মোদী-রাজের আস্ফালন

ভারতে মুসলিম সম্প্রদায় দারুণ অস্বস্তিতে রয়েছেন — এমন মন্তব্য করে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি সঙ্ঘ পরিবারের আক্রমণের মুখে পড়েছেন। তাঁর মতে, সর্বধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি সহিষ্ণুতার অভাব দেখা যাচ্ছে। সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আনসারি উপরাষ্ট্রপতি পদ থেকে বিদায়বেলায় এমন কিছু নতুন কথা বলেননি। দিল্লিতে মোদী-রাজ কায়েম হবার তিন বছরের মধ্যে ‘সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত’ এই ঘটনা কাল্পনিক নয়, অত্যন্ত বাস্তব হয়ে উঠেছে। তাতেই ক্ষিপ্ত সঙ্ঘ পরিবারের নেতারা। নতুন উপরাষ্ট্রপতি পদে ব্রতী হবার কয়েকঘণ্টা আগেই হামিদ আনসারির বিরুদ্ধে পালটা আক্রমণে নামেন বেঙ্কাইয়া নাইডু। কোনও রীতিনীতির বালাই না রেখে তিনি জানিয়েছেন, সারা বিশ্বের নিরিখে সংখ্যালঘুরা নাকি ভারতে বেশি নিরাপদ! রাজ্যসভা টিভিকে এক সাক্ষাৎকার দিয়ে আনসারি প্রশ্ন তু‍‌লেছেন ‘গণপিটুনিতে খুন, ঘর-ওয়াপসি, যুক্তিবাদীদের হত্যা, গোমাংসে নিষেধাজ্ঞার মতো ঘটনা শুধু যে ভারতীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী তাই নয়, এর ফলে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও ভেঙে পড়ে।’ এতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে সঙ্ঘনেতারা। বি জে পি-র এক নেতা জানিয়ে দিয়েছেন, অবসরের পর আনসারি নাকি রাজনীতির মঞ্চ খুঁজছেন। আর এস এস নেতা ইন্দ্রেশকুমার প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতিকে ভারত ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সোজাসাপটা জানিয়ে দিয়েছেন, ‘যে দেশে আপনি নিরাপদ বোধ করেন, সেখানেই চলে যান।’ সঙ্ঘ নেতাদের বক্তব্য বিবৃতি থেকেই পরিষ্কার অসহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটছে। এর পরিণতিতে কী কী ঘটছে সেসবই তুলে ধরেছেন আনসারি। মনের কথা প্রকাশ্যে বলে দেওয়ায় শাসকদল বি জে পি থেকে শুরু করে সঙ্ঘ-অনুগত একের পর এক নেতা তাঁকে দুষছেন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের জনৈক নেতা তো তাঁকে মহম্মদ আলি জিন্নাহ্‌র সঙ্গে তুলনা টেনেছেন। মোদী-রাজের শাসনে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, সংখ্যালঘু কিংবা অন্য ধর্মের সম্প্রদায়ের দিকে আঙুল তুলে তাঁদের ‘ভারতীয়ত্ব’ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। সব ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি সঙ্ঘ পরিবারের যে সহিষ্ণুতার অভাব ঘটেছে সেটা আজ কারো চোখে আঙুল ‍দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে না। এই পরিস্থিতি ভারতবাসী আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন। সুতরাং দেশে অসহিষ্ণুতার পরিমণ্ডলের জন্য আস্ফালনের পথ ছেড়ে শাসকদল বি জে পি এবং সঙ্ঘ নেতাদের লজ্জিত হওয়া উচিত।

দেশে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি সঙ্ঘ পরিবারের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার ঘটনা বিদেশেও বিরূপ মনোভাব তৈরি করেছে। এমন কি রাষ্ট্রসঙ্ঘেও মোদী-সরকার এই প্রশ্নে কাঠগড়ায়। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রশ্নে গত মে মাসে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনে প্রবলভাবে সমালোচিত হয় ভারত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউ রিপোর্টে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার পাশাপাশি নারী নির্যাতন, লিঙ্গবৈষম্যসহ কাশ্মী‍‌রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। চার বছর অন্তর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যে চার বছরকে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে তার বেশিরভাগটাই মোদী-জমানায়। রাষ্ট্রসঙ্ঘের বৈঠকে একের পর এক প্রতিনিধিরা দলিত, আদিবাসী এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা ভারতে উপেক্ষিত ও নির্যাতিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। তাঁরা বলেন, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ভারতে এখন প্রবল ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিধিদের তোপের মুখে দাঁড়িয়ে ভারতের প্রতিনিধি অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহতগি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। ভারতের ঐতিহ্য সহিষ্ণুতার, সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলার।’ কিন্তু বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সমা‍‌‍লোচনার তোপে ভারতের পক্ষে সহিষ্ণুতার সওয়াল অবশ্য খইয়ের মতো উড়ে গিয়েছে। ধর্মীয় কট্টরবাদ এবং অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ নিয়ে ইদানীং দেশের মধ্যেই বিতর্ক তুঙ্গে। তথাকথিত গোরক্ষা কর্মসূচি, গোমাংসে বিধিনিষেধসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা সংক্রান্ত এসব প্রশ্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে উত্থাপিত হওয়া সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে তা থেকে সরকার কোনও শিক্ষা নেয়নি। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিন্দিত হয়েও মোদী-সরকার দেখা যাচ্ছে লজ্জিত নয়। তা না হলে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারিকে তাঁর বক্তব্য নিয়ে এমন জঘন্যভাবে আক্রমণ শানাত না। মোদীদের এই ভূমিকা দেশকে পশ্চাৎপদতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

Featured Posts

Advertisement