সংখ্যালঘু উন্নয়নের কাজ থমকে,
সুলতানকে সরিয়ে দায়িত্ব আমলাকে

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১২ই আগস্ট — রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারিত সাংসদ সুলতান আহমেদ। এই প্রথমবার কোনও নির্বাচিত প্রতিনিধি নন,মানুষের কাছে জবাবদিহি করার কোনও দায়িত্ব নেই, এমন একজন আমলাকে গুরুত্বপূর্ণ ওই নিগমের চেয়ারম্যান করেছে রাজ্য সরকার।

সিদ্ধান্ত মমতা ব্যানার্জির। গত বৃহস্পতিবার এই সংক্রান্ত সরকারি আদেশনামা প্রকাশিত হয়েছে। রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের চেয়ারম্যান করা হয়েছে কেরালার বাসিন্দা, আই এ এস অফিসার পি বি সেলিমকে। বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন সেলিম। বর্তমানে রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষাদপ্তরের সচিব তিনি। দপ্তরের মন্ত্রী স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি। সুলতান আহমেদ ছাড়া তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ইদ্রিশ আলি আছেন। সংখ্যালঘু আর যাঁরা আছেন, তাঁদের সবার বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু ইদ্রিশের দক্ষতায় প্রবল সন্দিহান মমতা ব্যানার্জি। তাই আলোচনার সময় মুখ্যমন্ত্রী স্রেফ ঝেড়ে ফেলেন ইদ্রিশ আলির নাম।

কিন্তু কেন এই বদল? রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষাদপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী গিয়াসউদ্দিন মোল্লা শনিবার এই বিষয়ে একটি শব্দ বলতে চাননি। সিদ্ধান্ত যেখানে দলনেত্রীর, গিয়াসউদ্দিনের তাই এর বিরুদ্ধে একটিও কথা বলার সাহস নেই। কিন্তু তিনি পক্ষেও কোনও কথা বলতে চাননি। অন্য দিকে যাঁকে ঘিরে এতকিছু, সেই সাংসদ সুলতান আহমেদ এদিন বলেছেন,‘‘সরকারি আমলা কেন নিগমের চেয়ারম্যান হয়েছেন, আমি তা নিয়ে কিছু বলতে পারবো না। তবে আমি পদত্যাগ করেছি। আমাকে সরানো হয়নি। মুখ্যমন্ত্রীও আমাকে এই বিষয়ে কিছু বলেননি।’’ কেন পদত্যাগ করলেন তা নিয়ে উলুবেড়িয়া থেকে নির্বাচিত এই তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কিছু বলতে চাননি। শুধু বলেছেন,‘‘আমাকে এসবের মধ্যে জড়াবেন না।’’

সুলতান আহমেদের পদত্যাগ এবং আমলা সেলিমের চেয়ারম্যান হওয়া নিয়ে দুটি বক্তব্য শোনা যাচ্ছে নবান্নে। প্রথমত, সংখ্যালঘু উন্নয়নের সবকটি প্রকল্পে রাজ্য সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের সব ধরনের স্কলারশিপ গত তিনবছরে রাজ্যে কমেছে। লাগাতার নেমেছে। এমনকি কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রকের টাকায় রাজ্যে যে ‘কর্মতীর্থ’ তৈরির কাজ হয়েছে, সেখানেও বেশ ব্যর্থ হয়েছে সরকার। ভবন বানানো হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দোকান বিলি করা যায়নি। এমনকি সংখ্যালঘু উন্নয়ণ মন্ত্রকের মাল্টিসেক্টোরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে আই টি আই, পলিটেকনিকের কাজও পশ্চিমবঙ্গ আশানুরূপ নয়। যদিও এই সব কাজের পর্যালোচনা, তদারকি প্রধানত মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্য সরকারেরই দায়িত্ব বেশি, তবু আপাতত সুলতান আহমেদকে সরিয়ে দলে এবং ঘনিষ্ঠ বৃত্তের সংখ্যালঘুদের একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

গত ছবছরে এই ধরনের নিগমগুলির কাজ লাগাতার গুরুত্বহীন করে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। ‘‘আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন যথেষ্ট অরাজকতা চলছে। সংখ্যালঘু নিগমেরও প্রায় কোনও কাজ নেই। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের মাথায় আমলা বসিয়ে আসলে নির্বাচিত সাংসদদের ভূমিকাকেই খাটো করেছেন মুখ্যমন্ত্রী’’—এমনই বক্তব্য রাজ্যের মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের এক সদস্যের।

তবে আরও একটি যুক্তি ঘুরছে শাসক মহলে। নারদ স্টিং অপারেশনকাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্ত সুলতান আহমেদ। ব্যবসায়ী সংস্থার প্রতিনিধি সেজে যাওয়া সাংবাদিক ম্যাথু স্যামুয়েলের থেকে তিনি পাঁচ লক্ষ টাকা নিয়েছেন তিনি, অভিযোগ এমনই। স্টিং অপারেশনের তদন্তে গত ৩রা জুলাই সুলতান আহমেদকে নিজাম প্যালেসে সাত ঘণ্টা জেরা করে সি বি আই। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থারসূত্রে জানা গেছে, সি বি আই-কে ‘সহযোগিতা’ই করেছেন সুলতান। জেরায় এই তৃণমূলী সাংসদ বেশ কিছু ‘গুরুত্বপূর্ণ’ তথ্য দিয়েছেন বলেই দাবি তদন্তকারী আধিকারিকদের। জানা গেছে, স্যামুয়েলের হয়ে ‘লবিং’ করেছিলেন সুলতান। তাঁর অফিসে বসেই সুলতান আহমেদ ফোন করে তৃণমূলী সাংসদ প্রসূন ব্যানার্জি ও কাকলি ঘোষদস্তিদারকেও ম্যাথু স্যামুয়েলের সঙ্গে দেখা করার জন্য বলেছিলেন সুলতান, এমনও অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীকালে ম্যাথু সুলতান আহমেদের নাম করেই কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও প্রসূন ব্যানার্জির সঙ্গে দেখা করেন বলে তদন্তকারীরা জানতে পারেন। আরও এক তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদকেও সুলতান আহমেদ ফোন করেছিলেন এ বিষয়ে।

সি বি আই-কে এই ‘সহযোগিতা’-র কারনেই সুলতান আহমেদকে সরিয়ে আড়াল করতে চেয়েছেন দলনেত্রী। তাই নিগমের পদ থেকে অপসারণ।