ভুয়ো সংস্থার মাধ্যমে টাকা পাচারে
মিলছে তৃণমূলের যোগ,
দাবি তদন্তকারী সংস্থার

বাদল অধিবেশনের অজুহাতে নারদ তদন্তে শ্লথতা

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১৭ই জুলাই— ২১শে জুলাই পর্যন্ত জেরা থেকে ‘ছাড়’ চেয়েছেন শাসক তৃণমূলের একাধিক নেতা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ হয়েছে। শুরু হয়েছে সংসদের বাদল অধিবেশন। নারদ তদন্তে কী তাহলে ফের শ্লথতার পর্ব শুরু হতে চলেছে? উঠছে প্রশ্ন।

যদিও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্রের দাবি, নোট বাতিলের কাণ্ডের পর এরাজ্যে বিশেষত কলকাতা শহরে পরপর বেশ কয়েকটি ঝটিকা তল্লাশি অভিযান নতুন করে পি এম এল অ্যাক্ট-এ তদন্তকে ‘গতিশীল’ করেছে। কলকাতা শহর ও শহর কেন্দ্রীক একাধিক ভুয়ো সংস্থা থেকে যা নথি উদ্ধার হয়েছে তাতে স্পষ্ট, সাম্প্রতিক সময়কালে কলকাতা শহর টাকা পাচার ও হাওলা কারবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যেই সি বি আই রাঁচির আয়কর দপ্তরের কমিশনারকে গ্রেপ্তার করেছে। বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে নতুন নোটে প্রায় ৩কোটি টাকা। তাপস দত্ত নামে সেই ব্যক্তিকে জেরা করে রীতিমত এক চক্রের হদিশ পেয়েছে সি বি আই। সেই চক্রের সঙ্গে এমন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের যোগ মিলেছে যাদের সঙ্গে আবার শাসক তৃণমূলের একটি প্রভাবশালী অংশের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

সেই তদন্তেই রীতিমত চাঞ্চল্যকর তথ্য এবার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে। তদন্তকারী দলের এক আধিকারিকের কথায়, যা উদ্ধার হয়েছে ধৃত আয়কর দপ্তরের প্রিন্সিপাল কমিশনার তাপসকুমার দত্তের কাছ থেকে তা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। নোট বাতিল পর্বে আরও কয়েকশো কোটি টাকা বেমালুম সাদা হয়েছে সল্টলেকের বাসিন্দা এই আয়কর আধিকারিকের মাধ্যমেই। সি বি আই গোয়েন্দাদের দাবি, এই গোটা চক্রে শাসক দলের একটি প্রভাবশালী অংশের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। গত নভেম্বরে নোট বাতিলের পর্বের সময়ে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা এই ব্যক্তির মাধ্যমেই শাসক দলের সাংসদ ও বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বেমালুম ‘সাদা’ করে নিয়েছিলেন। ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের একাধিক সংস্থার মাধ্যমে সেই টাকা খাটানো হয়েছিল। গোটা প্রক্রিয়ায় সাহায্য করেছিল ধৃত তাপস দত্ত। তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল।

গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, শুধু ব্যক্তিগত টাকাই নয়, একাধিক সংস্থা এমনকি শাসক দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের টাকাও এই চক্রের মাধ্যমেই অন্যত্র বিনিয়োগ হয়ে সাদা টাকায় রূপান্তরিত হয়েছিল। খুব সুকৌশলেই ভুয়ো সংস্থার মাধ্যমে এই চক্র কাজ করেছিল। এমনকি ধৃত আয়কর দপ্তরের আধিকারিকের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পুরানো নোট ব্যাঙ্ককে এড়িয়েই ভাঙিয়ে নেওয়া হয়েছিল এই চক্রের মাধ্যমে। তাতে শাসক দলের বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধিও যুক্ত আছেন বলে দাবি তদন্তকারী আধিকারিকদের। ইতিমধ্যে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যাক্টে নারদকাণ্ডে তৃণমূলের বারোজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে এফ আই আর দায়ের করেছে। টাকা পাচারের এই নতুন কারবার সামনে আসায় নতুন করে তদন্ত হবে নাকি তা অন্য কোন তদন্তের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হবে সে বিষয়ে যদিও সি বি আই’র তরফে এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলেই জানা গিয়েছে।

এই পরিস্থিতি আয়কর দপ্তরও পৃথকভাবে গোটা বিষয়টি নজরে রাখছে। নোট বাতিলকাণ্ডের পরে এরাজ্যের বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গতিবিধির ওপরেও নজর রাখা হচ্ছে। ত্রিনেত্রকাণ্ডের সময়েই ভুয়ো সংস্থার সঙ্গে তৃণমূলী শীর্ষ নেতাদের যোগের তথ্য সামনে এসেছিল। ত্রিনেত্র-র ঘটনা দেখিয়েছিল কীভাবে খাতায় কলমে একাধিক ভুয়ো সংস্থা তৈরি করে চিট ফান্ডের টাকা সেই কোম্পানির একাধিক অ্যাকাউন্ট ঘুরে একাংশ তৃণমূলের তহবিলে এবং বাকি অংশ বেবাক বিদেশে পাচার হয়েছে গিয়েছে। আবার শিখণ্ডী সংস্থাগুলি শেয়ার বাজারে নাম নথিভূক্ত করে সেখানে প্রচুর লভ্যাংশের টোপ দিয়ে শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা তা একেবারে উধাও হয়ে যায়। এরকম প্রায় ৯০টি সংস্থাতেই ১লা এপ্রিল তল্লাশি চালিয়েছিল।

পাশাপাশি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্রের দাবি, গত বছরের নভেম্বর মাসের নোট বাতিলকাণ্ডের সময় ওই তৃণমূল নেতাদের সম্পত্তি ও অর্থের হিসাবও নিচ্ছে দুই কেন্দ্রীয় সংস্থা একযোগেই। সেই সময়েই একাধিক জেলা সমবায় ব্যাঙ্কে অস্বাভাবিক হারে টাকা জমা পড়া এবং শহর ও শহরতলি এলাকায় রিয়েল এস্টেটের ব্যবসায় নগদ বিনিয়োগের হিসাবও খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা ই ডি। সেই সূত্রে দক্ষিণ কলকাতার তৃণমূলের দুই প্রভাবশালী বিধায়ক, পূর্ব মেদিনীপুরের এক সাংসদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও খতিয়ে দেখছে ই ডি। যদিও নারদ তদন্তে তিনজনকে সমন পাঠিয়ে জেরা ছাড়া ই ডি’র নারদ তদন্তে তৎপরতা এখনও দেখা যায়নি।

Featured Posts

Advertisement