আন্তর্জাতিক বেতার তরঙ্গ নীতি নির্ধারণের নির্বাচন
দেশের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন বাঙালি বিজ্ঞানী

অপরাজিত বন্দ্যোপাধ্যায়

কলকাতা, ১৩ই আগস্ট — বিরল সুযোগ এসেছে ভারতের কাছে। পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে তা আরো গর্বের। এই প্রথম আন্তর্জাতিক বেতার তরঙ্গ নীতি নির্ধারণ কমিটির নির্বাচনে প্রার্থী দিচ্ছে ভারত। এই নির্বাচনে দেশের প্রতিনিধি হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এক বাঙালি বিজ্ঞানী। কলকাতার রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের বেতার পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক দেবতোষ গুহ। শুধু তাই নয়, বেতার তরঙ্গ গবেষণার শীর্ষ মঞ্চ ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব রেডিও সায়েন্স’-র কার্যকরী কমিটিতে যাওয়ার বিরাট সুযোগও রয়েছে তাঁর সামনে। ব্যবহারিক তরঙ্গ বিজ্ঞানের নীতি নির্ধারণে আগামী ৩বছর বিশেষ ভূমিকা নিতে চলেছেন অধ্যাপক দেবতোষ গুহ।

বেতার তরঙ্গ গবেষণায় অধ্যাপক দেবতোষ গুহ একটি আন্তর্জাতিক নাম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব রেডিও ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্সের প্রধান অধ্যাপক গুহ একই সঙ্গে খড়্গপুর আই আই টি’র ‘হল চেয়ার প্রফেসর’-এর দায়িত্ব পালন করছেন। মোবাইল ফোনসহ বেতার যোগাযোগে তাঁর অন্যান্য গবেষণা বহু সম্মান এনে দিয়েছে দেবতোষ গুহকে। আই আই টি’র ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রেডিও পদার্থের ব্যবহারিক প্রয়োগের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। ‘মাইক্রোস্ট্রিপ অ্যান্ড প্রিন্টেড অ্যান্টেনা’ বিষয়ে অধ্যাপক গুহের নিজস্ব গবেষণা আজ বিশ্বের অন্য দেশের কাছেও বিস্ময়ের।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মহলে জনপ্রিয় হওয়ার সুবাদেই তিনি এবারে দেশের প্রতিনিধি হয়ে এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। অধ্যাপক গুহ বেতার পদার্থবিদ্যার বিশ্বের অন্যতম সেরা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স (‌আই ই ই ই)-র একমাত্র সদস্যই নন, তাঁর হাতেই বের হয় দু’টি সেরা আন্তর্জাতিক বেতার জার্নাল। অধ্যাপনা-গবেষণার পাশাপাশি তিনি দু’টি পত্রিকার সহ-সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাই সব দিক থেকেই অধ্যাপক গুহ আমেরিকা কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের থেকে এগিয়ে। কানাডার মন্ট্রিয়লে ১৯শে আগস্ট শুরু হচ্ছে ৩২তম ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব রেডিও সায়েন্সের (উর্সি) অধিবেশন। দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক রেডিও গবেষণার আসরে অধ্যাপক গুহ শুধু ভারতের প্রতিনিধি নন, তিনি দেশের প্রার্থী।

২৬শে আগস্ট পর্যন্ত চলতে থাকা বেতার পদার্থবিদ্যার বিশ্ব সম্মেলনের চতুর্থ দিন ‘উর্সি’র কমিশনে যাওয়ার জন্য ভোট গ্রহণ করা হবে। ‘কমিশন বি’র জন্য লড়াই করছেন অধ্যাপক গুহ। রেডিও পদার্থবিদ্যার যাবতীয় বিষয়কে বেছে নিয়ে ১০টি ‘কমিশন’ গড়া হয়েছে। রয়েছে ‘কমিশন এ’ থেকে ‘কমিশন কে’। এর মধ্যে নেই শুধু ‘কমিশন আই’। প্রতি কমিশন নানা বিষয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণায় শেষ কথা বললেও ‘কমিশন বি’ অনন্য। ১০টি কমিশনের সবচেয়ে বড় ‘কমিশন বি’। এখানকার বিষয় — বেতার ক্ষেত্র ও তরঙ্গ। ‘কমিশন বি’-র বিষয়টি অত্যাধুনিক আর ব্যবহারিক বিজ্ঞান সম্পর্কিত বলেই এখানে নির্বাচিত হলে ’উর্সি’তে নীতি নির্ধারণে যোগ দেওয়ার বিরল সুযোগ মেলে।

‘প্রিন্টেড অ্যান্টেনা’র সুবাদে ‘কমিশন বি’তে অধ্যাপক গুহ এক প্রকার অপ্রতিরোধ্য। এটাও বিশ্বের অন্যান্য দেশ জানে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব রেডিও সায়েন্স বা উর্সি’ অধিবেশনে ‘কমিশন বি’তে জিতলে দূরসঞ্চারী তরঙ্গ সম্প্রসারণে বিশ্বের শেষ কথা বলবে ভারত। ‘উর্সি’ অধিবেশন বসে তিন বছর অন্তর। উর্সি’র চালিকাশক্তি এখন আছে জাপানের হাতে। ২০১৭সালের আগস্ট পর্যন্ত তার মেয়াদ। এরপর যে দেশ জিতবে তার হাতে চলে যাবে আগামী তিন বছর বেতার সম্প্রচারণ নীতির রাশ। কানাডার মনট্রিয়লে বিশ্বের দরবারে সেই নজরকাড়া লড়াই লড়বেন ভারতের দেবতোষ গুহ। বিশ্বের ১৪৪টি দেশ থেকে আগত ২৫০০জন বেতার বিশ্বের সেরার সেরা বিজ্ঞানী হিসাবে অধ্যাপক গুহ’কে বাছেন কিনা তাই দেখার। ব্যালটে নেওয়া ওই ভোট গোনার দিকে আমাদের তাকিয়ে থাকতেই হবে। ভারতীয় বেতার গবেষণার ইতিহাস হারানো দিনের স্বস্তি ওই দিনে মিলতে পারে।

Featured Posts

Advertisement