অর্থনীতির বিবর্ণ ছবি

গত তিন বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশজুড়ে গলা ফাটিয়ে যাচ্ছেন, ‘আচ্ছে দিন’ আসছে বলে। কিন্তু শুক্রবার মোদী সরকারেরই আর্থিক সমীক্ষা যে তথ্য হাজির করেছে, তাতে দেখা যায় ‘আচ্ছে দিন’ এখনও বহু দূরে। এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু সে আশায় জল ঢেলে দিয়েছিল শিল্পোৎপাদন ও খুচরো বাজারে মূল্যবৃদ্ধি। কিন্তু শুক্রবার অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষায় এই অবস্থার রকমফের কিছু দেখা যায়নি। অর্থবর্ষের গোড়ায় ৬.৭৫ থেকে ৭.৫ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। তখনই অনেক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদই সরকারের আগাম পূর্বাভাসে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কাই দেখা যাচ্ছে এখন সত্যে পরিণত হলো। সমীক্ষা দেখাচ্ছে, যেভাবে দেশ চলছে, তাতে আগামী দিনে ৭.৫ শতাংশের ধারেকাছেও পৌঁছানো সম্ভব নয়। আশঙ্কার মেঘ সরকারি স্তরে ও শিল্প মহলেও। খুচরো মূল্যস্ফীতির হার ৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে থাকবে বলে সরকার আশাপ্রকাশ করলেও, তথ্য কিন্তু তাতে সায় দিচ্ছে না। এপ্রিলে খুচরো বাজারের মূল্যবৃদ্ধিও একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫.৩৯ শতাংশ, মার্চ মাসের হার ছিল ৪.৮৩ শতাংশ। জানুয়ারির পর থেকে খুচরো বাজারদর ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। তার মধ্যে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিই ছিল ৬.৩২ শতাংশ। বেড়েছে শাক-সবজি এবং ফলের দাম। এই চিত্রের কোনও পরিবর্তন ঘটেছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন না। এসব সত্ত্বেও খুচরো মূল্যস্ফীতির হার ৪ শতাং‍‌শের মধ্যে‍‌ই থাকবে বলে সরকার কীভাবে দাবি করে, সেটাই আশ্চর্যের। তবে, সমীক্ষায় সরকার স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে চাহিদা না থাকার দরুন পণ্য বিক্রি সেভাবে হচ্ছে না। অর্থাৎ ঘুরিয়ে সরকার এটাই জানাতে চাইছে, অর্থনীতিতে মন্দার বড় প্রভাব চলছে।

সরকারের চিন্তা আরও বাড়িয়েছে শিল্পোৎপাদনের হাল। জুন মাসে শিল্পোৎপাদন প্রত্যক্ষভাবে কমেছে ০.১ শতাংশ। গত মার্চ মাসে সার্বিকভাবে দেশে শিল্পোৎপাদন বেড়েছিল মাত্র ০.১ শতাংশ। এখন তাও উধাও। করুণ অবস্থা বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে। মূলধনী পণ্যের উৎপাদনও কমেছে পাল্লা দিয়ে। এই অবস্থা অর্থনীতিতে একটা বড় ধাক্কা। এটা কবুল করলেও, সরকার দায়ী করেছে কৃষিঋণ মকুবে রাজ্যগুলির সিদ্ধান্তকে। এতদিন ধরে সরকার জোর গলায় দাবি করে আসছিল যে দেশি-বিদেশি লগ্নি ঠিকমতো এলে অর্থনীতিতে চাঙ্গা দেখা দেবে। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা সরকারের আবেদনে তেমন সাড়া দেননি। ফলে লগ্নিতে ভাটার টান। এতে অর্থনীতি যেমন ধাক্কা খাচ্ছে, ধাক্কা খাচ্ছে সরকারি খরচেও। এটা অর্থনীতির পক্ষে আদৌ সুখবর নয়। ক্ষমতাসীন হবার পর পরই বিকাশের হার অর্থাৎ জি ডি পি বৃদ্ধির হারে গণনার পদ্ধতিটাই বদলে দেওয়া হয়। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদরা ব্যাপক সমালোচনা করলেও, কর্ণপাত করেনি সরকার। সরকার দেশবাসীর কাছে হাজির করে গণনার পদ্ধতি বদলের ফলে বার্ষিক বৃদ্ধির হার এক থেকে দেড় শতাংশ বেড়ে গেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির বাস্তব কর্মকাণ্ডে কোনও পরিবর্তন না এলেও বৃদ্ধির হার বেড়ে গেছে। এতে বি জে পি-র গলাবাজি আরও বেড়ে যায়। মানুষকে বিভ্রান্ত করতে বলতে শুরু করে, মোদীর আমলে বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, জি ডি পি-র হারে বৃদ্ধি দেখালেও, শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধির হারের সঙ্গে কিন্তু তার সঙ্গতি দেখা যাচ্ছে না। তেমনি দাম কমানোর আশ্বাস দিলেও বাজারে বা দোকানে কিন্তু দাম কমার লক্ষণ চোখে পড়ছে না। অর্থাৎ এভাবেই গণনার পদ্ধতি বদল করে শিল্পোৎপাদন সূচক বাড়িয়ে এবং পাইকারি মূল্য কমিয়ে দেখাবার ব্যবস্থা হয়েছে। গণনার ভিত্তিবর্ষ বদলে ২০০৪-০৫ সাল থেকে ২০১১-১২ সাল করে দেওয়া হয়েছে। এতসব করেও কিন্তু মোদীরা দেশের অর্থনীতির করুণ অবস্থা আড়ালে রাখতে পারছেন না। প্রধানমন্ত্রী মোদী ভেবেছিলেন, স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে অর্থনীতির হাল-হকিকত নিয়ে সুখবর শোনাবেন। তা হয়তো আর হয়ে উঠছে না। কারণ সরকারি সমীক্ষাই অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোয় জল ঢেলে দিয়েছে।