জোহরা বিবির ওপরে অত্যাচারের
ঘটনায় স্পষ্ট ‘এক দেশ দুই নাগরিক’

পুলিশ-সাংসদ ধনীদের পাশেই

সংবাদসংস্থা

নয়াদিল্লি, ১৭ই জুলাই- নয়ডায় গৃহকর্মীকে নির্যাতনের ঘটনায় আবার সামনে এসেছে কীভাবে বাঁচছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা, বস্তিবাসী মানুষ। কীভাবেই বা এক দেশে গড়ে উঠেছে দুই দেশ, দুই কানুন।

নয়ডায় ৭৮নং সেক্টরের উচ্চবিত্তদের আবাসন মহাগুন সোসাইটিতে গৃহ পরিচারিকার কাজ করতেন কোচবিহারের দিনহাটার জোহরা বিবি। অভিযোগ, তাঁর দু’মাসের বেতন বাকি রাখা হয়েছিল। ১৩ই জুলাই তিনি বকেয়া চাইতে গেলে শারীরিক লাঞ্ছনার মুখে পড়েন। তাঁকে আটকে রাখা হয়, অভুক্ত অবস্থায় বন্দি করে রাখা হয়। তাঁর স্বামী আব্দুস সাত্তার স্ত্রীর সন্ধানে গেলেও তাঁকে সোসাইটির দরজা দিয়েই ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। বেসরকারি রক্ষীরা তাঁকে আটকে দেয়। বলা হয় জোহরা বিবি চলে গেছেন। পরের দিন সকালেও জোহরা বিবি বাড়ি না ফেরায় তাঁর স্বামী ও পড়শিরা একসঙ্গে খোঁজ নিতে যান। আবার রক্ষীরা তাঁদের ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। এই সময়ে জোহরা বিবির পড়শিদের সঙ্গে রক্ষীদের একপ্রস্থ গন্ডগোলও হয়। রক্ষীরা বস্তি থেকে মানুষকে হটাতে পাথর ছোঁড়ে বলে অভিযোগ। আবার, বস্তির লোকরাও সেই পাথর ছুঁড়ে মারেন। বচসার সময়ে সোসাইটির তরফ থেকে পুলিশকে ডাকা হয়। পুলিশ এসে জোহরা বিবির পড়শিদের ওপরেই চড়াও হয়। যদিও তাঁদের দৃঢ়তার জন্যই শেষ পর্যন্ত পুলিশই জোহরা বিবিকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে সোসাইটির মধ্যে থেকেই। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জোহরা বিবির পড়শিরা বিক্ষোভও দেখান।

অন্যদিকে, মহাগুন সোসাইটির তরফ থেকে পালটা অভিযোগ করা হয় জোহরা বিবি টাকা চুরি করেছে। পালিয়ে লুকিয়ে ছিল। যে বাড়িতে জোহরা বিবি কাজ করতেন তার মালিক ফেসবুকে একটি পোস্টও করেন। সেই পোস্টের ছত্রে ছত্রেই স্ববিরোধিতা। ফ্ল্যাটের মালিক গর্বের সঙ্গেই লিখেছেন কীভাবে পুলিশ এসে জোহরা বিবির স্বামীকে ‘ধমকে’ দিয়ে যায়। সোসাইটির অভিযোগ, জোহরা বিবির পড়শিরা আবাসনে ঢুকে হাঙ্গামা করেছে। পুলিশ সেইমতো ১৩জনকে আটক করে। ওই গৃহকর্মী যে বস্তিতে থাকেন সেখানে পুলিশ ও সোসাইটির ভাড়া করা দুর্বৃত্তরা গিয়ে হামলা করে। বস্তির মহিলাদের মারধর করা হয়।

সোসাইটির তরফ থেকে প্রচার শুরু হয় জোহরা বিবি এবং গৃহকর্মীদের অনেকেই ‘বাংলাদেশি’। রাজধানী দিল্লি, গুরগাঁও, নয়ডায় বাংলাভাষীদের ‘বাংলাদেশি’ অনুপ্রবেশকারী বলে ছাপ মেরে নানা ধরনের নির্যাতন ও হয়রানি নতুন কথা নয়। মহাগুন সোসাইটির ঘটনার পরে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে আর এস এস। ওই আবাসনের একাংশের ফ্ল্যাট মালিক এবং সঙ্ঘ পরিবার প্রচার শুরু করেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের কাউকেই কাজ করতে দেওয়া হবে না। তীব্র সাম্প্রদায়িক প্রচার চালানো হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও। সংবাদমাধ্যমের একাংশও মহাগুন সোসাইটির ধনী বাসিন্দাদের ভাষ্য প্রচারে তৎপর। বি জে পি সাংসদ মহেশ শর্মা রবিবার গিয়েছিলেন আবাসনে। সেখানে তিনি ‌আশ্বাস দেন ‘বস্তিবাসীদের হাত থেকে সুরক্ষার জন্য’ বিশেষ পুলিশ পোস্ট বসান হবে সোসাইটির গেটে।

অথচ জোহরা বিবির ওপরে অত্যাচারের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। জোহরা বিবি ও বস্তির মানুষদের বয়ানের ভিত্তিতে দায়ের হওয়া এফ আই আর-র ভিত্তিতে পুলিশ কোনও পদক্ষেপই নেয়নি। রবিবার আক্রান্ত বস্তিবাসীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন সি আই টি ইউ, জনবাদী মহিলা সমিতি, বাংলা মঞ্চ –সহ কয়েকটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সোমবার সি আই টি ইউ, মহিলা সমিতি, ঘরেলু কামগর মহিলা সংগঠন নয়ডার জেলাশাসকের অফিসের সামনে বিক্ষোভ দেখান। জেলা শাসক ও তাঁর মাধ্যমে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, গৃহকর্মীর ওপরে অত্যাচারকারীকে গ্রেপ্তার করতে হবে। গ্রেপ্তার হওয়া গৃহকর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিঃশর্তে মুক্তি দিতে হবে। যাঁরা সাম্প্রদায়িক নিষেধাজ্ঞার কথা বলছে তারা সংবিধান-বিরোধী কথা বলছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

২৫একর জমির ওপরে তৈরি হওয়া মহাগুন সোসাইটিতে ২হাজার ফ্ল্যাট রয়েছে। সবই উচ্চবিত্ত মানুষের। প্রায় ৬০০ গৃহকর্মী রোজ এই আবাসনে কাজ করতে ঢোকেন বলে স্থানীয় সূত্রের খবর।

মহাগুণ সোসাইটির কাছেই ঝুপড়িতেই থাকেন নির্মাণকর্মী, গৃহ পরিচারিকার কাজ করা মহিলা, সাফাইকর্মীরা। এঁদের এক বড় অংশই কোচবিহার, মালদহ, জলপাইগুড়ি থেকে যাওয়া গরিব মানুষ। জোহরার মতো অনেকেই ছেলেমেয়েকেও গ্রামের বাড়িতে রেখে কাজের সন্ধানে এসেছেন। মহাগুনের মতো ধনীদের ‘এনক্লেভ’ আবাসনের নির্মাণ কাজেই জড়িত এই দরিদ্র মানুষজনের উল্লেখযোগ্য অংশ। এদের থাকার জায়গার কোনো সরকারি ‘স্বীকৃতি’ নেই। প্রায়ই বস্তি ও ঝুপড়ি উচ্ছেদ হচ্ছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে তাড়িয়ে দেওয়াও হয় না কেননা এত সস্তা শ্রমের জোগান অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। রাজধানী নয়াদিল্লির ক্ষেত্রে যমুনাপাড়ের বা আরো দূরে চলে যাওয়া কলোনি ও পুনবার্সন বসতি এলাকার বাসিন্দাদের বড় অংশই অন্য রাজ্যের পরিযায়ী মানুষ। তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা যেমন নেই, তেমনই নাগরিকত্বের অনেক প্রমাণপত্রই নেই। সরকারি প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পরিচিতিপত্র ও কাগজপত্র না থাকায় বহু সুবিধা থেকেই তাঁরা ধারাবাহিক ভাবে বঞ্চিত।

Featured Posts

Advertisement