নির্দে‍শিকা ফেরত নাও

শ্রীতমা সাউ

নির্বাচন নয়, মনোনয়ন। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে রাজ্য সরকার। এই কালাকানুন রুখতে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে গড়ে উঠছে আন্দোলন। সেই প্রসঙ্গে এই লেখা। স্লোগান উঠেছে ‘নো মোর সিলেকশান, উই ওয়ান্ট ইলেকশন।’ স্লোগান উঠেছে, ‘ইউনিয়ন না কাউন্সিল?/ইউনিয়ন, ইউনিয়ন।’ ছাত্র রাজনীতি উত্তাল আবারও। উত্তাল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। আক্রমণের লক্ষ্য বারবার সেই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, ছাত্রছাত্রীরাই মূল লক্ষ্য আক্রমণের আমাদের রাজ্যের ও দেশের সরকারের।

সাম্প্রতিককালে রাজ্য সরকারের তরফ থে‍‌কে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে একটি গভর্নমেন্ট অর্ডার (G.O) পাঠানো হয়েছে, যে নির্দেশিকা অনুযায়ী কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ গঠনের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে চলেছে এ রাজ্যের সরকার। নির্দেশিকায় ছাত্র সংসদ গঠনের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে অগণতান্ত্রিক ও ছাত্রস্বার্থবিরোধী। আমরা জানি, ২০১১ সালে এই রাজ্য সরকার আসার পরেই প্রথমেই বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের ইসি, সিন্ডিকেট, সেনেট সমস্ত জায়গা থেকে ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, গবেষক কোনও অংশ থেকে প্রতিনিধি থাকতে পারবে না সিদ্ধান্ত নিয়ে তা রূপায়িত করা হয়েছিল আজ সেই অগণতান্ত্রিক সিস্টেমের পরবর্তী ধাপ হিসাবে এবার সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকারের উপর হস্তক্ষেপ এ রাজ্যের সরকারের। আমাদের একথা খেয়াল থাকবে, ২০১৩ সালে ‘Higher Education Institute Bill 2013-এর কথা — এই বিলকে আরও ভয়াবহ আকার দিয়েই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকার খর্ব করতে এই নির্দেশিকা নামিয়ে আনা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকারের এই নয়া নির্দেশিকায় জানানো হ‍‌চ্ছে, থাকবে না কোনও ছাত্র ইউনিয়ন কলেজ ক্যাম্পাসে। তৈরি হবে স্টুডেন্টস কাউন্সিল। কেমন হবে সেই কাউন্সিল সেই বিষয়েও নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে পরিষ্কারভাবে। স্টুডেন্টস কাউন্সিল তৈরি হবে একজন প্রেসিডেন্ট এবং একজন ভাইস প্রেসিডেন্টকে নিয়ে যাঁরা হবেন অধ্যাপক এবং এদের মনোনীত করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির বিভিন্ন বিভাগের রেগুলার ছাত্রছাত্রীরা নির্বাচিত করবে যে সব ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভদের তারা, সাধারণ সম্পাদক, সহকারী সাধারণ সম্পাদককে নির্বাচিত করবে। এই নতুন কাউন্সিলের কোষাধ্যক্ষ হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কর্তৃক মনোনীত একজন অধ্যাপক। স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাথে স্টুডেন্টস কাউন্সিলের পার্থক্য এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায়। স্টুডেন্টস ইউনিয়ন তৈরি ছাত্রছাত্রীদের জন্য — ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি যার পরিচালনার দায়িত্বে।

কেন প্রয়োজন হয় ছাত্র সংসদের? ছাত্রসংসদ বা স্টুডেন্টস ইউনিয়ন হলো ছাত্রছাত্রীদের দাবি আদায়ের একটা প্ল্যাটফর্ম। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ছাত্রছাত্রীর সমস্যা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার রাস্তা এই সংসদ। ছাত্রসংসদ ছাত্রছাত্রীদের দাবিদাওয়াকে ছিনিয়ে আনার মাধ্যম। ছাত্রদের নিয়ে তৈরি ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীদের জন্য যা কিছু দরকার, তাদের যা দাবি তা লড়াই করে ছিনিয়ে আনার জন্যই ছাত্র সংসদের প্রয়োজন। যেমন স্টুডেন্টস এইড ফান্ডের টাকা সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের সমভাবে দিতে হবে, এইড ফান্ডের টাকার পরিমাণ বাড়াতে হবে, অ্যান্টি র্যাছগিং সেল সক্রিয় করতে হবে, GSCASH তৈরি করতে হবে, খেলার মাঠ সংস্কার করতে হবে, সিট সংখ্যা কমানো যাবে না, ফি বাড়ানো যাবে না — এরকম হাজার একটা বিষয় আছে যা ছাত্রছাত্রীদেরকে কেন্দ্র করে তৈরি আর এইসব দাবি আদায়ের জন্যই প্রয়োজন ছাত্রসংসদ। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ কোনও তোলাবাজির মঞ্চ নয়, ছাত্রদের থেকে ঘুষ নেওয়ার জন্য নয়, গুন্ডাগিরির জন্য নয়। গত পাঁচ বছরে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ পরিচালিত ইউনিয়নের চিত্র এরকমই দাঁড়িয়েছে। আর এই নয়া নির্দেশিকা আসলে অবাধ দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতেই এবং একইসাথে প্রথমে ছাত্রসংসদকে তুলে দিয়ে তারপর ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র রাজনীতিকে আইন করে বন্ধ করে দেওয়ার চক্রান্ত এটা। রাজ্য সরকারের এই নির্দেশিকার রাজনৈতিক অভিমুখ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। এই নীতি প্রথমত সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কথা বলার, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। কলেজে পড়াশুনার খরচ বৃদ্ধি পেলে তা নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা মুখ খুললে আসলে সরকারের মুখোশটা খুলে পড়ে — কারণ এই সরকার চায় টাকা যার শিক্ষা তার হবে। আইনক্সে গিয়ে সিনেমা দেখতে যেমন টাকা লাগে তেমন পড়াশুনাকেও টাকা দিয়ে কিনে নেওয়ার নিদান দেয় এই সরকারের শিক্ষামন্ত্রী। সকলের জন্য শিক্ষা চাই, গরিব মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনার অধিকার সুনিশ্চিত করার আমাদের যে দাবি, যে লড়াই তার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এই সরকারের অভিমুখ। এই অগণতান্ত্রিক নির্দেশিকার মাধ্যমে একদিকে যেমন ছাত্রছাত্রীরা তাদের দাবি আদায়ের মঞ্চকে হারাতে চলেছে, অন্যদিকে আসলে এই নির্দেশিকা নয়া উদারবাদী শিক্ষানীতি বা Neo-liberal Education Policy-র প্রত্যক্ষ আক্রমণের ফলাফল। ছাত্রসংসদকে ভেঙে দিয়ে কাউন্সিল তৈরি করে Neo-liberal Education Model-কেই আসলে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ছাত্রসংসদ বলে কোনও কিছুর অস্তিত্ব রাখতে চায় না রাজ্য সরকার। তাই তৈরি করার চেষ্টা এরকম একটা কাউন্সিলের। যার প্রতি পদক্ষেপে মনোনীত হবে প্রতিনিধিরা কর্তৃপক্ষের হাত ধরে। সহজ কথায় নির্বাচন অর্থাৎ কথা বলার অধিকার থাকছে না আর। এই নয়া নীতি একবার চালু করতে পারলে বন্ধ করা যাবে ছাত্র রাজনীতি। আর রাজনীতি বন্ধ করতে পারলেই তো বন্ধ করা যাবে সকলের পড়াশুনা করার দাবি, বন্ধ করে দেওয়া যাবে নন নেট ফেলোশিপ, বন্ধ করে দেওয়া যাবে স্টুডেন্টস এইড ফান্ড।

বেসরকারিকরণকে আরও বেশি করে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে এই নীতি। একদিকে UGC সারা দেশে ৩২% ফান্ড কাট করছে, HEFA-এর নামে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের হাতে কেন্দ্রীয় সরকারের টাকা তুলে দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারিকরণের নীতিকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিলের মাধ্যমে ফি বাড়িয়ে উচ্চশিক্ষার রাস্তাকে ক্রমাগত সংকুচিত করে তোলা এবং একমুখী করে তোলার মরিয়া প্রয়াস এই নীতির। এই বিল পাশ করে আমাদের রাজ্যের সরকার চায় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ফি অনেক গুণ বাড়িয়ে দিতে যাতে গরিব বাড়ির ছাত্রছাত্রীরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। শিক্ষা নিয়ে যে ব্যবসা চলছে তা কর্পোরেট শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরিতে আরও সাহায্যই করছে। উচ্চশিক্ষায় সুযোগ সংকোচন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পাশ এরকম নয়া উদারবাদী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে গেলে আসলে ক্যাম্পাসের মধ্যে ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র রাজনীতি, ছাত্ররা সমাজ নিয়ে ভাববে সেই ভাবার পরিসর বন্ধ করে দিতে হবে এবং ছাত্ররা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে লড়াই করবে এটার উপর আক্রমণ করতে হবে। এটাই সরকারের একমাত্র নীতি। এই সরকারের গণতান্ত্রিক চরিত্র যে একেবারেই নেই তা আমরা জানি এবং আমরা দেখ‍‌ছি গণতান্ত্রিক কোনও পদ্ধতিতে এই সরকার কোনও পদক্ষেপ নেয় না। এর আগেও তাই সরকার চেষ্টা করেছে বিভিন্নভাবে ছাত্রসংসদ বন্ধ করার। ছাত্রসংসদকে অরাজনৈতিক করে এই সরকার আসলে বেসরকারিকরণ, ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, উচ্চশিক্ষায় সুযোগ সংকোচনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে আসলে বন্ধ করতে চাইছে। যে দেশে উচ্চশিক্ষায় মাত্র ৯% ছাত্রছাত্রী প্রবেশের সুযোগ পায় সেই দেশের সরকার উচ্চশিক্ষায় ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে, আসন সংকোচন করে কেড়ে নিতে চায় শিক্ষার অধিকারকে। আর দেশের সরকারের তালে তাল মিলিয়েই এ রাজ্যের সরকারও ‘অরাজনৈতিক ছাত্র কাউন্সিল’ তৈরির নিদান দিয়ে ছাত্র আন্দোলনকে ধ্বংস করতে চায়। এটাই ওদের ব্লুপ্রিন্ট। কিন্তু আমাদের রাজ্যের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস সুদীপ্ত-সৈফুদ্দিনের রক্তে ভেজা লড়াইয়ের ইতিহাস। হেরে যাবে না এ রাজ্যের ছাত্রসমাজ। আমরা হেরে যেতে দেব না গরিব বাড়ির মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের। যে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের দাবি ছিনিয়ে আনতে আমার সাথির রক্তে রাজপথ ভিজেছে, সেই লড়ে নেওয়া দাবি আমরা ছাত্রসমাজ লড়াই করেই বাঁচিয়ে রাখবো।