বিধানসভার ভেতরেই মোর্চার
বিধায়কদের হুম‍‍কি পরেশ পালের

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১৭ই জুলাই — রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে বি জে পি-র দিলীপ ঘোষ এবং পাহাড়ের মোর্চার তিন বিধায়কের সঙ্গে শাসকদল তৃণমূলের বিধায়কের মধ্যে তীব্র বচসা বেধে যায়। সোমবার এনিয়েই উত্তপ্ত হয়ে উঠলো বিধানসভা। ঘটনার রেশ নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত গড়ালো। কমিশন ঘটনার ফুটেজ চাওয়ায় পাঠাতে হলো সেই ফুটেজ। বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক পরেশ পাল হঠাৎই এই চার বিধায়কের সঙ্গে বচসা শুরু করে দেন। এই অনভিপ্রেত ঘটনাটি ছাড়া এদিন বিধানসভায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পর্ব নির্বি‍‌ঘ্নেই শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার ব্যালট পেপারগুলি বাক্স বন্দি করে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হবে। লোকসভা এবং রাজ্যসভার সাংসদ মিলিয়ে ৪৩জন, এ রাজ্যের বিধায়ক ২৯৪ জন এবং ত্রিপুরার ২জন এদিন বিধানসভায় এসে ভোট দিয়েছেন। ত্রিপুরা বিধানসভার অধ্যক্ষ রমেন্দ্রচন্দ্র দেবনাথ অসুস্থতার কারণে কলকাতায় আছেন, তিনি এদিন ভোট দেন আর ত্রিপুরার কংগ্রেস পরিষদীয় নেতা তিনিও ‍ভোট দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়। শাসকদলের আশঙ্কা ছিল কুণাল ঘোষ এবং তাপস পাল এই দুই সাংসদকে নিয়ে। তাপস পাল জেলে রয়েছেন তবে শেষ মুহূর্তে কুণাল ঘোষ ভোট দিয়ে যান। সব মিলিয়ে ৩৩৯জন এদিন বিধানসভায় এসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটদানকে ঘিরে এদিন সকাল থেকে বিধানসভা এবং আশপাশের এলাকা কড়া নিরাপত্তার জালে মুড়ে ফেলা হয়। বিধানসভায় এদিনের ভোটকে ঘিরে নির্বাচন কমিশন পর্যবেক্ষক হিসাবে নি‍‌য়োগ করেছিল কেন্দ্রীয় সড়ক ও পরিবহণ দপ্তরের যুগ্ম সচিব নীলা নন্দনকে। ভোটপর্ব পর্যবেক্ষণের জন্য বিরোধী দলগুলির রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মীরা কুমারের পক্ষে ২জন অতিরিক্ত (অ্যাডিশনাল) পর্যবেক্ষক ছিলেন ফিরহাদ হাকিম (ববি) এবং আনিসুর রহমান। আর নেপাল মাহাতো ছিলেন মীরা কুমারের প্রিন্সিপ্যাল এজেন্ট। সকাল ১০টা থেকেই ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে যায়। দু’রকম রঙের ব্যালট ছিল। সবুজ রঙের ব্যালট ছিল সাংসদদের জন্য আর গোলাপি রঙের ব্যালট দেওয়া হয় ‍বিধায়কদের।

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। বিধায়করা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছিলেন। পাহা‍‌ড়ের মোর্চার ৩জন বিধায়কও লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন বি জে পি-র রাজ্য সভাপতি বিধায়ক দিলীপ ঘোষ। এই ৪জনকে দেখে শাসকদলের বিধায়কদের মধ্যে ফিসফাস, চলছিল। এই ঘটনার আগে দিলীপ ঘোষ ঘরে ঘরে গি‍‌য়ে প্রচার করেন যে জিতবে তাঁকেই ভোট দিন। বামফ্রন্ট পরিষদীয় নেতা সুজন চক্রবর্তী, বিরোধী দলনেতা কংগ্রেসের আবদুল মান্নান, তৃণমূল বিধায়ক ফিরহাদ হাকিমকেও তিনি একইভাবে ভোট দেওয়ার জন্য বলে আসেন। লাইনে দাঁড়িয়েও দিলীপ ঘোষ একইভাবে ভোটারদের উদ্দেশ্যে ওই কথা বলতে থাকেন। সেখান থেকেই বাদানুবাদের সূত্রপাত। পরেশ পাল হঠাৎই মোর্চার বিধায়কদের উদ্দেশ্য করে দিলীপ ঘোষকে বলতে থাকেন, পাহাড়ে যাঁরা আগুন লা‍‌গিয়েছে তাঁরা এখানে‍‌ ভোট ‍‌দিতে এসেছেন। মোর্চার বিধায়করা পালটা প্রতিবাদ করেন। দিলীপ ঘোষের উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, তুমি যে কুৎসিত ভাষায় কথা বলো, তুমি পার্টির মুখপত্র হতে পারো না। মমতাদি তোমাকে দয়া করে রে‍‌খেছেন। এরই মধ্যে মোর্চার তিন বিধায়ক গিয়ে নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক নীলা নন্দনের কাছে অ‍‌ভিযোগ জানান। নীলা নন্দন আবার ঘটনাটি নির্বাচন কমিশনকে জানান। কমিশন থেকে ঘটনার ফুটেজ চেয়ে পাঠানো হ‌য়। ফুটেজ পাঠানোও হয় কমিশনকে। এই ঘটনার পর মোর্চার বিধায়ক রোহিত শর্মা সাংবাদিকদের বলেন, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা এদিন বিধানসভার মধ্যে ঘটে গেল। বিধানসভার মধ্যেই য‍‌দি শাসকদলের এরকম ভূমিকা হয় তাহলে পাহাড়ে কীভাবে শান্তি ফেরা সম্ভব! এরপর পরিষদীয় মন্ত্রী‍‌ পার্থ চট্টোপাধ্যায় পাহাড়ের ৩ বিধায়ককে ডেকে পাঠান। তাঁরা যানও। পার্থ চ্যাটার্জি তাঁদের সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসার পরামর্শ দেন। কিন্তু তাঁরা জানান, এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাঁদের একটি মুভমেন্ট কমিটি আছে। সেখানে আলোচনা না করে কোনও কিছু বলা সম্ভব নয়। এদিকে বামফ্রন্ট নেতা ‍‌শিলিগুড়ির বিধায়ক অশোক ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে বলেন, নির্বাচিত বিধায়কদের বিধানসভার মধ্যে হুমকি ‍‌দিচ্ছে। সারা দেশ দেখছে। গোটা দেশের কাছে এঘটনা লজ্জাজনক। পাহাড়ে শান্তি‍‌ ফেরানোর প্রক্রিয়ায় এটা কোনও পথ হতে পারে না। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন অশোক ভট্টাচার্য।

এদিকে এদিনই বিধানসভায় তাঁর ঘরে বসে সংসদে চল‍‌তি বাদল অধিবেশন নিয়ে সংসদীয় দলের বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। দার্জিলিঙ ইস্যু নিয়ে যে সংসদে সরব হতে হবে তা তিনি সাংসদদের বুঝিয়ে দেন। পরে সাংবাদিকদের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নোট বাতিল থেকে জি এস টি বা বিদেশনীতি সব কিছু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। না মানলে সি বি আই এবং ই ডি-কে দিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। প্রত্যেকের কণ্ঠরুদ্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ওরা যদি মনে করে আমাদের জেলে পাঠাবে ‘উই ডোন্ট মাইন্ড’। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ভৌগো‍‌লিক দিক থেকে রাজ্যের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। চারিদিকে একাধিক দেশ রয়েছে। সিকিম চীনের হাতে চলে গেলে বিপদ বাড়বে। বাংলাদেশ, ভুটান, চীন, নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করেছেন নরেন্দ্র মোদী।