বেড়ি ভাঙার কারিগর বেমেবেম

নিজস্ব প্রতিনিধি

মণিপুর। নামটা কানে গেলেই অনেকগুলো ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হরতাল, ১৪৪ ধারা, সেনাবাহিনীর টহলদারি। জঙ্গি সংগঠনের গেরিলা আক্রমণ, ক্রমাগত সংঘর্ষ। স্বাধীনতার পর থেকেই লাগাতার অশান্ত উত্তর-পূর্বের এই রাজ্য। নতুন শতাব্দীতে এসেও সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়নি পরিস্থিতির।এখনও রাজধানী ইম্ফলসহ রাজ্যের বাকি অংশের মানুষের মনে অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে ভয়।এখনও ওখানে স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে বড় বাধা সমাজ। আচ্ছা আজ থেকে যদি পিছিয়ে যাওয়া যায় আরও বছর তিরিশ। আর স্বপ্নটা যদি একটা মেয়ে দেখে থাকে? একরত্তি মেয়েটা যদি স্বপ্ন দেখে থাকে ফুটবলার হওয়ার? যদি স্বপ্ন দেখে থাকে ফুটবলকে নিয়েই তাঁর চারপাশের আর দশটি মেয়েকে নতুনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখানোর?

স্বপ্ন দেখা একরত্তি মেয়েটার নাম ছিলো বেমবেম দেবী। হাজার বাধা এসেছিল। বাধা এসেছিল সমাজ থেকে। বাধা এসেছিল নিজের বাবার কাছ থেকে। সবাই প্রশ্ন তুলেছিলেন ‘মেয়ে হয়ে ফুটবল খেলবে?’ ফুটবলটা খেলেছিল মেয়েটা। বাধার পাহাড় টপকে ফুটবলটা খেলেছিল। তারপর শুধু এগিয়ে যাওয়ার পালা। টানা ২০ বছর জাতীয় মহিলা দলের জার্সি গায়ে খেলা হয়ে গেছে তাঁর। বুটজোড়া তুলে রেখেছেন বছর দেড়েক হয়ে গেলো। মনে একটা আক্ষেপ ছিল, এতেবছর দেশের হয়ে খেলেও যোগ্য সম্মানটা পেলেন কই? একের পর এক ক্রীড়াবিদ যখন অর্জুন পাচ্ছেন, তিনি থেকে গেছেন ব্রাত্য। শেষ পর্যন্ত সেই আক্ষেপও মিটলো। এবছরই অর্জুন প্রাপকদের তালিকায় নাম আছে এই মহিলা ফুটবলারের। জীবনের একটি বৃত্ত যেন সম্পূর্ণ হলো ইম্ফলকন্যার।

বেমবেমের ফুটবলপ্রেমটা ছোট থেকেই। তবে প্রথম ফুটবল ম্যাচে নামার ঘটনাটা ভারী অদ্ভুত। ১৯৮৮ সালের ইম্ফল। ইউনাইটেড পায়োনিয়ার ক্লাব। স্থানীয় একটি ফুটবল প্রতিযোগিতার জন্য ফুটবলার প্রয়োজন। ছেলেদের মতো ছোটছোট চুলের বেমবেম হঠাৎ মাঠে নেমে গেলো। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুটবলও খেললো। তারপর পেরিয়ে গেছে ২৯ বছর। আজও ঘটনাটি মনে পড়লেই হেসে ফেলেন বেমবেম। প্রথম ট্রফিটা আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। তারপর শুরু আরও কঠিন পথ চলা। যত না তাঁকে লড়তে হয়েছে, মাঠের ভিতরের প্রতিপক্ষের সঙ্গে, তার থেকে অনেক বেশি লড়তে হয়েছে মাঠের বাইরের প্রতিপক্ষের সঙ্গে। ছোটবেলায় পড়াশুনায় বেশ ভালো ছিলেন বেমবেম। তাই মেয়ে পড়াশুনো না করে ফুটবল খেলবে, তা একদমই না পসন্দ ছিল বেমবেমের বাবার।

তবু বেমবেম ভেঙে যেতে দেননি স্বপ্নটা। মণিপুরেরই বিভিন্ন ক্লাবে ফুটবল খেলা চালিয়ে যান। নজরে পড়েন কিংবদন্তি মহিলা ফুটবলার এল রামোনি দেবীর। ১৯৯৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে সুযোগ পান মণিপুরের মহিলা ফুটবল দলে। তখনও পুরোপুরিভাবে সমর্থন ছিল না পরিবারের। তার ঠিক দুবছর পর আরও বড় সাফল্য। মাত্র ১৫ বছর বয়সে সিনিয়র মহিলা ফুটবল দলে সুযোগ পান বেমবেম দেবী। বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে না খেলেই সরাসরি সিনিয়র দলে! বেমেবেম দেবী বলেই হয়তো সম্ভব হয়েছিল।

তারপর একটা চলমান ইতিহাস। টানা ২১ বছর। পরিসংখ্যান বলছে জাতীয় দলের জার্সিতে ৮৫টি ম্যাচে বেমবেম দেবী গোল করেছেন ৩২টি। তবে পরিসংখ্যান বলছে না অনেক কথাই। এই ২১ বছর বেমবেম লড়ে গেছেন। ক্লান্তি এসেছে। শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছেন। কিন্তু থেমে যাননি। হেরে যাননি। ২০০১ সালে প্রথম সেরা মহিলা ফুটবলারের পুরস্কার চালু করে এ আই এফ এফ। আর প্রথমবারেই সেরা ফুটবলার বেমবেম দেবী। আবার ঠিক ১২ বছর বাদে ২০১৩-তে একই সম্মানে সম্মানিত হন বেমবেম। টানা এতোদিন পারফরম্যান্স ধরে রাখাটা মোটেও সহজ নয়। ভারতীয় মহিলা ফুটবল দল বিশ্বে প্রথম পঞ্চাশের মধ্যেও চলে এসেছিল। তাও কতজনই বা মাথা ঘামাতেন ভারতীয় মহিলা ফুটবল নিয়ে? ২০১৪ সালে মালদ্বীপের ফুটবল ক্লাব নিউ রেডিয়েন্টের হয়েও খেলেন তিনি।

আর দেশের হয়ে ঘাম, রক্ত ঝড়ানোর প্রাপ্তি? ১৯৯৮ সালে মণিপুর পুলিশে কনস্টেবল পদে চাকরি পেয়েছিলেন। এতবছরে পদন্নোতি হয়েছে মাত্র একবার। এর আগে তিনবার অর্জুনের জন্য মনোনিত হয়েও অর্জুন পাননি তিনি। না পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়েও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন নতুন ফুটবলার তুলে আনার কাজে। শেষ অবধি দেরীতে হলেও কিছুটা যন্ত্রণা মিটছে তাঁর। শান্তি মল্লিকের পর প্রথম মহিলা ফুটবলার হিসাবে অর্জুন পাচ্ছেন বেমবেম। বেমবেমের এই অর্জুন পাওয়ার খবর অনুপ্রাণিত করবে গোটা দেশের হাজারো বেমবেমকে। সমাজের হাজারো বাধার শৃঙ্খল ছিঁড়ে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সাহস পাবে তাঁরাও।



Featured Posts

Advertisement