ধর্মঘটের পথে কয়লা খনির শ্রমিকরা

জি কে শ্রীবাস্তব

বি জে পি সরকারের উত্থান দেশের মেহনতি জনগণের সাথে সাথে কয়লা মজদুরদের কাছে অভিশাপ স্বরূপ। কোল ইন্ডিয়ার মতন মহারত্ন কোম্পানির ২০ শতাংশ শেয়ার ইতিপূর্বে বিক্রি হয়ে গেছে এবং দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লাখনিতে হস্তক্ষেপের রাস্তা তৈরি করে দিয়ে‍‌ছে। বি জে পি সরকার দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লাখনি জাতীয়করণ আইনকে সম্পূর্ণভাবে সংশোধিত করে এবং বেসরকারি ক্ষেত্র হিসাবে কয়লা খনন ও বিক্রি করার জন্য অনুমতি প্রদান করে। মূল উদ্দেশ্য ছিল কোল ইন্ডিয়াকে দুর্বল করা।

একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার চা‍‌হিদার কোনো স্থিরতা না হওয়া এবং অন্যদিকে কোল ইন্ডিয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ক্ষেত্রে কোলব্লক বণ্টন করে কয়লা উৎপাদন ও খোলাবাজা‍‌‍‌রে বিক্রি করার কারণে কোল ইন্ডিয়া গত বছর (২০১৬-১৭) উৎপাদন সীমা ৫৫৪.১৩ ‍ মি‍লিয়ন টন সীমাবদ্ধ রাখে, কেননা কোল ইন্ডিয়ার স্টকে ৬৯ মি‍‌লিয়ন টন কয়লা জমা হয়েছিল।

কেন্দ্রীয় সরকার কোল ইন্ডিয়াকে দেউলিয়া বানাবার জন্য পুরোপুরি কাজ করছে। ডিভিডেন্ড হিসাবে শেয়ার হোল্ডারদের প্রচুর টাকা কোল ইন্ডিয়াকে ‍‌দিতে হচ্ছে। এর সাথে সাথে সরকারের নজর কোল ইন্ডিয়ার রক্ষিত তহবিল (cash reserve)-এ পড়ে। রক্ষিত তহবিল যে কোনো উদ্যোগের সমৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। সরকার এই রক্ষিত তহবিল শেষ করে দিতে চাইছে। ২০১৪তে রক্ষিত তহবিল ছিল ৬৩ হাজার কোটি টাকা। কোল ইন্ডিয়া কেন্দ্রীয় সরকারের ‍‌নির্দেশ অনুযায়ী রক্ষিত তহবিল থেকে শেয়ার হোল্ডারদের ‍‌বিশেষ লভ্যাংশ (special dividend) দিতে থাকে। এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ অনুসারে ভারত সরকারের শেয়ার ৭৯% পুনরায় ক্রয় (buyback) করে। এইভাবে রিজার্ভ ফান্ড থেকে প্রচুর অর্থ বেরিয়ে যায়। ২০১৫ সালে এই রিজার্ভ ফান্ড ৫৩০৯২ হাজার কোটি হয়। ২০১৬ সালে কমে ৩৪০০০ কোটি এবং বর্তমানে তা কমতে কমতে ৮০০০ কোটিতে এসে ঠেকেছে। এতে কোম্পানির সঞ্চালন পুঁজি working capital প্রভাবিত হয়। এমনকি কোনো কোনো কোম্পানির শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার মতোন অর্থ না থাকায় তাকে ঋণ পর্যন্ত নিতে হচ্ছে।

বর্তমানে কয়লা শ্রমিকদের সামনে তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার প্রশ্নে সি এম পি এফ-কে ই পি এফ-এ মিলিয়ে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকার নিয়েছে তা কয়লা শ্রমিকদের মধ্যে বিরাট ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের প্রথম শ্রমমন্ত্রী বাবু জগজীবন রাম উদ্যোগ ‍ ‍নিয়ে ছিলেন কয়লাখনির শ্রমিক যাঁরা ভীষণ কঠিন পরিস্থি‍‌তির মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন তাঁদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন। এই লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালে Coal Mines’ provident fund and bonus act 1948 সা‍‌‍‌লে তৈরি করেন যা পরে Coal Mines provident fund and miscellaneous provision act 1948’ হিসাবে তৈরি হয়।

ই পি এফ (Emplyoees Provident Fund) ১৯৫২ সালে তৈরি হয়। এই দুই নিয়মের মধ্যে প্রভূত পার্থক্য আছে। সি এম পি এফ-এ একজন শ্রমিক দেয় (contribution) অর্থ ১২ শতাংশ (১০.৪৮% PF ও ১.১৬% pension) সাথে সাথে কর্তৃপক্ষও ১২% দেয়। এই সুবিধার ‍‌ক্ষেত্রে বেতন রাশির কোনো সীমারেখা নেই। ই পি এফ -এ শ্রমিকদের দেয় অর্থ ১২% পি এফ-এ থাকে। মালিককে কর্তৃপক্ষের দেয় অর্থ ১২% (3.67% PF ও 8.33% pension) কিন্তু মালিক/কর্তৃপক্ষ দেয় ১২ শতাংশ অর্থ ১৫০০০ টাকা মাসিক বেতন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। ১৫০০০ টাকা মাসিক বেতনের বেশি যে শ্রমিকরা বেতন পান তাঁদের জন্য কর্তৃপক্ষ কোনো অনুদান (contribution) দেয় না। শুধুমাত্র শ্রমিকদের দেয় অর্থ জমা পড়ে। এ ছাড়া সি এম পি এফ-এর পেনশন স্কিমে ২ শতাংশ টাকা শ্রমিকরা দেন এবং কর্তৃপক্ষ প্রায় ০.৫৯ শতাংশ দেয়। সি এম পি এফ/সি এম পি এস-এ পেনশন বাবদ অর্থ শ্রমিকরা বেশি পান। অবসর গ্রহণের পর একজন শ্রমিক শেষ ১০ মাসের গড় বেতনে ২৫ শতাংশ অর্থ পেনশন বাবদ পান যা ৭০০০ টাকা থেকে ৫০০০০ টাকা পর্যন্ত থাকে। যদিও ই ‍‌পি এফ-এ কোনো শ্রমিক ৭৫০০ টাকার ‍‌বেশি পাবেন না। সরকার এই সিদ্ধান্ত আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে চলা খোলামুখ খনির ঠিকাদার ও বেসরকারি মালিকদের স্বার্থে নিয়েছে যাতে ঐ সমস্ত মালিকদের পি এফ বা পেনশন বাবদ কম পয়সা দিতে হয়।

কেন্দ্রীয় সরকার কোল ইন্ডিয়াকে ২৭৩টি কয়লাখনি বন্ধ করার ‍‌নির্দেশ দিয়েছে যার মধ্যে উৎপাদনশীল খনি যেমন আছে সাথে সাথে এমন খনিও আছে যাদের উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে। তাদের Mines Act 1952 অনুযায়ী বন্ধ ঘোষিত করতে হবে। সরকারের বক্তব্য এই সমস্ত খনি লোকসানে চলছে, সেই জন্য বন্ধ হবে। সরকার এখনও পর্যন্ত এই রকম ভাবে ৬২‍‌টি খনি চিহ্নিত করেছে যাতে ৪২০০০ শ্রমিক প্রভাবিত হবেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তে শ্রমিকরা একমত নন। বর্তমানে কয়লা খনন প্রক্রিয়ায় এটাই বাস্তবিক যে কয়লা খনন প্রক্রিয়া নিরন্তর আগে এগিয়ে যাওয়া (dynamical activities)। এর এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে উৎপাদন বাড়ানো, সুংবদ্ধ পরিকল্পনা (comprehensive program) প্রয়োজন অনুযায়ী পুঁজি লাগানো, ও Hi-tech machinery এই শর্ত সমূহ খনন প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যদি এই শর্তপূরণে কোনো একটিতেও অবহেলা হয় তাহলে কয়লাখনি অসুরক্ষিত হবে এবং লোকসান হতে আরম্ভ হবে। এই শর্ত পূরণ করার দা‍‌য়িত্ব সরকার ও কর্তৃপক্ষের উপর বর্তায়। যদি আমরা/কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় সরকারের কয়লা মন্ত্রকের পরিকল্পনা (‍‌ যোজনা) লক্ষ্য করি তাহ‍‌লে এটা স্পষ্ট হয়ে যায়।

ই সি এল-এ বিষয় যদি উদাহরণ নেওয়া যায় তাহলে বর্তমানে ৮৪টি কয়লাখনি চলছে, তার মধ্যে ৬৮‍‌টি খনি ভূগর্ভস্থ (underground mines)। কর্তৃপক্ষের কথামত এর মধ্যে ৬৬টি কয়লাখনি লোকসানে চলছে। কর্তৃপক্ষের Action plan অনুযায়ী ১০টি কয়লাখনি পুরোপুরি যান্ত্রিকীকরণ (mass production technology) করা হবে। এতে ১২.৬০ মিলিয়ন টন উৎপাদন হবে। এখন ৬৮টি ভূগর্ভস্থ খনিতে ৮ মিলিয়ন টন উৎপাদন হয়। উপরোক্ত ১০টি কয়লাখনি ঠিকা পদ্ধতিতে (out sourcing) পদ্ধতিতে নিয়ে যাবে এবং সমগ্র উৎপাদন প্রক্রিয়া ঠিকা শ্রমিক দ্বারা হবে। সরকারি স্থায়ী (permanent) শ্রমিকের সংখ্যা কম করতে চাইছে। বর্তমানে কোল ইন্ডিয়ার শ্রমিকদের সংখ্যা ৩১৮০০০, তার মধ্যে ই সি এল-এ ৬৪০০০। ই সি এল কর্তৃপক্ষের কথা অনুযায়ী এই কয়লাখনিগুলির উৎপাদন খরচের ৬৫ শতাংশ শ্রমিকদের জন্য খরচ হয়। যেখানে বেসরকারি কয়লাখনিতে এই খরচ ১৬% কাছাকাছি। ‍ কোল ইন্ডিয়ার ৪১৩টি কয়লাখনির মধ্যে (বিশেষত পুরানো খনিতে) যদি প্রয়োজন মতো পুঁ‍‌জি বিনিয়োগ‍‌ না করা যায় এবং এর জন্য যদি সঠিক পরিকল্পনা না নেওয়া হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে কিছুদিনের মধ্যে কর্তৃপক্ষ ও সরকার কয়লার যথেষ্ট মজুত ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও বেশকিছু দিন খনি বন্ধ করার চক্রান্ত করবে। এতে শ্রমিকদের ছাঁটাই নিশ্চিত হবে। গত বেতন সমঝোতায় শ্রমিকরা ২৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এইবার কোল ইন্ডিয়ার উৎপাদন বৃদ্ধি হয়েছে, শ্রমিক সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে এবং মুনাফা বৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু সরকার ১৩ শতাংশ থেকে বেশি বেতন বৃ‍‌দ্ধি করতে রাজি নয়। এখনও পর্যন্ত বেতন বোর্ড (JBCCI-10) -র ৪টি বৈঠক ও সাব কমিটির ৯টি বৈঠক হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ফয়সালা হয়নি। শ্রমিকের পেনশন প্রকল্প বজার রাখার জন্য আর্থিক মদত ও অবসরগ্রহণকালীন শ্রমিকদের চিকিৎসার সুবিধার জন্য কিছু পরিবর্তন করে একটা বোঝাপড়া হয়েছে। এই সমস্ত দাবি নিয়ে ৫টি কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে ঐক্যবদ্ধভাবে কয়লা শ্রমিকরা ১৯-২১শে জুন ২০১৭ দেশব্যাপী কয়লাখনি ধর্মঘটে যাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস অনুসারী ট্রেড ইউনিয়ন বাদে ভারতবর্ষের কয়লা ক্ষেত্রে সবকটি ট্রেড ইউনিয়ন (ছোট-বড়) এই ধর্মঘটে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে। তৃণমূল কংগ্রেস অনুসারী ট্রেড ইউনিয়ন এই ধর্মঘটের বিরোধিতা করে প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমিক বিরোধী নীতিকে সমর্থন করছে। ১৬-০৬-২০১৭ তারিখে কয়লামন্ত্রকের সচিবের সাথে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নদের বৈঠক হচ্ছে। এটা নিশ্চিত কয়লাখনির শ্রমিকদের সুদৃঢ় ঐক্যের সামনে এই সরকারকে মাথানত করতে হবে নাহলে সরকারের পরিস্থিতি খুবই গম্ভীর হবে। কেননা এরপরে কয়লাখনি শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

Featured Posts

Advertisement