রায়গঞ্জে মিছিল,বিক্ষোভ
আদিবাসী অধিকার মঞ্চের

নিজস্ব সংবাদদাতা

রায়গঞ্জ, ১৬ই জুলাই— তৃণমূলের দলীয় দপ্তরে নিয়ে গিয়ে আদিবাসী দুই মহিলাকে ধর্ষণ ও চার মহিলার শ্লীলতাহানির বিরুদ্ধে তীব্র সোচ্চার হলো পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী অধিকার মঞ্চ। ওই ঘটনায় ফুঁসছে গোটা রায়গঞ্জ। অবরোধে উত্তাল মহল্লার পর মহল্লা। রায়গঞ্জ পৌর বাস স্ট্যান্ডে থেকে গত ৯ই জুলাই (রবিবার) দুই যুবতীকে অপহরণ ও ধর্ষণ করে কয়েকজন দুষ্কৃতী। এছাড়াও শুক্রবার আরো চার আদিবাসী মহিলার শ্লীলতাহানি করা হয়। এর প্রতিবাদে রাজ্যজুড়ে পথে নেমেছে আদিবাসী অধিকার মঞ্চ। শনিবার এক দফা মিছিল ও সমাবেশের পর রবিবার রায়গঞ্জসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় সোচ্চার হন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা। ব্যবসা বন্‌ধের ডাক দেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে চাপে পড়ে জেলা প্রশাসন আদিবাসীদের নিয়ে বৈঠকে বসে রবিবার। অবিলম্বে সমস্ত দোষীদের গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে সেই বৈঠকে।

রবিবার পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী অধিকার মঞ্চের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ মিছিল ও পথসভা হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালি, নদীয়ার শান্তিপুর, পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবড়া, পুরুলিয়ার সাতুরি, বীরভূমের শান্তিনিকেতন, উত্তরবঙ্গের খড়িবাড়ি, বর্ধমানের গুসকরা এলাকায়। আগামী ২৪শে জুলাই সংগঠনের এক কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল রায়গঞ্জ যাবে বলে পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী অধিকার মঞ্চের নেতা পুলিনবিহারী বাস্কে রবিবার জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, এই ঘটনায় অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। অন্যদিকে রায়গঞ্জে আদিবাসীদের ৫টি সংগঠনের উদ্যোগে গঠিত আদিবাসী সমন্বয় কমিটি সোচ্চার হয়েছে এই ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির বিরুদ্ধে।

দফায় দফায় বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা রায়গঞ্জ। অবস্থা সামাল দিতে গিয়ে প্রশাসন এখন চাপের মুখে। সি পি আই (এম)-র উত্তর দিনাজপুর জেলা সম্পাদক অপূর্ব পাল অভিযোগ করে বলেছেন, অপরাধীরা তৃণমুল কংগ্রেসের অতি ঘনিষ্ঠ। পুলিশ অপরাধীদের আড়াল করতে গিয়ে রায়গঞ্জকে কলঙ্কিত করছে। ফলে চরম অসন্তোষ জেলাবাসীর মধ্যে। শুক্রবার আদিবাসী সমন্বয় কমিটির ডাকে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। কমিটি বলেছে, মুলত প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে জনজীবন বিপর্যস্ত। আদিবাসী যুবতীকে নিগ্রহের ঘটনার সঙ্গে তৃণমুল কংগ্রেসের দুষ্কৃতীরা জড়িত, ফলে পুলিশ নীরব। পুলিশ প্রশাসন সঠিক দায়িত্ব পালন করলে শুক্রবারের ঘটনা এড়ান যেত।

এদিকে ধর্ষণকারী দুষ্কৃতীদের বাঁচাতে নানা কৌশল শুরু হয়েছে। তবে রায়গঞ্জ পৌর বাস স্ট্যান্ডে চার আদিবাসী মহিলার উপর অত্যাচারের অভিযোগে আরও এক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে রায়গঞ্জ থানার পুলিশ। ধৃত ওই অভিযুক্তের নাম পান্না সরকার ওরফে রাজু। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ এখন পর্যন্ত চার জনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গিয়েছে। ধৃত পান্না সরকারকে রবিবার রায়গঞ্জ সি জে এম-এর আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁকে চার দিনের পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দেন।

প্রসঙ্গত, গত রবিবার বি জে পি-র ডাকা জেলা বন্‌ধের দিন রায়গঞ্জ পৌর বাসস্ট্যান্ডে চার আদিবাসী মহিলাকে শারীরিক নির্যাতন করার অভিযোগ ওঠে বেশ কয়েকজন দুষ্কৃতীর বিরুদ্ধে। এরপরেই রায়গঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হলে ঘটনার দুদিন পরে পুলিশ নবীন শীল, শুভম প্রসাদ ও উৎপল সাহা নামে তিন দুষ্কৃতীকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে। আগ্নেয়াস্ত্র মজুত রাখার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। পক্সো ধারাতে মামলা হয়। দুষ্কৃতীদের ধরা হলেও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হলো না কেন, সেই প্রশ্ন উঠেছে। এরপরেই আদিবাসী চার মহিলার উপর এই অত্যাচারের প্রতিবাদে গত ১৪ই জুলাই রায়গঞ্জের পথে নামেন পাঁচ আদিবাসী সংগঠনের কয়েক হাজারেরও বেশি মানুষ।

আন্দোলনের সূচনা শান্তিপূর্ণভাবে হলেও রায়গঞ্জ পৌর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মিছিল পৌঁছাতেই আই এন টি টি ইউ সি বেশ কিছু সমর্থক মিছিলে থাকা আন্দোলনকারীদের পুলিশের সামনেই একরাশ অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও কটু মন্তব্য করলে ধ্বংসাত্মক রূপ নেয় আন্দোলন। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় একের পর এক মোটরবাইক, সাইকেল। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় আই এন টি টি ইউ সি-র অফিস, যেখানে সারাদিন ধরে অসামাজিক কাজ হয় বলে অভিযোগ। আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ আছড়ে পড়ে বিদ্রোহী মোড় থেকে শিলিগুড়ি মোড় পর্যন্ত একাধিক দোকানপাট ও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক গাড়ির উপর। পরিণতিতে ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষতির প্রতিবাদে শুরু হয় রায়গঞ্জের রাস্তায় রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে পথ অবরোধ। ডাকা হয় ব্যবসা বন্‌ধ। প্রশ্ন ওঠে পুলিশের চরম গাফিলতি ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ভুমিকা নিয়েও। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়ায় রায়গঞ্জবাসীর মধ্যে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রবিবার রায়গঞ্জের পথে নামে র‍্যাফসহ বিশাল পুলিশ বাহিনী।