ময়দান মনে রাখেনি
হীরে-কাটার কারিগরকে

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা : ১৬ই জুলাই — সেদিনটা ছিল জুলাই মাসের ১৩ তারিখ, রবিবার। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ। দুপুরের পর থেকেই যুবভারতীর চারপাশটা যেন জনসমুদ্র। বড় ম্যাচ এর আগেও বহু দেখেছে বাঙালি। কিন্তু টিকিটের এতো চাহিদা? না আগে কোনদিন দেখা যায়নি। কালোবাজারিদের কল্যাণে ম্যাচের টিকিট বিক্রি হচ্ছিলো ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায়। যুবভারতীর একটা আসনও ফাঁকা ছিল না। প্রায় ১ লক্ষ ৩১ হাজার মানুষ খেলা দেখতে এসেছেন। রেফারি ইনায়িতুল্লা খান বাঁশি বাজানোর পরের মুহূর্ত থেকে উত্তেজনার পারদ চড়লো দ্বিগুন। ম্যাচের ২৭ মিনিট নাগাদ মোহনবাগান বক্সের বাঁদিক থেকে সোসোর কর্নার। বাঁক খাওয়ানো কর্নারটা মোহনবাগান গোলরক্ষক হেমন্ত ডোরাকে পরাস্ত করার পর দেবজিৎ ঘোষ ক্লিয়ার করেন। সেই ক্লিয়ার করা বলটি গিয়ে পড়ে লাল হলুদের নাজিমুল হকের পায়ে। এক পাঁ পিছিয়ে গিয়ে বাঁ পায়ের একটা দুরন্ত সাইড ভলি। হেমন্ত ডোরাকে দাঁড় করিয়ে রেখে বল জড়ালো জালে। যুবভারতীর ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে তখন বাঁধনছাড়া উচ্ছ্বাস।

সেদিনের ঐতিহাসিক ডায়মন্ড ম্যাচ ৪-১ ব্যবধানে জিতেছিলো ইস্টবেঙ্গল। হ্যাটট্রিক করে নায়ক বনেছিলেন বাইচুঙ ভূটিয়া। তারপর পেরিয়ে গেছে ২০ বছর। ডায়মন্ড সিস্টেমের ‘মাস্টারমাইন্ড’ অমল দত্ত এখন প্রয়াত। ‘ডায়মন্ড ব্রেকার’ পি কে ব্যানার্জিও ভীষণ অসুস্থ। সেই ম্যাচের হিরো বাইচুঙ এখন ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম আইকন। কিন্তু কি হলো ডায়মন্ড ম্যাচের প্রথম গোলদাতা নাজিমুল হকের? কোথায় হারিয়ে গেলেন বসিরহাটের পশ্চিম বিবিপুর গ্রামের নাজিমুল? না তাঁকে আর মনে রাখেনি ময়দান। ইস্টবেঙ্গল ছেড়েই ১৯৯৮-এ মোহনবাগান-এ যোগ দিয়েছিলেন নাজিমুল। তারপর মহামেডানে কাটিয়েছেন কয়েক মরশুম। তারপর টালিগঞ্জ, পোর্ট ট্রাস্ট। না হাজার চেষ্টা করেও কোন চাকরি পাননি ডায়মন্ড-ম্যাচের প্রথম গোলদাতা। ২০০৪-০৫ সাল থেকে চরম অর্থকষ্টে দিন কাটিয়েছেন নাজিমুল। ছোট ক্লাবে খেলে কিংবা স্থানীয় মাঠে কোচিং করে কোনরকমে জীবন কাটিয়েছেন। ‘চরম অর্থকষ্টে দিন কাটিয়েছে বছরের পর বছর। যে বড় ক্লাবগুলোর হয়ে এতোদিন খেললাম কেউ খবর রাখেনি। দারিদ্র কি ওই কয়েক বছরে খুব ভালো বুঝতে পেরেছিলাম’ এক রাশ অভিমান ঝড়ে পড়ছিলো নাজিমুলের কথায়।

অবশ্য দারিদ্রকে সঙ্গে করেই ফুটবলার হয়েছিলেন নাজিমুল। তাঁর বেড়ে ওঠা মধ্য কলকাতার এক অনাথ আশ্রমে। ময়দান নাজিমুল হককে চিনেছিলো ১৯৯৬-এ পিয়ারলেসের জার্সিতে। দুরন্ত খেলা নাজিমুলকে তুলে নিতে দেরি করেনি ইস্টবেঙ্গল। তারপর সেই ডায়মন্ড ম্যাচ। স্মৃতি এখনও টাটকা নাজিমুলের। ‘আমি ২১০ খানা টিকিট নিয়ে গিয়েছিলাম ক্লাব থেকে। তারপর সেই গোল। গ্রামে ফেরার পর পুরো গ্রাম ভেঙে পড়েছিলো আমার বাড়িতে।’ বাইচুঙের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া তখন সংবাদপত্রের খেলার পাতা দখল করে নিতো। প্রায় ২০ বছর পর তাঁর আর বাইচুঙের যেন কয়েক আলোকবর্ষের দূরত্ব। ‘বাইচুঙকে এখন আমি টিভিতে দেখি। শেষ দেখা হয়েছিলো মনে হয় বছর দশেক আগে। তারপর আর কথা হয়নি’ কোথাও যেন একটা লুকানো কষ্ট ঠিকরে বেরোচ্ছিলো নাজিমুলের কথায়।

২০০৯ সালেও বাটার হয়ে কলকাতা লিগে খেলেছিলেন নাজিমুল। না কেউ তাও জানতে পারেননি। এবছরের প্রথমেই কিছুটা বেঁচে থাকার রসদ পেয়েছেন। প্রাক্তন ছাত্র আব্দুল মান্নানের সহায়তায় রাজারহাটের কলকাতা ফুটবল আকাদেমিতে কোচের চাকরি পেয়েছেন নাজিমুল। এই আকাদেমিটির কর্নধার অজয়কুমার মোদী। বছরের পর বছর প্রবল অর্থকষ্টে দিন কাটানো নাজিমুল নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। না কোন আক্ষেপ নেই তাঁর। সব ভুলে গিয়েই ডায়মন্ডের গোলদাতা এখন নতুন তারকা তৈরির স্বপ্নে বুঁদ।

Featured Posts

Advertisement