ভোটারদের ভরসা না করে আগের রাত থেকেই
ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে দাপিয়ে বেড়ালো বহিরাগতরা

অর্ক রাজপণ্ডিত

হলদিয়া ১৩ই আগস্ট— শনিবার রাতেই কার্যত হলদিয়ার ‘ভোট’ শেষ করলো তৃণমূল! রামগোপাল বর্মার থ্রিলারকেও হার মানাবে তৃণমূলের ‘হলদিয়া অপারেশন’।

রবিবার সকালে ভোটগ্রহণ শুরু পর্যন্তও অপেক্ষা করেনি ‘অতিথি’রা। শনিবার যত রাত বেড়েছে ২৯টি ওয়ার্ডে দাপিয়ে বেড়িয়েছে বহিরাগত দুষ্কৃতীরা। শনিবার রাত থেকেই শুরু হয়ে যায় বামফ্রন্টের পোলিং এজেন্টদের ভোটার কার্ড কেড়ে নেওয়া, পোলিং এজেন্টের ফরম কেড়ে নেওয়া। সারা রাত চলতে থাকে বাড়ি বাড়ি হুমকি। শনিবার রাতেই আক্রান্ত হন বিভিন্ন ওয়ার্ডের একাধিক সি পি আই (এম) প্রার্থী, পোলিং এজেন্টরা। রাত প্রায় তিনটে পর্যন্ত চলেছে বাড়ি বাড়ি ভোটার কার্ড কেড়ে নেওয়া, আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে হুমকি। শনিবার রাতেই আক্রান্ত হন ১নং ওয়ার্ডের ১নং বুথের পোলিং এজেন্ট অনিমেষ পাঠক, ২২নং ওয়ার্ডের পোলিং এজেন্ট ভূদেব হাজরা, ২৪নং ওয়ার্ডের সি পি আই (এম) প্রার্থী সাকিলা বিবিসহ একাধিক প্রার্থী, এজেন্ট। শিল্পনগরীর শুনশান নিশুত রাতে পুলিশ-প্রশাসন ছিল কুম্ভকর্ণের ঘুমে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন, রিটার্নিং অফিসার, জেলা পুলিশ সুপার, এস ডি ও, এস ডি পি ও সবাইকে রাতভর অভিযোগ জানানো হলেও, তাঁরা ছিলেন নীরব। নিষ্ক্রিয়।

রবিবার ভোটগ্রহণ শুরু হয় সকাল সাতটায়। সকাল ৬টা থেকেই শুরু হয় প্রার্থী, এজেন্টদের ‘অপহরণ’। সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই একের পর এক বুথ থেকে মেরে বের করে দেওয়া হয় পোলিং এজেন্টদের। সকাল সাড়ে সাতটা বাজার আগেই বুথ থেকে বার করে দেওয়া হয় হলদিয়ার বিধায়ক, ৮নং ওয়ার্ডের সি পি আই (এম) প্রার্থী তাপসী মণ্ডল, ২৫নং ওয়ার্ডের সি পি আই (এম) প্রার্থী অচিন্ত্য শাসমলকে। সেই সময়েই শুরু হয় একের পর এক প্রার্থী, এজেন্টকে বাইকে ‘তুলে’ নেওয়া। ২৪ নং ওয়ার্ডের সি পি আই (এম) প্রার্থী সাকিলা বিবির নির্বাচনী এজেন্ট নজরুল ইসলামকে তুলে নেওয়া হয় ভোট শুরুর আধঘণ্টার মধ্যে। অভিযোগ, তৃণমূল নেতা মাসুদের নেতৃত্বে চলে অপহরণ পর্ব। ১৫ নং ওয়ার্ডের সি পি আই (এম) প্রার্থী পরিতোষ পট্টনায়েককে অপহরণ করা হয় সেই সময়েই। ‘সকালে নিজের ভোট দিয়ে বুথের বাইরে বেরনোর পরেই অচেনা কয়েকজন জোর করে একটি বাইকে উঠিয়ে নিল। কেড়ে নিয়ে অফ করে দেওয়া হলো মোবাইল। সিটি সেন্টারের কাছে একটি হোটেলে আটকে রাখা হলো বেশ কিছুক্ষণ, সকাল ১১টা নাগাদ যখন ছাড়া হলো তখন ওসিকে ফোন করলাম। তিনি আশ্বাস দিলেন বুথে যেতে, ফের বুথে যেতেই আবার মেরে বার করে দিলো’, এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন পরিতোষ।

বুথ থেকে তুলে নেওয়া হয় ১৩নং ওয়ার্ডের সি পি আই (এম) নির্বাচনী এজেন্ট দেবাশিস মাইতিকেও। সকাল নটা বাজার আগেই বুথের বাইরে ঘেরাও করে রাখা হয় ২৬নং ওয়ার্ডের নির্বাচনী এজেন্ট সাইফুন্নিসা বিবিকে। মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বার করে দেওয়া হয় ২নং ওয়ার্ডের পোলিং এজেন্ট চিত্ত দাসকে। সকাল নটা বাজার আগেই মারধর করে বুথ থেকে বার করে দেওয়া হয় ১৬নং ওয়ার্ডের বামফ্রন্ট প্রার্থী যমুনা জানা, ১০নং ওয়ার্ডের প্রার্থী উত্তম বর্মণ, ১২নং ওয়ার্ডের প্রার্থী সুশান্ত ভার্সা, ২নং ওয়ার্ডের প্রার্থী মালা মাইতি, ২৯নং ওয়ার্ডের প্রার্থী রীনা পাহাড়ি, ২৭নং ওয়ার্ডের প্রার্থী শুভশ্রী সামন্ত, ৭নং ওয়ার্ডের প্রার্থী পলাশ করণ, ৮নং ওয়ার্ডের প্রার্থী অনন্ত বেরা, ৫নং ওয়ার্ডের প্রার্থী পাপিয়া ভৌমিক, নং ওয়ার্ডের প্রার্থী শিখা চৌধুরি, ১১নং ওয়ার্ডের প্রার্থী মণিকা করপাইককে।

রবিবারের ভোট শেষ শনিবার রাতে। প্রহসন বললেও কম বলা হয়। দশটা বাজার আগেই ভোটবাতিলের দাবিতে হলদিয়ার মহকুমাশাসক পূর্ণেন্দুশেখর নস্করের কাছে ডেপুটেশন জমা দেন সি পি আই (এম) নেতৃত্ব। তারপরেই শুরু হয় দ্বিতীয় দফায় আক্রমণ। সাড়ে দশটা বাজার আগেই ২৯টি ওয়ার্ডের সবকটি বুথ থেকেই সি পি আই (এম) এজেন্টদের মেরে বের করে দেওয়া হয়। অথচ, দিনের শেষে হলদিয়ায় ভোট পড়েছে প্রায় ৮৫শতাংশ!

একের পর এক বুথ ঘুরে চোখে পড়েছে ‘আহারে বাংলা’ উৎসব। বুথের মধ্যেই চলেছে সকালের ব্রেকফাস্ট থেকে দুপুরের বিরিয়ানি বিলি। হলদিয়ার নাগরিকদের কষ্ট করতে হয়নি। ‘অতিথি’দের কেউ কেউ নিজে গড়ে তিরিশটি পর্যন্ত ভোট দিয়েছে ‘ভোট’ দেওয়ার আনন্দে। সি পি আই (এম) নেতা শ্যামল মাইতি বলেছেন ‘একমাত্র ৬নং ওয়ার্ডে কিছুটা অবাধ ভোট হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডেই চলেছে বিরোধী এজেন্ট শূন্য বুথে দেদার ছাপ্পা। প্রায় পাঁচ হাজার দুষ্কৃতী দাপিয়ে বেড়িয়েছে সবকটি বুথ’।

ভোট শেষ হওয়ার ঢের আগে দুপুর দেড়টা নাগাদ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য প্রতিটি অভিযোগকেই উড়িয়ে দিয়েছেন। হেসে হেসে বলেছেন ‘অবাধ শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। কোথাও কোন লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। হলদিয়া হাসপাতালে চড় থাপ্পড় খেয়েও কেউ ভর্তি হয়নি। কাউকে অপহরণ করা হয়নি, সবই সি পি এমের নাটক। আমরা যাদের দাঁড় করিয়েছি তারা তো বোকা নয়, বুদ্ধিমান। তাদের মাথা আছে। তারা ভোটের দিন কেন এসব করবে?’

সত্যিই বুদ্ধিমানেরই কাজ। তাই রবিবার ভোটের আগেই শনিবার রাত জেগে ‘অপারেশন’ শেষ করেছে তৃণমূল। প্রার্থীদের হুমকি, অপহরণের অভিযোগ তুলে মহকুমাশাসকের কাছে ডেপুটেশন দেয় বি জে পি এবং কংগ্রেসও।

Featured Posts

Advertisement