শিশুর উপর পাশবিক অত্যাচারে
অভিযুক্ত সনাতন এখনও বেপাত্তা

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১৭ই জুলাই— একটি ৩ বছরের শিশুর ওপর পাশবিক অত্যাচার হলো। অথচ পুলিশ এখনো খুঁজে পেল না পুরুলিয়ার সেই অভিযুক্ত সনাতন গোস্বামীকে। সে আদৌ পশ্চিমবঙ্গে আছে কিনা— তাও সঠিক অনুমান করতে পারছে না পুলিশ। ঠিক ১১ মাস আগে এভাবেই একই কায়দায় সুচবিদ্ধ করে অত্যাচার চালানো হয়েছিল বীরভূমের লাভপুরের আর একটি শিশুর ওপর। সেবারও পুলিশ জানতেই পারেনি আসল অপরাধী কে। ঘটনার পিছনে উঠে আসছে তন্ত্র-মন্ত্র-ঝাড়ফুঁকের নানা তত্ত্ব। এরই জেরে শিশুদের ওপর অত্যাচার বাড়ছে। এমন ঘটনায় হতবাক ও স্তম্ভিত রাজ্যবাসী।

পাশবিক অত্যাচারের শিকার পুরুলিয়ার ৩ বছরের শিশুটি দেহে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চিকিৎসকরা। মঙ্গলবার সব দিক খতিয়ে দেখে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই এই অস্ত্রোপচার করতে হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। শিশুটির তলপেটের আশেপাশে বিঁধে আছে সাতটি সুচ। তার দুটি হাতেরই হাড়ে যথেষ্ট চোট রয়েছে। এস এস কে এম হাসপাতালে শিশুদের আই সি ইউ বা ‘পিকু’তে এখন রয়েছে শিশুটি। মাত্র বছর খানেক আগে বীরভূমের লাভপুর থেকে ৩ বছরের এক শিশুকে আনা হয়েছিল এস এস কে এম হাসপাতালে। তার দেহে মিলেছিল ৪টি সুচ। ঠিক একই কায়দায় সুচগুলি বিদ্ধ ছিল। অপারেশন করে শিশুটিকে সুস্থ করেছিলেন চিকিৎসকরা। তাঁরা জানিয়েছেন, সেবারও শিশুটির বয়স ছিল ৩ বছর। বাড়ির লোককে অনেক প্রশ্ন করেও জানা সম্ভব হয়নি কে এই জঘন্য কাণ্ড ঘটিয়েছিল। পুলিশও কিছু উদঘাটন করতে পারেনি, গোটা বিষয়টি থেকে গিয়েছে রহস্যময়।

এবারও পুরুলিয়ার নদিয়ারা গ্রামে একই ধরনের পাশবিক অত্যাচার। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জানা গিয়েছে, হোমগার্ড সনাতন গোস্বামী তার আশ্রিতা এক মহিলা ও তার শিশু কন্যার ওপর অত্যাচার চালাতো রোজই। শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতনও চলতো। এর সঙ্গেই গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেছেন সনাতন গোস্বামী তন্ত্র সাধনা, ঝাড়ফুঁকে সিদ্ধহস্ত ছিল। অনেকেই ছোটোখাটো সমস্যায় তার সাহায্য নিতেন। আর সে-ও তার সুযোগ নিত। গ্রামের একধারে ফাঁকা জায়গায় সনাতনের ঘর। তার স্ত্রী মারা গিয়েছে এক বছর আগে। জানা গিয়েছে যে মহিলাকে সনাতন আশ্রয় দিয়ে যাবতীয় কাজ করাত তাঁর স্বামীও সনাতনের সঙ্গে হোমগার্ডের চাকরি করতেন। এই মহিলার সঙ্গে সনাতনের সম্পর্কও ছিল বলে গ্রামবাসীদের একাংশের বক্তব্য। একইসঙ্গে সে মহিলা ও তার শিশুটির ওপর নির্যাতন চালাত বলে গ্রামে কানাঘুষা চলেছে। কিন্তু মহিলা মুখে কুলুপ আঁটায় সত্যি ঘটনা এখনো সামনে আসেনি।

সমস্ত ঘটনা চেপে রেখে গত মঙ্গলবার প্রথমে পুরুলিয়া সদর হাসপাতালে শিশুটিকে জ্বর হয়েছে বলে ভর্তি করান এই মহিলা। সেখানে শিশুটির দেহে আঘাত, আঁচড় ও যৌনাঙ্গ থেকে রক্তপাত হতে দেখে চিকিৎসকদের সন্দেহ হয়। পরে বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কোনওভাবেই শরীর থেকে সুচ বের করা যায়নি। এরপর শিশুটিকে এস এস কে এম হাসপাতালে নিয়ে এলে সেখানে মেডিক্যাল বোর্ড বসে। দেখা যায় শিশুটির গোটা শরীরে বিষক্রিয়া শুরু হয়েছে। ছবিতে দেখা গিয়েছে মোট সাতটি সুচ বিদ্ধ হয়ে আছে যকৃত, পাকস্থলি, কিডনি ও যৌনাঙ্গে। এস এস কে এম-র শিশু রোগ বিভাগের চিকিৎসকরা শিশুটিকে চব্বিশ ঘন্টা পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। তাকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে। বিষক্রিয়া একটু কমলে শারীরিক অবস্থা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে সব দিক খতিয়ে দেখে তার অপারেশন হবে বলে সোমবার মেডিক্যাল বুলেটিনে জানান চিকিৎসকরা। মঙ্গলবার সেই সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁরা।

ওদিকে এফ আই আর দায়ের হওয়ার পর থেকেই অভিযুক্ত সনাতন গোস্বামী উধাও গ্রাম থেকে। সে পার্শ্ববর্তী ঝাড়খণ্ডের কোথাও পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে বলে অনুমান পুলিশের। তার দুই ছেলের একজন থাকেন গুজরাটে। অন্যজন বিষ্ণুপুরে পুলিশে চাকরি করেন। তাঁরাও কোনো খোঁজ খবর দিতে পারেননি। পুলিশ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। গ্রামবাসীদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। কিন্তু কোনও হদিশ এখনো পুলিশ পায়নি। গ্রামবাসীদের অনেকেরই বক্তব্য, সনাতন গোস্বামীর চলাফেরা অনেক সময়েই সন্দেহজনক মনে হতো। কিন্তু এই ধরনের ঘটনা যে দিনের পর দিন চলছে তা কিছুই বোঝা যায়নি।