উইম্বলডনে ‘অষ্টম’ আশ্চর্য

সংবাদসংস্থা

লন্ডন, ১৬ই জুলাই — চ্যাম্পিয়নদের কাছে বয়স কোনো বাধা নয়। আরও একবার তা প্রমাণ করলেন রজার ফেডেরার। টুর্নামেন্টে ফেভারিট হিসেবেই নেমেছিলেন। অবশেষে সেই মুহূর্তও এলো। ১১৪ মাইল প্রতি ঘণ্টা গতিবেগের সার্ভিস, চিরপরিচিত বিষাক্ত ফোরহ্যান্ডেই তফাৎ গড়ে দিলো। দুরন্ত ‘এস’-এই অষ্টম উইম্বলডন খেতাব নিশ্চিত করলেন রজার ফেডেরার। ক্রোয়েশিয়ার মারিন কিলিচকে কার্যত দুরমুশ করেই কেরিয়ারের ১৯তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয় ফেডেরারের।

দুজনেই কাঁদছেন। একজন আনন্দে, অপরজন হতাশায়। ক্যামেরায় ধরা পড়ছে সবই। চোখে জল, মুখে হাসি। আটবার উইম্বলডন জয়ী ফেডেরার যেন বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্যও। প্রতিপক্ষের হতাশা মুছতে চেষ্টায় কোনোরকম ফাঁক রাখলেন না রজার। তিনি শুধু তারকা নন, বড় মনের মানুষও। অল ইংল্যান্ড ক্লাবের সেন্টার কোর্ট সাক্ষী থাকলো। কিলিচের পিঠে হাত রেখে যেন বোঝালেন, আমি ৩৫ বছরেও পেরেছি, তুমি এত তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ো না বন্ধু।

অনেক বাঁধা পেরিয়ে ফাইনালে পৌঁছেছিলেন। ফেডেরারে সামনে কোনোরকম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেন না কিলিচ। ২৮ বছর বয়সি কিলিচের কাছে বর্ষীয়ান ফেডেরার নবীনের মতোই খেললেন। সবটাই যেন প্রত্যাশিত। এই মুহূর্তে ফেডেরার যে ছন্দে, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী তিনি নিজেই। এ বিষয়ে কারও সন্দেহ নেই। এবারের টুর্নামেন্টে একটি সেটও হারাননি। হোক না বয়স ৩৫। আগস্টে ৩৬ পূর্ণ করবেন। তাতে কি ? প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা এলেমেলো করে অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। বিশেষ করে ঘাসের কোর্টের উইম্বলডনে তা বারেবারে প্রমাণ হয়েছে। মাথা ঠান্ডা রাখার প্রতিযোগিতা হলে, সেখানেও নিশ্চিতভাবে চ্যাম্পিয়ন ফেডেরারই। প্রথম সেটের প্রথম গেমটা জেতেন কিলিচ। এক বিন্দুও ব্যতিব্যস্ত হতে দেখা যায়নি ফেডেরারকে। পরের গেমেই সমতা ফেরান। কিলিচ আবার এগোন, ফেডেরার ফের সমতা ফেরান। অবশেষে সেটটি ৬-৩ ব্যবধানে জেতেন।

দ্বিতীয় সেটে টানা তিনটি গেম জেতেন ফেডেরার। চতুর্থ গেমে হার। কিলিচের কাছে সান্ত্বনা ছাড়া কিছুই নয়। আরও সহজ করে ৬-১ এ সেট নিজের দখলে নেন ফেডেরার।

উইম্বলডনের ইতিহাসে পুরুষদের সিঙ্গলসে ১৩১তম ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিলেন ফেডেরার-কিলিচ। ইতিহাসে শেষবার ১৯১১ সালে ফাইনালে হার্বার্ট রোপার ব্যারেট আহত-অবসৃত হয়ে কোর্ট ছেড়েছিলেন। চতুর্থ সেট অবধি স্কোর লাইন ২-২। চোটের কারণে অবসর নেন হার্বার্ট। প্রতিপক্ষ অ্যান্থনি উইলডিঙকে জয়ী ঘোষণা করা হয়। এদিন সেন্টার কোর্টে দ্বিতীয় সেটের পর মেডিক্যাল টাইম আউট নেন মারিন কিলিচ। মাঝে একবার কোর্টে পা পিছলে পড়েনও। মনে হচ্ছিল, ১৯১১-র পুনরাবৃত্তি হবে না তো! কিলিচ কোর্টে আসেন। শুধু তাই নয়, তৃতীয় সেটে দারুণ লড়াইও করেন। কোথাও কোথাও কঠিন লড়াইও অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। কিলিচের ক্ষেত্রেও তাই। ম্যাচে টিকে থাকার লড়াই। প্রথম গেম জিতলেন। ফেডেরার সমতা ফেরালেন। পরের গেম ফের কিলিচের দখলে। স্কোরলাইন এক সময় ৩-৩। পরপর দুটি গেম জিতে ফেডেরার এগিয়ে ৫-৩। চ্যাম্পিয়নশিপ শুধু সময়ের অপেক্ষা। নবম গেমে ডুবন্ত ব্যক্তির খরকুটো ধরে বাঁচার লড়াই কিলিচের। সেটি জিতে লড়াই দীর্ঘায়িত করলেও শেষ অবধি কিলিচ সেট হারলেন ৪-৬ ’এ। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ফের উইম্বলডনের ঘাসের কোর্টে ফুল ফোটালেন রজার।

সেন্টার কোর্টের গ্যালারিতে যত ভিড়, তার কয়েকগুণ বাইরে। গ্যালারির সকলেই উঠে দাঁড়িয়েছেন। পরিবারের উপস্থিতি বাড়তি পাওনা। শুধু স্ত্রী মিরকাই নন, উপস্থিত সন্তানেরাও। ফেডেরার বলছিলেন, ‘এখানের দুর্দান্ত পরিবেশ, চারিদিক দেখতে সুন্দর। এর বেশি ওরা বোঝে বলে মনে হয় না। হয়তো কয়েক বছর পর বুঝতে পারবে।’ নিজের উচ্ছ্বাসের চেয়েও প্রতিপক্ষকে ভরসা দিলেন ফেডেরার। কোর্টের পাশে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, ‘ম্যাচ হারলেও ও নায়ক। মারিনকে শুভেচ্ছা। দুর্দান্ত একটা প্রতিযোগিতা কাটলো। ওর গর্ব হওয়া উচিত, ও ফাইনালে খেলেছে। আশাকরি আগামীদিনে আরও ভালো খেলবে।’

কেরিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম এখানেই জিতেছিলেন ফেডেরার। সেখানেই ১৯তম গ্র্যান্ড স্লাম পেলেন। গর্বিত ফেডেরারের কথায়, ‘অনেক কিংবদন্তীরা এই কোর্টে খেলেছেন। প্রথম দিন থেকে ফাইনাল অবধি উইম্বলডনে খেলা উপভোগ করেছি। আশা করি এখানে এটা আমার শেষ ম্যাচ নয়। আগামী বছরও ফিরতে চাই এবং খেতাব ধরে রাখতে চাই।’ কেন তিনি চ্যাম্পিয়ন, এই প্রত্যয়েই তার প্রমাণ।