বিরোধীদের তোপ সামলাতেই
আগাম সাফাই মোদীর?

নিজস্ব প্রতিনিধি

নয়াদিল্লি, ১৬ই জুলাই — গোরক্ষকদের হাত থেকে কি এবার নরেন্দ্র মোদীও নিস্তার চাইছেন? নাহলে সংসদের বাদল অধিবেশনের আগে রবিবার সর্বদলীয় বৈঠকের পর তিনি গোরক্ষকদের তাণ্ডব নিয়ে এত উৎকন্ঠা, এত বাক্য ব্যয় করলেন কেন! না কী স্বঘোষিত ওই গোরক্ষকদের বর্বরতা নিয়ে সংসদে বিরোধীদের তোপের মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকেই আগাম নিজের এবং সরকারের ভাবমূর্তি ঊর্ধ্বে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা চালালেন?

দিল্লির তখতে মোদী বসার পর থেকেই দেশের সর্বত্র গোরক্ষকের নামধারী থেকে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বাড়বাড়ন্ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর গোরু রক্ষার নামে তো দেশজুড়ে চলছে তাণ্ডব, খুন-জখম-রাহাজানি। বিশেষত বি জে পি শাসিত রাজ্যগুলিতে এই গোরক্ষকদের অত্যাচার দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের মদতও পাচ্ছে তারা। বহু মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেলেও নিশ্চুপ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। শুধু তাই নয়, দেশবাসী কী ধরনের আচার-ব্যবহার করবে তাও ঠিক করে দিচ্ছে সঙ্ঘ পরিবারের বাহিনী। কিন্তু এইসব ঘটনার বিরুদ্ধ মতও জোরালো হচ্ছে, প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন বহু মানুষ। সংসদের আসন্ন অধিবেশনে বিরোধীরা যে এই ধরনের নানা ঘটনা তুলে ধরে তাঁকে বিঁধবেন তা আন্দাজ করেই সব দলের সাহায্য চাইলেন মোদী। এমনকি ওইসব গোরক্ষকদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলির, এমন কথাও শোনা গিয়েছে তাঁর মুখে।

অবশ্য এইসব গোরক্ষকদের তাণ্ডব প্রতিরোধের দায় তিনি পুরোপুরি রাজ্য সরকারগুলির উপরই চাপিয়ে দিয়েছেন। আর এই গোরক্ষকদের হাঙ্গামার জেরে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হানাহানি প্রতিরোধে বিরোধীদের সমর্থন চাইলেন। আবার এই ধরনের ঘটনার গায়ে রাজনৈতিক অথবা সাম্প্রদায়িক ‘রঙ’ চড়ানোর আরজিও জানালেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘গোরক্ষকের নামে গুন্ডামির নিন্দা, প্রতিরোধ ঐক্যবদ্ধভাবেই করা উচিত সব রাজনৈতিক দলের। ওই ধরনের সমাজবিরোধী কাজকর্ম বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত রাজ্য সরকারগুলির। এই কথাগুলি তিনি অবশ্য বৈঠকে নয়, পরে ট্যুইট করেন। এরই সঙ্গে গোরু নিয়ে নিজের আবেগ গোপন না করেই তিনি ট্যুইটে বলেছেন, ‘গোরুকে সবাই মা হিসাবেই দেখে এবং এটি একটি ভাবাবেগের বিষয়। কিন্তু আমাদের বোঝা উচিত গোরক্ষার জন্য দেশে আইন আছে এবং ওই আইন হাতে তুলে নেওয়া মোটেই বিকল্প নয়।’ তাঁর দাবি, ‘কিছু সমাজবিরোধী গোরক্ষাকে অরাজকতা সৃষ্টির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। আর যারা দেশের সামাজিক বুনোটকে ধ্বংস করতে চায়, তারাও এর থেকে ফায়দা লুটছে।’ এই ধরনের ঘটনা দেশের ভাবমূর্তিকে কলুষিত করছে বলে তিনি মনে করেন। এই প্রশ্নেই যদিও তিনি সর্বদলীয় সভায় বলেছেন, ‘রাজ্য সরকারগুলির আইন শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি সুনিশ্চিত করা উচিত। যারা ওই আইন শৃঙ্খলা হাতে তুলে নিতে চাইবে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থাই নিতে হবে রাজ্য সরকারগুলিকেই।’

গোরক্ষার নামে তাণ্ডবের প্রতিটি ঘটনার পিছনে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সামনে এসেছে। আর এই তথাকথিত গোরক্ষার নামে মুসলিম এবং দলিতদেরই আক্রমণের লক্ষ্য হিসাবে বেছে নেওয়া হচ্ছে। এর পিছনে বি জে পি-সহ সঙ্ঘ পরিবারভুক্ত সংগঠনগুলির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট। বিরোধীরা এই অধিবেশনেও মোদী সরকারকে গোরক্ষকদের তাণ্ডব নিয়ে তুলোধুনো করতে পারে আন্দাজেই এমন সাফাই গাওয়া বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এটা মোদীর বোধোদয় নয়, আত্মরক্ষার মরিয়া চেষ্টা বলেই ধারণা।

বস্তুত বিভিন্ন প্রশ্নেই বেশ কোণঠাসা অবস্থা মোদী সরকারের। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের ব্যর্থতা ঢাকতে পারছে না। মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। কূটনৈতিক প্রশ্নেও সামলাতে না পেরে সব দলের মতামত নিতে হয়েছে কয়েকদিন আগে। বাদল অধিবেশনে নানা বিষয়ে সরকারকে স্বল্প শক্তি নিয়েও বিরোধীরা প্রশ্নবাণে সরকারকে বিদ্ধ করতে পারে বুঝেই মোদীর এদিন তাদের প্রশমিত করার চেষ্টা চালালেন, এমনই অভিমত রাজনৈতিক মহলের। এদিনই যেমন সর্বদলীয় বৈঠকে দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেন মোদী। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ’ করা হচ্ছে বলে যারা আওয়াজ তুলছে, তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ের আহ্বান জানান তিনি। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ্‌দের একঘরে করার ডাকও দেন তিনি। অথচ তাঁর সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কালোটাকা উদ্ধারে এখনও পর্যন্ত কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপই নিয়ে উঠতে পারেনি।

এরই সঙ্গে জি এস টি নিয়েও বিরোধীদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে সরকারকে। একই সঙ্গে দার্জিলিঙের অশান্ত পরিস্থিতি এবং চীন নিয়ে সরকারের অবস্থানও জানতে চাইতে পারে বিরোধীরা।

Featured Posts

Advertisement