গোরক্ষক গুন্ডামি ও
প্রধানমন্ত্রী

গোরক্ষার নামে দেশজুড়ে হিন্দুত্ববাদীদের ক্রমবর্ধমান গুন্ডামিকে কেন্দ্র করে সংসদে ঝড়ের পূর্বাভাস ছিল। তার আঁচ পেয়ে আগেই আত্মরক্ষার কৌশ‍‌লী পদক্ষেপ নিলেন প্রধানমন্ত্রী। দিনের পর দিন নীরবতা পালন করে হঠাৎ করে মুখ খুলেছেন সর্বদলীয় বৈঠকে। গোরক্ষার নামে রাজ্যে রাজ্যে খুন-জখম, হামলার বিরুদ্ধে মুখর হলেও এসব বন্ধ করার কোনও দায় নিলেন না তিনি। প্রকারান্তরে সব প্রশাসনিক দায় রাজ্যগুলির ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন। আর রাজনৈতিক দায় সব রাজনৈতিক দলের ওপর ছেড়ে দিয়ে তাঁর দল বি জে পি-কে স্বস্তি দিলেন। বোঝাবার চেষ্টা করলেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যেহেতু রাজ্যের তাই তারাই যা ব্যবস্থা নেবার নেবে। তাঁর বা কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু করার নেই। দেশজুড়ে গোরক্ষক গুন্ডামি চলতে থাকলেও তাঁর অপ্রত্যাশিত নীরবতার ব্যাখ্যা দিলেন সম্ভবত এভাবেই।

কিন্তু দায় এড়াতে চাইলেই কি এড়ানো যায়। হতে পারেন তিনি প্রধানমন্ত্রী, তার মানে এই নয় যে তিনি দলের কেউ নন। বস্তুত দলের কোন পদে কাকে বসানো হবে, কোন রাজ্যের নেতা কে হবে, কাকে মুখ্যমন্ত্রী করা হবে সবটাই হয় তাঁর অঙ্গুলি হেলনে। নাগপুরের সঙ্ঘ কর্তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে দলের সর্বস্তরের নিজের অনুগতদেরকেই দায়িত্ব দেন তিনি। অতএব তিনি অখুশি হবেন এমন কোনও কাজ দলের কোনও রাজ্যনেতা বা মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে সম্ভব নয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায় সাংবিধানিকভাবে রাজ্যের হাতে ঠিকই তবে কোনও বি জে পি শাসিত রাজ্য সে কাজ কতটা কিভাবে করবে সেটা মোদীর পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভরশীল। অতএব গোরক্ষকদের বিরুদ্ধে রাজ্যগুলিকে ব্যবস্থা নেবার কথা প্রকাশ্যে বলা হলেও আড়ালে তাঁর ইচ্ছাটা কি সেটাই আসল কথা।

এখানে মনে রাখতে হবে গোরক্ষকদের তাণ্ডব প্রধানত বি জে পি শাসিত রাজ্যে। ইতিমধ্যে একাধিক ভয়ংকর ঘটনাও ঘটেছে। এইসব ঘটনায় যে কয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের সকলেই সঙ্ঘ পরিবারের কোনও না কোনও শাখার সদস্য বা সক্রিয় কর্মী। আর যারা আক্রান্ত ও নিহত হচ্ছেন তারা সংখ্যালঘু। এরপর বোধ হয় ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই এর পেছনে কাদের মদত আছে। বি জে পি-র রাজনৈতিক সুবিধার দিকে তাকিয়েই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি এমন নৈরাজ্য ও গুন্ডামি চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রেপ্তার হলেও শেষ পর্যন্ত সাজা কতটা হবে সন্দেহ আছে। প্রধানমন্ত্রী তথা শাসকদল তথা সঙ্ঘ পরিবার যদি সত্যি সত্যি এই গুন্ডামির নীতিগত বিরোধী হয়ে থাকে প্রধানমন্ত্রীই প্রতিটি ঘটনার পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানাতেন এবং দলীয় মুখ্যমন্ত্রীদের নেতা হিসাবে নির্দেশ দিতেন কড়া ব্যবস্থা নিতে যাতে দ্বিতীয়বার এমন কোনও ঘটনা না ঘটে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তা করেননি। তেমনি বি জে পি নেতারাও যথারীতি নীরব। লোক দেখানোর মতো দু-এক কথা বললেও প্রচ্ছন্ন সমর্থনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। আর সঙ্ঘ কর্তারা দ্বিচারিতার আশ্রয় নিয়ে কার্যত গোরক্ষক বাহিনীকেই প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে সবরমতী আশ্রমে বসে প্রধানমন্ত্রী গোরক্ষকদের অত্যাচার নিয়ে কুম্ভীরাশ্রু ফেলেছিলেন। তার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই তাণ্ডব চলেছে। তারপরও আরও বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে, খুন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যথারীতি সেই ন্যাকা কান্নাই কেঁদে যাচ্ছেন। মোদী, বি জে পি, আর এস এস যদি চায় গোরক্ষকদের অত্যাচার বন্ধ হোক তাহলে এমন একটি ঘটনাও ঘটবে না। আসলে হিন্দুত্ববাদীরা যা চায় গোরক্ষকবাহিনী সেটাই করে। যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও মেরুকরণের মাধ্যমে আর এস এস‍‌ হিন্দুরাষ্ট্র বানাতে চায় সে প্রকল্পেরই শরিক গোরক্ষকবাহিনী। বি জে পি-আর এস এস এদের কোনওদিনই নিরুৎসাহিত করবে না। তেমনটা চাইবেন না মোদীও, তাই এদের গুন্ডামি বন্ধ হবার সম্ভাবনা নেই। প্রধানমন্ত্রীকে দায় এড়াবার জন্য কৌশলী পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে মানুষের চোখে ধুলো দেবার জন্য।