১, ২০৪/৬। ভারত ৬০৩/৯ (ডিক্লেঃ)

তৃতীয় দিন অস্ট্রলিয়ার ২৩/২এর পর।

অস্ট্রেলিয়া: রেনশঁ এল বি ডব্লু বো ঈশান্ত ১৫, স্মিথ বো জাদেজা ২১, মার্শ ক মুরলী বো অশ্বিন জাদেজা ৫৩, হ্যান্ডসকম্ব অপরাঃ ৭২, ম্যাক্সওয়েল ক বিজয় বো অশ্বিন ২, ওয়েড অপরাঃ ৯। অতিরিক্ত ১৬। মোট ২০৪/৬। উইকেট পতন : ৩-৫৯, ৪-৬৩, ৫-৮৭, ৬-১৯০।

বোলিং : অশ্বিন ৩০-১০-৭১-১, জাদেজা ৪৪-১৮-৫৪-৪, উমেশ ১৫-২-৩৬-০, ঈশান্ত ১১-০-৩১-১। * ম্যাচ ড্র। * ম্যাচের সেরা : চেতেশ্বর পূজারা।