আগর

একটি হস্তচালিত যন্ত্র। কাঠ ফুটো করার জন্য ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎচালিত ড্রিল মেশিনে বারো মিমি ব্যাস পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। কিন্তু তার থেকে বেশি ব্যাসের ফুটো করতে হলে আজও আগরের কোনও বিকল্প নেই। সারাদেশের মধ্যে আগরের জন্মদাতা এই পুরুলিয়া শহর। সেই আগর নিয়ে ছবি ও তথ্যসমৃদ্ধ বই প্রকাশের পরই একথা জানা গেল। এ জেলায় আগর শিল্পের একটা নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। নাটমন্দির থেকে বইটি প্রকাশিত হয়েছে। বইটিতে ব্যবহৃত আলোকচিত্রগুলি একমাস ধরে জেলার নানা জায়গা ঘুরে ক্যামেরাবন্দি করেছেন খ্যাতনামা আলোকচিত্রী স্বরূপ দত্ত। আর আগর নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ গবেষণাধর্মী কলম ধরেছেন শংকর চট্টোপাধ্যায়। পশ্চিমবাংলার প্রান্তিক জেলা পুরুলিয়ার অন্যতম প্রাচীন শিল্প আগর। সেই আগরের বিবর্তনের একটা ইতিহাস আছে। পুরুলিয়ার মফস্বল থানার জোতবলরামপুর গ্রাম। সেই গ্রামের অধিবাসী তুলসীদাস কর্মকার। ১৯২২সালে জন্ম তৎকালীন ইংরেজ সরকারের বৃত্তি নিয়ে লন্ডন পাড়ি দিয়েছিলেন ধাতুবিদ্যা নিয়ে লেখাপড়া করতে। পুরুলিয়া জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন উত্তীর্ণ হবার পর কটকের র‌্যাভেনশ কলেজে স্কলারশিপ নিয়ে আই এস সি পাশ করেন। এরপর পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স অনার্স নিয়ে ভর্তি হন। সেইসময় বিহার সরকারের শিল্পদপ্তরের অধিকর্তা কলিন্সের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তাঁরই সহায়তায় বিহার সরকার ও ব্রিটিশ সরকারের মাসিক তিরিশ পাউন্ড জলপানি সম্বল করে ইংলন্ডের শেফিল্ড যান। সেখানে ব্যাচেলার অব মেটাল ডিগ্রি নিয়ে ১৯২৫সালে পুরুলিয়া শহরের ডাকবাংলো এলাকায় খুলেছিলেন প্রেসিডেন্সি অ‌্যান্ড টুলস কোম্পানি। আবিষ্কার করেছিলেন আগর তৈরির পদ্ধতি। দেশজ এই আগরের প্রযুক্তিবিদ্যায় নবীন প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তোলেন। একসময় পুরুলিয়া জেলাতে আগর সামাজিক বিপ্লবের রূপ নেয়। নেপাল, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমারে আগর রপ্তানি হতো। আমাদের দেশে আর কোথাও আগর তৈরি হয় না। সেই আগর নিয়ে যে একটা বই হতে পারে দেখিয়ে দিলেন এই প্রজন্মের দুই প্রতিনিধি।

শিশুদের পাশে ইউনিসেফ

রোগ প্রতিরোধ করতে না পেরে প্রতিদিন তিন হাজার একশো পঞ্চাশটি শিশু অপুষ্টিতে মারা যাচ্ছে। পাঁচ বছর বয়স হবার আগেই প্রতিবছর দেড় মিলিয়ন শিশু মারা যাচ্ছে। শিশুদের পাশে দাঁড়াবার জন্য সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে ইউনিসেফ। কারণ বিপদগ্রস্ত এই শিশুরা আমার আপনার সাহায্য চায়।

ব্যতিক্রমী চিত্র প্রদর্শনী

পানিহাটি আর্টিস ফোরামের চিত্রকলা প্রদর্শনীর বৃত্তে সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান। রং তুলির আঁচড়ে সাদা ক্যানভাসে দৃশ্যমান বহতা সময়ের চিত্রকল্প। সম্প্রতি আকাদেমি অব ফাইন আর্টস গ্যালারিতে শেষ হলো সংস্থার চিত্রকলা প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীর শেষদিনটি নির্দিষ্ট ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান। সাম্প্রদায়িকতা নয় সম্প্রীতি জীবনের চালচিত্রকে নয়া রূপ দিতে পারে। এমন ভাবনার ছবি কে কে দে’র রং তুলিতে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ শিল্পীর ছবিতে জীবন সংগ্রাম, রুটি রুজির কঠিন লড়াইয়ের কথা। দিলীপ দেবনাথের ছবিতে আতঙ্কিত এক নারীর মুখ। কাঁটাতারে আটকানো সেই নারীর মুখে সেলাই। আমাদের রাজ্যে সাম্প্রতিককালে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এযেন প্রতীকী জেহাদ। কাঠচেরাই করার কাঠেরগোলাকে থ্রি ডাইমেনশনে ধরেছেন ইন্দ্রজিৎ সিন্‌হা। বিভিন্ন আকারের কাঠে পূর্ণ ক্যানভাস। আঠারোটি ছবিতে ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আখ্যান। প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য, কোলাজও জায়গা করে নিয়েছিল। অ‌্যাক্রেলিকের কাজের সাথে ছিল তেলরংয়ের কাজ। জলরংয়ের উপরে চাইনিজ ইয়ং-এর স্টোকের অনবদ্য মিশ্রণের ছবি। এছাড়া যাঁদের ছবি প্রদর্শনীতে জায়গা করে নিয়েছে তাঁরা হলেন দিব্যেন্দু সেন, তপতি পালদেবনাথ, শংকর সিংহরায়, তপন দাস, শিখা সিন্‌হা, জ্যোতিপ্রকাশ রায়চৌধুরি, বিমল ভট্টাচার্য, অনিন্দিতা রায়নন্দী, মৃত্যুঞ্জয় রায়, গোপাল শীল, সুরজিৎ পাল, জয়তি মুখোপাধ্যায়, সৌমেন ভট্টাচার্য, নীলাঞ্জনা রায়সরকার, সুহাস হোড়।

সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত বার্মা ডাক্তারবাবু

শতবর্ষ অতিক্রান্ত এক বিস্মৃতপ্রায় নাট্যকার নির্দেশক অভিনেতা ডা: সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত। যিনি বার্মা ডাক্তারবাবু নামে সোনারপুর রাজপুর অঞ্চলে সমধিক পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশের মৈমনসিংহ জেলার সেনবাড়ি অঞ্চলের জমিদার ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ সেন। তিনি যে শিল্প সংস্কৃতি চর্চার একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন শুধু তাই নয় নিজেও সেই চর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুরেন্দ্রনাথের জ্ঞাতি সম্পর্কে ভাইপো ছিলেন সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত। পিতা ডাঃ শচীনাথ সেনগুপ্ত, মাতা নির্মলা সেনগুপ্ত। জন্ম চোদ্দই আগস্ট ১৯১৫। সুরেন্দ্রনাথের উৎসাহে ও সাহচর্যে ছোটবেলা থেকেই নাট্য চর্চার শুরু। দুই পরিবার একসঙ্গে বহু নাটকের প্রযোজনা করেছেন। সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত মৈমনসিংহ থেকে আই এস সি পাশ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করেন। পরবর্তীকালে কলকাতা এসে মেডিকেল কলেজ থেকে এম বি ডিগ্রি এবং এফ এল জি পি লাভ করেন। ১৯৫২ সালে ভারত সরকারের চিকিৎসক হিসাবে তিনি বার্মায় চলে যান। রেঙ্গুন, প্রোম, মনিও ইত্যাদি অঞ্চলে নানা হাসপাতাল ও জেলখানাতে চিকিৎসক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৫৭সালে কলকাতায় ফিরে এসে চিকিৎসকবিহীন রাজপুরে আমৃত্যু মানুষের সেবা করেন। তাঁর প্রয়াণের সাতাশ বছর পরেও তিনি বার্মা ডাক্তারবাবু হিসাবেই অধিক পরিচিত। ১৯৫৮সালে সোনারপুর রাজপুরে কৃষ্টিসংসদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬০সালে তিনি অবিভক্ত ২৪পরগনা জেলায় ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ‌্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সম্পাদক। চিকিৎসকদের নিয়ে নাট্য প্রযোজনা, গান আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেন। চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজগৃহে মঞ্চ তৈরি করে রবীন্দ্র জয়ন্তী, নজরুল জন্মজয়ন্তী শামিল হতেন। মঞ্চ উপকরণ সহধর্মিণীকে নিয়ে নিজেই তৈরি করতেন। অস্থায়ী মঞ্চের যাবতীয় উপকরণ সংগ্রহ করে রাখতেন। সোনারপুর অঞ্চলে যেখানেই নাট্য উদ্যোগ সেখানেই বিনামূল্যে মঞ্চোপকরণ সরবরাহ করতেন। বাড়ির সামনে অস্থায়ী মঞ্চে বহু নাটক করেছেন। নাটকের প্রতি গভীর ভালোবাসা না থকলে একাজ করা অসম্ভব।

একসময় ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই পত্রিকায় সমরেন্দ্র সেনগুপ্তের বহু কবিতা নাটক প্রকাশিত হয়। নাট্যকার মন্মথ রায় ছিলেন সমরেন্দ্রের নিকট আত্মীয়। মন্মথ রায়ের উদ্যোগে নবনাট্য আন্দোলনে যুক্ত হন। তাঁর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত সব নাটকই অভিনীত। উল্লেখযোগ্য নাটক পূর্ণাঙ্গ অসবর্ণা, নিউ পারিজাত বোডিং। একাঙ্ক নাগরিক (বেতারে অভিনীত), দান, দিনান্তে, বেড নাম্বার থার্টিন, উল্কা কেবিন, অঙ্কুর, রবীন্দ্রনাথ, তুলাদণ্ড, ঝরাকুঁড়ি, পাপামহল’৭৬ প্রমুখ। অপ্রকাশিত উপন্যাস আমার কবরে দিও গো ফুল। এছাড়া প্রচুর ছোটগল্প লিখেছেন। সোনারপুর কৃষ্টিসংসদের আঠাশটি নাটকে নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিনয় করেছেন সতেরোটি নাটকে। বীরু মুখোপাধ্যায়, রমেন লাহিড়ী, জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়, সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ গুহনিয়োগী, বিভূতি মুখোপাধ্যায়, তরুণ রায়, কিরণ মৈত্র, দেবনারায়ণ গুপ্ত, রবীন ভট্টচার্য, ডা. সাধনকুমার ভট্টাচার্য, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলেন মুখোপাধ্যায়, রবীন মজুমদার, কালী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের সান্নিধ্যে পেয়েছিলেন।

গর্ভকেশর

সারোগেট মাদার নিয়ে বাংলায় সেভাবে নাটকে চর্চা হয়নি। এই বিষয়টিকে সামনে রেখে বালিগঞ্জ রেনবো থিয়েটারের নতুন ভাবনার নাটক গর্ভকেশর। এই নাটকে মূলত রক্তের সম্পর্কে মা ও সারোগেট মাদারের টানাপোড়েনের কাহিনি উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ঘটনা এই নাটকের কেন্দ্রে। বিদেশ থেকে আসা এক দম্পতি ভারতে এসে গর্ভ ভাড়া নিয়েছিল। যথাসময়ে তাদের একটি সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু তারা সন্তানটি ফেলে পালিয়ে যায়। কারণ শিশুটি প্রতিবন্ধী। সেই বাচ্চাটি কি হলো? গর্ভকেশর সেইদিকটি নিয়ে নাটকে আলোকপাত করেছে। তাপসী রায়চৌধুরির গবেষণাধর্মী ও পরিচালনায় এই নাটকের সামগ্রিক পরিকল্পনায় ত্রিদিব ঘোষ। তাপসীসহ এই নাটকে অভিনয় করছেন রজত গঙ্গোপাধ্যায়, সত্যপ্রিয় সরকার, মৌসুমি সেন প্রমুখ।

দ্বিজেন্দ্র স্মরণ

আগামী চৌঠা শ্রাবণ কান্তকবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের একশো পঞ্চান্নতম জন্মদিন। জন্ম আঠারশো তেষট্টি প্রয়াণ উনিশশো তেরো। প্রতিবছরের মতন এবারেও নদীয়ার কৃষ্ণনগরের ‘দ্বিজেন্দ্র স্মৃতি রক্ষা সমিতি’ ও স্থানীয় পৌরসভার উদ্যোগে ‘দ্বিজেন্দ্র জন্মোৎসব পালিত হবে একুশে জুলাই রবীন্দ্রভবনে। কেউবা ইংরেজি মতে উনিশে জুলাই কবির জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করবেন। বাংলা গান-কবিতা-নাটকে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর ‘বঙ্গ আমার, জননী আমার’ গান আজও মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। রবি জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন ‘রবীন্দ্রনাথের জাতীয় সংগীত অপেক্ষা দ্বিজেন্দ্রলালের ‘বঙ্গ আমার, জননী আমার’ অধিক লোকপ্রিয় হইল।’ বাংলা হাসির গানেও তিনি ছিলেন অগ্রপথিক। একুশে জুলাই রবীন্দ্রভবনে দ্বিজেন্দ্রলালের গান শোনাবেন সংঘমিত্রা সরকার, লাভলি রায়, পিয়ালী রায়। আবৃত্তিতে আকাশ দত্ত। দ্বিজেন্দ্রলালকে নিয়ে সমকালীন কবিদের লেখা কবিতা কোলাজ পরিবেশন করবে ‘কথাশিল্প’ আবৃত্তি চর্চাকেন্দ্র। কবির জন্মভূমিতে কবিকে নিয়ে আরও নানান অনুষ্ঠান পালিত হবে।

গৌরমল্লার চল্লিশ

শাস্ত্রীয় সংগীত ও নৃত্যের ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান গৌরমল্লার। এবার সংস্থার চল্লিশতম বার্ষিক অনুষ্ঠান আগামী বিশে জুলাই সুবর্ণ বণিক সমাজ হলে। পরিবেশিত হবে গৌরমল্লারের শিক্ষার্থী শিল্পীদের নানান অনুষ্ঠান। উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করবেন সুদেবী পাল। উচ্চাঙ্গের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশন করবেন সাহানা মিশ্র। অঞ্জলি দাসের পরিচালনায় নজরুল গীতি ও বাংলা আধুনিক গানে অংশ নেবেন সংস্থার শিক্ষার্থীরা। চৈতালি রায়ের পরিচালনায় ওডিশি ও রাবীন্দ্রিক নৃত্য এবং শাশ্বতী ভট্টাচার্য ও সীমা চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ভরতনাট্যম, প্রীতি শেখরের পরিচালনায় আবৃত্তি ও শ্রুতিনাটক পরিবেশিত হবে। রাজীব শীল ও টুম্পা বিশ্বাসের আঁকা ছবিও প্রদর্শিত হবে।

সুবর্ণরেখা

ঐতিহাসিকরা বলেন, সুবর্ণ বণিকরা আদিতে পৈতেধারী ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রাজা আদিশূরের দশম বংশধর বল্লাল সেন নয়শো ছেষট্টি খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। সেসময় বঙ্গদেশের সুবর্ণগ্রামের অন্যতম ধনী বল্লভানন্দ আঢ্যের কাছে রাজা বল্লাল সেন প্রথমে কুড়ি লক্ষ টাকা পরে পাঁচ লক্ষ টাকা ধার চান। উদ্দেশ্য ছিল মণিপুরের রাজার সঙ্গে যুদ্ধে খরচ করা। প্রথমে টাকা দিলেও পরে আরও টাকা দিতে অস্বীকার করায় ক্ষুব্ধ হয়ে রাজা বল্লাল সেন সুবর্ণ বণিকদের কাছ থেকে পৈতের অধিকার কেড়ে নেন ও তাঁদের নিচু জাত বলে অভিহিত করেন। এমনই নানান তথ্যের ভাণ্ডার নিয়ে গতবছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী প্রেক্ষাগৃহে প্রকাশিত হয়েছিল কবি সুস্মেলী দত্তের সম্পাদনায় সুবর্ণ বণিক সম্প্রদায়ের মুখপত্র ‘সুবর্ণরেখা’। এবছর সুবর্ণরেখার দ্বিতীয় বার্ষিক সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে কবি অক্ষয়কুমার বড়াল আজও যে অক্ষয় হয়ে রয়েছেন তাঁর প্রমাণ রয়েছে সুবর্ণরেখায়। পরাধীন ভারতের কবি অক্ষয়কুমার বড়াল সৌন্দর্যের উপাসক হলেও তাঁর কবিতাতে দুঃখবাদের প্রগাঢ় ছায়া রয়েছে। স্মরণ করা হয়েছে চিত্রকর সতীন্দ্রনাথ লাহাকে। যাঁর ‘শকুন্তলা’ সিরিজের ছবিগুলি বিপুল জনপ্রয়তা লাভ করেছিল। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাবে পরবর্তীকালে দেশজ ধায়ার ছবি আঁকেন। ভারতবর্ষ, শিশুসাথী, বঙ্গশ্রী পত্রিকায় তাঁর ছবি নিয়মিত প্রকাশিত হতো। লিখেছেন বেশকিছু কবিতাও। এই দুই ব্যক্তিত্বের কবিতা এই সংখ্যার অন্যতম আকর্ষণ।

আন্তর্জাতিক পাঠশালা

‘... নানা অর্থে একটা সামাজিক-অর্থনৈতিক-ধর্মীয়-রাজনৈতিক জটিল সময় অতিক্রম করছি আমরা। সময় আমাদের সৎ-অসৎ, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে নতুন করে জিজ্ঞাসু করে তুলছে। বোঝা যাচ্ছে না, কে কোথায় কোন্‌ লক্ষ্যে পৌঁছতে চেয়ে, নিজের আশপাশেই ছড়িয়ে চলেছে বিষবাষ্প!’ এমনই প্রশ্ন তুলেছে ‘আন্তর্জাতিক পাঠশালা’র সম্পাদকীয়। যদিও সাম্প্রতিক সংখ্যাটি হাসি বিষয়ক, তবুও অস্থির সময়কে তুলে ধরেছেন সম্পাদক। কেননা, এই মলাট বলছে আর বিষবাষ্প নয়, এবার প্রয়োজন সম্প্রীতির বাতাবরণ। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া। এই এগিয়ে যাবার মধ্যেই মিলবে হাসি। হাসির হরেক রকমফের। সংস্কৃত সাহিত্যে হাসি থেকে চারপাশের জীবনে হাসি। হাসির তত্ত্ব আর তথ্য থেকে হাসি কীভাবে কখনো নির্মল আনন্দ আর কখন হয়ে যায় বিদ্রূপ আর ব্যঙ্গের হাতিয়ার। হাসি নিয়ে মিষ্টি কিংবা টক ঝাল— সব ধরনের রসদ রয়েছে এই পত্রিকায়। সংস্কৃত সাহিত্যের হাসিও জায়গা পেয়েছে। হাসি নিয়ে ফরাসি চিন্তাবিদ অঁরি ব্যার্গসনের চিন্তাভাবনার কথাও উঠে এসেছে। আবার স্থান পেয়েছে সুকুমার-সাহিত্যেরও হাস্যরস। সঙ্গে রয়েছে নানা বিশ্লেষণ। তবে হুতোমপেঁচার মতো এখানে কালপেঁচার হাসির কথা নানাভাবে প্রকাশ করেছেন তম্ময় বীর। আকর্ষণীয় বিষয় হলো বাংলা হাস্যরসের পত্রিকা নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ থেকে সজনীকান্ত, শনিবারের চিঠি— ব্যঙ্গচিত্র এবং হাস্যরসে ভরপুর। ভালো লাগবে এমন লেখা পড়তে। হরেক হাসির তত্ত্ব তথ্য সত্য অ-সত্য’কে সামনে রেখে প্রচ্ছদ (শুভেন্দু দাশমুন্সি) বেশ ভালো।

ইউরোপীয়ান ছবির উৎসব

এবার ইউরোপীয়ান ছবির উৎসব সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ‌্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। এই উৎসব শুরু হয়েছে চৌদ্দই জুলাই শেষ বাইশে জুলাই। অংশ নিচ্ছে বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, স্লোভানিয়া, ডেনমার্ক, লুক্সেমবার্গ, ইতালি, হ্যাঙ্গেরি, স্পেন, লাটাভিয়া, জার্মানি, গ্রিস, বুলগেরিয়া, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া,সাইপ্রাস, ফ্রান্স, স্লোভাকিয়া, সুইডেন, নেদারল্যান্ড, এস্তোনিয়া ও ফিনল্যান্ড। উদ্বোধনী ছবি ছিল বেলজিয়ামের ফ্লাইং হোম। ছবিগুলির মধ্য দিয়ে সেইসব দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে দর্শকরা পরিচিত হতে পারবেন। প্রবেশ অবাধ।

এক সন্ধ্যায় দুটি নাটক

ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ, হুগলী জেলার প্রাভদা শাখা আগামী বাইশে জুলাই সন্ধ্যায় শিশির মঞ্চে জগবন্ধু মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় মনোজ মিত্রের ‘কাকচরিত’ নাটকটি মঞ্চস্থ করবে। গড়িয়া একত্রের আয়োজনে দ্বিতীয় নাটকটি পরিবেশন করবে গড়িয়া একত্র। তারা মঞ্চস্থ করবে ভাস্কর সান্যালের পরিচালনায় ‘জিওরদানো ব্রুনো’।

দক্ষিণী প্রয়াস

কিছু কিছু ঘটনা হঠাৎই ঘটে। যুক্তিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মাদুরদহ গ্রাম। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই শ্রমজীবী। গ্রামে কোনও বিদ্যালয় ছিল না। হাতেখড়ি-পড়াশুনা দিবাস্বপ্ন ছিল। আজ সেই গ্রামে দক্ষিণী প্রয়াসের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে মাদুরদহ সত্যভিত্তি বিদ্যালয়। সেখানে পড়ুয়ারা সকলেই লেখাপড়ার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার কোনও খরচ নেই। বিদ্যালয়ে রয়েছে অভিভাবকদের হাতেকলমে কাজের শিক্ষা এবং তার থেকে উপার্জনের রাস্তা। দেখতে দেখতে পনেরো বছর পার হয়ে গেল। এই পঞ্চদশ বছরকে স্মরণীয় করে রাখতে সত্যজিৎ রায় মঞ্চে বিশেষ অনুষ্ঠান বসেছিল গতকাল সকালে। সেখানকার শিক্ষার্থীদের হাতের কাজের নানান নমুনা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা ছিল। এসেছিলেন তবলিয়া বিক্রম ঘোষ। সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা পরিবেশন করলেলন ‘প্রকৃতি বৈভব’ নৃত্যনাট্য। প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টির সন্ধান মেলে ধরলেন নৃত্যনাট্যে। সেই সৃষ্টি সুধারসে সিক্ত নৃত্যনাট্যের একটি দৃশ্য আজকের দৃষ্টিপাতে।

নাটকের কর্মশালা

নাটক দেখতে দেখতে অনেকেই নাটকে অংশগ্রহণে আগ্রহী হয়ে পড়ে। কিন্তু নাটকের প্রাথমিক পাঠ না থাকলে শুধুমাত্র আগ্রহ দিয়ে অভিনয় পূর্ণতা পেতে পারে না। চাই প্রযোজনীয় শিক্ষা। নাটকের কর্মশালায় সেই শিক্ষার একঝলক দেখা গেল অভিনেয় আয়োজিত নাটকের কর্মশালায়। প্রায় প্রতিবছর নিয়মিত কর্মশালা করে বাংলার নাট্যমঞ্চে অনেক কুশীলবকে জায়গা করে দিয়েছে অভিনেয়’র উদ্যোগ। সম্প্রতি অভিনেয়র পাঁচদিনের কর্মশালায় বালীর বঙ্গশিশু বালিকা বিদ্যালয়ের ত্রিতল ছিল সরগরম। সেখানে নানা বয়সি ও নানান দিকের বাইশজন অংশ নেন। নাটকে সংগীতের অবস্থান, সংগীতের মধ্যে নাটকীয়তা নিয়ে শুভেন্দু মাইতি শিক্ষার্থীদের বলেন। সেইসঙ্গে সংগীতের কিছু প্রাথমিক শিক্ষাদান করেন। নাটকে আলোর প্রয়োগ ও রঙ্গমঞ্চ সম্পর্কে নানাদিক উন্মোচন করেন কণিষ্ক সেন। মঞ্চে আলোর অবস্থান ও তাদের কি নামে ডাকা হয় সে সম্পর্কে অবহিত করেন। সৌম্যেন বসু কণ্ঠস্বর ও বাচিক অভিনয় ছাড়াও বেতার নাটকে সংগীতের প্রয়োগ সম্পর্কে প্রায়োগিক শিক্ষা দেন। বাংলা নাটকের ইতিহাস ও অভিনয়ের ইতিহাস নিয়ে অয়ন্তিকা ঘোষ আলোকপাত করেন। নাটকে নীরব অভিনয় অনেক কথা বলে। সেই কথা মূকাভিনেতা শিল্পী শান্তিময় রায় শিক্ষার্থীদের অবহিত করেন। নাটক থেকে নাট্য এবং নাটক ও মঞ্চ নিয়ে বলেন শিবির পরিচালক সৌম্যেন্দু ঘোষ। অভিনয় ও তার চলন নিয়ে অর্ণব মুখোপাধ্যায় শিক্ষা দান করেন।

সময়ের কণ্ঠস্বর

এই আগুনের একটা নাম দাও। অনেক দিন স্পর্ধা দেখিনি এমন। নিবেদনে মজলিশ সাজিয়েছি এতকাল। আগুনের বর্ণমালা সাজিয়ে কাব্যে রূপদান করেছেন কবি তাপস দাস। এবারের বইমেলায় তাপসের আগুন সিরিজের বেশ কিছু কবিতা জায়গা করে নিয়েছে। সময়, সমকাল ও এইসময়ের যন্ত্রণা তাপসের কবিতায় কথা বলে। মহাফেজ সেই কবিতাগুলিকে জায়গা করে দিয়েছে। তাপস সময়কে চিহ্নিত করেছেন এইভাবে—‘কে কাকে মনে রাখে; দেশ না মাঝি?/কে কাকে কাঁধে নেয়; দেশ না মাঝি?/কে কাকে ভালোবাসে; দেশ না মাঝি?/ভালোবাসার জন্য পথ হাঁটলেন দানি মাঝি।’ চুয়ান্নটি কবিতার মধ্যেই সময়ের কণ্ঠস্বর বেজে উঠেছে।