উইম্বলডন ফাইনালে খেলানোর
হ্যাটট্রিক বাংলার আম্পায়ারের

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১৭ই জুলাই — স্বপ্নেও এমন হয় কিনা সন্দেহ। উইম্বলডনের অল ইংল্যান্ড ক্লাবের সেন্টার কোর্টে কয়েকহাত দূরে দাঁড়িয়ে সেইসময় ডিউক অব কেন্ট। লন্ডনের রাজ পরিবারের সদস্যরা, গ্যালারিতে হলিউডের তাবড় নামী অভিনেতা, অভিনেত্রীরা। একটু পরে এসে হাত মিলিয়ে গেলেন ফেডেরারের স্ত্রী মির্কা, বাবা রবার্ট। আর টেনিস আম্পায়ার হিসেবে যাঁর ম্যাচ খেলিয়ে জীবনের এই নিয়ে মোট ৩৫টি গ্র্যান্ডস্লাম টুর্নামেন্ট পূর্ণ করলেন, তিনি এসে হাওড়া বালিখালের ঘোষপাড়ার অভিষেক মুখার্জিকে হাত মিলিয়ে বলে গিয়েছেন, ‘কনগ্র্যাটস স্যার, দারুণ লাইন জাজ হয়েছে, খুব ভালো।’

কে তিনি? রজার ‘রোবট’ ফেডেরার। যাঁর মুকুটে মোট ১৯টি সিঙ্গলস গ্র্যান্ডস্লাম খেতাব। এই নিয়ে ৮বার উইম্বলডন জিতে রজার প্রমাণ করলেন তিনি নিজেই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি নিজেই এক ইতিহাস। সোমবার কলকাতা ফেরার সময় লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে অভিষেক মুখার্জি টেলিফোনে বলছিলেন, ‘আমার কাছে উইম্বলডন নতুন কিছু নয়, এর আগে ১২বার সেন্টার কোর্টে আম্পায়ারিং করেছি। কিন্তু এবারের ঘটনা আলাদা, একেবারেই ব্যতিক্রম। উইম্বলডনের ফাইনাল ম্যাচে লাইন আম্পায়ার ছিলাম এই নিয়ে দুইবার, ২০১৪, ২০১৫, সেবারও ফাইনালে খেলেছিলেন ফেডেরার, কিন্তু ওই দুবারই ফাইনালে উঠে হেরে গিয়েছিলেন। এবার জিতে সাম্প্রাসের সাতবারের খেতাব জয়ের রেকর্ড টপকে গেলেন।’

এটা না হয় গেল রজার ফেডেরারের ব্যক্তিগত মুকুট জয়ের কথা। কিন্তু বাংলার অভিজ্ঞ টেনিস আম্পায়ারের কাছেও এই উইম্বলডন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অভিষেক ফ্লাইটে বসেই বলছিলেন, ‘উইম্বলডনে আম্পায়ারিং করা, আর ক্রিকেটে লর্ডসে ম্যাচ পরিচালনা করা একই আভিজাত্যের ব্যাপার।’ তারপর বাড়তি পাওনা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে থাকার কারণে, যা তাঁর ১৩বছর আম্পায়ারিং জীবনে কোনওদিন হয়নি। ‘এই সুযোগ পাওয়া যায় না, কিন্তু এবার ফাইনালে মোট নয়জনের আম্পায়ারদের প্যানেলের মধ্যে আমিও ছিলাম। আর আম্পায়ারদের পুরস্কৃত করা, সেইসঙ্গে অভিবাদন জানানো, এটা সেন্টার কোর্টের সংস্কৃতির মধ্যেই পড়ে।’ বলার সময় আপ্লুত অভিষেক।

বাংলার একজন টেনিস আম্পায়ার উইম্বলডন ফাইনালে ফেডেরারের ম্যাচে লাইন জাজ করছেন। এমনিতেই গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো ব্যাপার। কিন্তু ৪৬-র অভিষেক বড়ই নির্লিপ্ত, স্বাভাবিকও। তাঁর বক্তব্য, ২০০৫সালে প্রথম উইম্বলডনের ম্যাচ খেলিয়েছিলাম, তারপর প্রতিবছরই নির্বাচিত হই। আমার কাছে যা প্রাপ্তির, তা হলো, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ফেডেরারের মতো সর্বকালের সেরা টেনিস কিংবদন্তির সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। খুব কাছ থেকে দেখে ফেডেরার সম্পর্কে এক টেনিস আম্পায়ারের বিশ্লেষণ, ‘একজন কমপ্লিট চ্যাম্পিয়নের যা গুণ থাকা উচিত, সবটাই রয়েছে তাঁর। আমরা জানি না কাল আমাদের শরীর কতটা দেবে, আর আগামী একবছর কতোটা ফিট থাকবেন, বলে দেবেন সুইস মহাতারকা। নিজের শরীরটাকে ভালো চেনেন বলেই ৩৫-র ওপরেও এই ধরনের ‘ম্যাজিক’ ফিটনেস।’

অভিষেকের ভালো লেগেছে ফেডেরারের অমায়িক ও শিক্ষণীয় ব্যবহারের সঙ্গে সেন্টার কোর্টের ক্রীড়ামনস্ক পরিবেশও। ‘আমাদের দেশপ্রিয় পার্ক কিংবা সাউথ ক্লাবে যেমন মূল কোর্টের আগে বিরাট চত্বর থাকে, তেমনি অল ইংল্যান্ড ক্লাবেও একই ব্যাপার। অনেক রথী-মহারথীরাই সেন্টার কোর্ট ওয়ান গ্যালারির টিকিট পান না, তাঁরা জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখেন, সেখানেও সামনে বসার জন্য হুড়োহুড়ি পরে যায়, কে আগে বসবেন।’ তবে কলকাতায় আসার আগে অভিষেকের স্মৃতিতে শুধুই ফেডেরার, যিনি বাংলার আম্পায়ারের সঙ্গে করমর্দন করে প্রশংসাও করেছেন। এটাই বা কম কিসের!