ন্যক্কারজনক! তার চুরির অভিযোগে এবার প্রতিবাদী প্রতিমা দত্ত গ্রেপ্তার

নিজস্ব সংবাদদাতা

হাওড়া, ১২ই আগস্ট — স্বামী তপন দত্তর খুনিদের শাস্তির জন্য ছবছর লড়ছেন। বৃহস্পতিবারই সুপ্রিম কোর্টে মুখ পুড়েছে সেই খুনে অভিযুক্তদের। শনিবার হাওড়া জেলার পুলিশকে দিয়ে সেই প্রতিবাদী প্রতিমা দত্তকে গ্রেপ্তার করিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কেবলের তার চুরি করেছেন!

এদিন রীতিমত হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে পুলিশ অসুস্থ প্রতিমা দত্তকে হাওড়া আদালতে হাজির করে। সারাদিন তাঁকে ওষুধ খেতে দেওয়া হয়নি। আদালতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখান থেকে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার নির্দেশ দেন বিচারপতি। আগামী ১৬ই আগস্ট, বুধবার প্রতিমা দত্তকে আবার আদালতে হাজির করতে নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। একদিন তাঁর জেল হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। যদিও এদিন পুলিশ তাঁকে নিজেদের হেপাজতে চেয়ে আবেদন করেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক জামিন অযোগ্য ধারাসহ অনেকগুলি ধারায় মামলা সাজিয়েছে পুলিশ।

প্রতিমা দত্তের গ্রেপ্তারের ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু, সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক সূর্য মিশ্র। বিমান বসু বলেছেন, ‘উনি গনতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করছিলেন। লড়াই করছিলেন সত্য উদ্‌ঘাটনের জন্য। সুপ্রিম কোর্টেও জয়ী হয়েছেন তিনি সম্প্রতি। তাঁকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হেনস্তা করার চেষ্টা হচ্ছে। আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি।’ তীব্র নিন্দা করে সূর্য মিশ্র বলেছেন, ‘অপরাধীরা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর ন্যায়বিচার চাইছেন যাঁরা, যাঁরা লড়ছেন তার জন্য, তাঁদের গ্রেপ্তার করে জেলে ঢোকাচ্ছে রাজ্য সরকার। স্বামী তপন দত্তর খুনের বিচার চাওয়া প্রতিমা দত্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ওই খুনের অন্যতম অভিযুক্ত মন্ত্রীকে রক্ষার জন্য। আমরা অবিলম্বে প্রতিমা দত্তর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি।’ ঘটনার নিন্দা করেছেন পার্টির হাওড়া জেলা কমিটির সম্পাদক বিপ্লব মজুমদারও।

দুর্বৃত্তদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গাতেই মমতা ব্যানার্জির দল, সরকার প্রতিবাদী, লড়াকুদের হেনস্তা করছে। সুটিয়ার প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের খুনে অভিযুক্ত খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের ঘনিষ্ঠরা। কামদুনির ধর্ষণ, খুনের ঘটনার প্রতিবাদী শিক্ষক প্রদীপ মুখার্জিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে সম্প্রতি। কুলটিতে এক ধর্ষিতাকে থানায় অভিযোগ লেখাতে সহায়তা করায় শুক্রবারই খুন হয়েছেন এক প্রৌঢ়া। এমন আরও ঘটনা আছে। তারপর শনিবার নিশ্চিন্দার প্রতিমা দত্ত গ্রেপ্তার। পশ্চিমবঙ্গ প্রতিবাদীদের পক্ষে বিপজ্জনক, আর খুনি-ধর্ষক-নেশাখোরদের প্রমোদরাজ্য হয়ে উঠছে বলেই বলেই আশঙ্কা করছেন অনেকে।

এই প্রসঙ্গে কংগ্রেসনেতা আব্দুল মান্নান জানান, ‘ওঁরা যাতে ভয় পেয়ে আর না এগোয় তাই মিথ্যে মামলায় জড়ানো হচ্ছে। এই সরকারের আমলে এরকম আগেও হয়েছে। আমরা মোকাবিলা করবো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে।’ প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গাঙ্গুলি বলেন, ‘প্রতিমা দত্ত যেভাবে ‌আইনি লড়াই লড়ছেন সেটা যদি রূপ নেয় তাহলে অনেকের মুখোশ খুলে যাবে। স্বামীর মৃত্যুর সুবিচার চাইতে আদালতে গেছেন, তাই শাসকদলের কিছু কিছু লোকের অসুবিধা হচ্ছে। কোন রাজ্যে আমরা বাস করছি! গণতন্ত্র কোথায়!’

শনিবার ভোরে নিশ্চিন্দা থানার পুলিশ বাড়ি থেকে প্রতিমা দত্তকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নাকি প্রতিবেশীদের কেবল তার চুরি করেছেন! প্রতিমা দত্ত বালিতে কেবল কানেকশনের ব্যবসা করেন। তাঁর প্রতিবেশী অসিত বিকাশ দত্তও ওই ব্যবসা করেন। গত মার্চে ওই ব্যক্তি প্রতিমা দত্তর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। তারই সূত্র ধরে বিশাল পুলিশবাহিনী এদিন প্রতিমা দত্তের বাড়িতে যায়। এদিনই তাঁকে হাওড়া আদালতে হাজির করানো হয়। এজলাসে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

যে বছর তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার প্রথমবার রাজ্যে ক্ষমতায় আসে, সেই ২০১১-তেই খুন হন তৃণমূল কংগ্রেসকর্মী তপন দত্ত। রাজ্যের সমবায় মন্ত্রী অরূপ রায় তখন ছিলেন কৃষি বিপণন মন্ত্রী। তাঁর বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর লোক ছিলেন তপন দত্ত। তিনি একটি জলাশয় ভরাট করে ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরির বিরোধিতা করছিলেন। মূলত সেই কারণেই তাঁকে বালিতে খুন করা হয় বলে অভিযোগ। স্বভাবতই সেই খুনে নাম জড়িয়েছিল অরূপ রায়ের। এছাড়াও অভিযুক্ত রমেশ মাহাতো, ষষ্ঠী গায়েন, সুভাষ ভৌমিক, কার্তিক দাস, অসিত গায়েন প্রত্যেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা অথবা কর্মী। তপন দত্তের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারও করা হয় অভিযুক্তদের। যদিও অরূপ রায়কে পুলিশ ধরেনি। পরে ২০১৬সালে কোনও ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি’ বলে হাওড়া আদালতের বিচারক অভিযুক্তদের মুক্তি দেন। ২০১৭-র এপ্রিল মাসে হাওড়া আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা করেন তপন দত্তর মেয়ে প্রিয়াঙ্কা দত্ত। কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দেয় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে হবে এবং এই মামলার শুনানি নিতে হবে হাওড়া আদালতকেই। বিপাকে পড়ে অভিযুক্তরা দ্বারস্থ হয় সুপ্রিম কোর্টের। তাদের দাবি ছিল হাইকোর্টের এই রায়কে খারিজ করতে হবে। গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট অভিযুক্তদের এই আবেদন খারিজ করে দেয়। অভিযোগ, সেই রাগে কেবলের তার চুরির অভিযোগটির ভিত্তিতে শনিবার ভোরে পুলিশ প্রতিমা দত্তকে গ্রেপ্তার করে। তাঁকে হেনস্তা করাই শাসকদল ও পুলিশের মূল লক্ষ্য— বালির বাসিন্দা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ।

প্রতিমা দত্তের বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা করেছে পুলিশ। তার মধ্যে তিনটি জামিন অযোগ্য ধারা। এদিন তাঁকে বাড়ির লোকের সঙ্গে দেখা করতে হচ্ছিল না। রোজ তিনি যে ওষুধ খান, তাও তাঁকে খেতে দেওয়া হয়নি। আইনজীবী তথা ‘আমরা আক্রান্ত’-র সদস্য ভারতী মুৎসুদ্দি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান। অনেকে এই প্রেপ্তারের প্রতিবাদে লকআপের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। মানবাধিকার সংগঠনের এক প্রতিনিধি দল হাওড়ার পুলিশ কমিশনারের কাছে ডেপুটেশন দিতে যান। আদালতে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিচারক আসেন। নানা মামলার পর প্রতিমা দত্তের মামলা ওঠে। তাঁকে লকআপ থেকে নিয়ে আসা হয়। তিনি নিজেই আসতে রাজি ছিলেন, তবু তাঁকে নিয়ে আসা হয় দু-হাত টেনে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে। পোশাক এলোমেলো। আর্তনাদ করছিলেন তিনি। আদালতের বাইরে, ভিতরে উপস্থিত মানুষ তাঁর অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে যান। আদালতেই প্রতিমা দত্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন। নিঃশ্বাসের কষ্ট হতে থাকে, তবু ডাক্তার না এলে ওষুধ দেওয়া যাবে না বলা হয়। ডাক্তার আসেন না। শেষপর্যন্ত বিচারক নির্দেশ দেন তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে। তাঁকে তখন হাওড়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিন হাওড়ায় যাঁরা প্রতিমা দত্তর গ্রেপ্তারের খবর শুনে ছুটে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি মন্দাক্রান্তা সেন। তাঁর বিবরণে উঠেছে পুলিশি প্রহসনের বিবরণ। তিনি লিখেছেন, ‘...আক্রান্ত আমরার দুই আহ্বায়ক অম্বিকেশ মহাপাত্র এবং অরুনাভ গাঙ্গুলি পুলিশ কমিশনারের দেখা না পেয়ে ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে সবে বেরিয়েছেন। আমি জোর করে আবার তাঁর ঘরে ঢুকে স্বচক্ষে আদালতে যা দেখেছি জানাই এবং এর তীব্র প্রতিবাদ করি। ...আজ রাতে চোখ বুজলেই দেখতে পাব তাঁর মাটিতে হিঁচড়ে আনা শরীরের দৃশ্য। জানি না তিনি বিচার পাবেন কিনা, মানুষ বিচার পাবে কিনা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement