মোদী সরকারের বোধোদয়?

চীনের সঙ্গে উত্তেজনার পারদ এখন এতটাই চড়ে গেছে যে, তা কমাতে এখন তৎপর হয়ে উঠেছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এতদিন বিদেশনীতিতে একলা চলার পথে হাঁটছিলেন, চীনের বিরুদ্ধে রণংদেহী ভাব দেখাচ্ছিলেন, এখন সংসদের বাদল অধিবেশনের প্রাক্কালে হঠাৎ বিরোধী দলগুলির সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন হলো কেন? চীনের প্রশ্নে নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরূপ মনোভাব সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন ঘটনায় গোপন তো থাকেইনি, প্রকাশ্যে চলে এসে‍‌ছে। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী বেশ আগ্রাসী কায়দায় চীনবিরোধী কথাবার্তা বলে আসর গরম করার চেষ্টা করেছেন। তাদের হিন্দুত্ববাদী ঘরানায় জাতীয়তাবাদের জিগির তোলার চেষ্টা করেছেন। সঙ্ঘ পরিবারের সাধের সংগঠন স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ মোদীকে চিঠি দিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সীমান্ত উত্তপ্ত সত্ত্বেও কেন চীনের বিভিন্ন সংস্থাকে ভারতে ব্যবসা করতে দিচ্ছে সরকার? এতসবের মধ্যে উত্তেজনায় ঘৃতাহুতি দিয়েছে ভারতের সেনা-প্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের আগ্রাসী বক্তব্য। তিনি হঠাৎ ঘোষণা করেন, অন্তত ‘আড়াই ফ্রন্টে’ ভারতের লড়াই করার ক্ষমতা যথেষ্টই রয়েছে। তিনি আরও খোলসা করে বার্তা দিয়েছেন ‘‘চীন, পাকিস্তান এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে ভারত প্রস্তুত’’। সেনা প্রধানের এই বক্তব্য ভারত সরকার অনুমোদন করে কিনা সরকারিসূত্র থেকে কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি। এমনকি এ ধরনের আগ্রাসী বক্তব্যের জন্য সরকারের উচ্চতম মহল থেকে সেনা প্রধানকে সংযত থাকতে কেউ পরামর্শ দিয়েছেন কিনা তাও প্রকাশ করা হয়নি। চীন অবশ্য ভারতীয় সেনা প্রধানের বক্তব্যকে ‘‘চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন’’ বলে আখ্যা দিয়েছে। পিপলস লিবারেশন আর্মির একজন মুখপাত্র মনে করেন, এভাবে যুদ্ধের জিগির তোলা চূড়ান্ত দায়িত্বহীন। চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করা নিয়ে অতীতে বিরোধ হয়েছে। বর্তমানে ভারত, চীন ও ভুটান সীমান্তে ডোকলাম মালভূমিকে কেন্দ্র করে গত একমাস ধরে বিরোধ চলছে। এটি সিকিম সীমান্তে চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ নয়। ডোকলাম মালভূমি নিয়ে বিরোধ চীন ও ভুটানের মধ্যে। ইঙ্গ-চীন কনভেনশন অনুযায়ী ডোকলাম তিব্বতের অংশ। দুদেশের সীমান্তে কোনও বিরোধ তৈরি হলে তা আলোচনার জন্য চীন ও ভারতের যুক্ত একটি কমিটিও আছে। সেখানেই বিরোধ নিরসনে মতবিনিময় করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নিরসন না হলে স্থিতাবস্থা বজায় থাকে।

মনে রাখা দরকার, মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুদেশের মধ্যে মতপার্থক্যের বিষয় ক্রমাগত বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক চুক্তি। এই চুক্তি অনুযায়ী এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও ভারত মহাসাগরে মার্কিন রণকৌশলের জুনিয়র পার্টনার হিসেবে ভূমিকা পালন করছে ভারত। মার্কিন এই রণকৌশ‍‌লের লক্ষ্য হলো, চীনকে ঘিরে রাখা অথবা চীনকে কোণঠাসা করা। সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে ভারত-আমেরিকা-জাপানের মধ্যে যে ত্রিদেশীয় ‘মালাবার মহড়া’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল তার লক্ষ্যও ছিল সেটা। মহড়ার শুরুতে মার্কিন ‍ নৌবাহিনীর কমান্ডার কোনও রাখঢাক না রেখেই জানিয়ে দিয়েছেন, এই মহড়ার অর্থ হচ্ছে চীনকে বার্তা দেওয়া। ভারত যেহেতু এই মহড়ার অংশীদার তাই চীন এটাকে ভালো চোখে দেখেনি। তবে, নানা ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, চীনের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে ভারত সরকার এখন খুবই ব্যগ্র হয়ে উঠেছে। এটা কি ভারতের বোধোদয় না সংসদ অধিবেশনে বিরোধীদের সম্ভাব্য সমালোচনা সামলাতে সরকারের নরম মনোভাব? ঘরে-বাইরে চাপের মুখে সরকার এখন চীনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। বিরোধীরা বরাবরই বলে আসছেন, দুদেশের সীমান্ত সমস্যা সমাধানে বিকল্প পথ হচ্ছে আলোচনা ও মতবিনিময়। বিদেশ সচিব এস জয়শংকর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল বেজিঙ যাচ্ছেন চীনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলতে। বিদেশ সচিব আশা ব্যক্ত করেছেন, ভারত ও চীনের মতপার্থক্য যেন বিরোধে পরিণত না হয়। তার আগে সরকার দিল্লিতে সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে তাদের মত ব্যক্ত করেছে। এটাও অভিনব বলতে হবে। বোঝাই যাচ্ছে, চীনবিরোধী যত জিগিরই তোলার চেষ্টা হোক, চীনের বিরুদ্ধে যত আস্ফালনই করুক সরকার ও শাসকদল তাদের আলোচনার পথে যাওয়া ছাড়া বিকল্প পথ নেই। কারণ, চীন নিয়ে প্রথম ঘরেবাইরে চা‍‌পের মুখে সরকার। চাপে পড়ে হলেও সরকার এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে আলোচনার পথেই সীমান্ত সমস্যা নিরসনে জট খুলতে পারে। এখন সরকারের সামনে প্রশ্ন : তারা সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় কি রাখবে?