Back Previous Pageমতামত

সি জি ও কমপ্লেক্সে বিক্ষোভ
ঘুষের মামলা সরকারি টাকায় লড়া
চলবে না, হুঁশিয়ারি বামপন্থীদের

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ২০শে মার্চ— দলের ঘুষখোরদের বাঁচানোর জন্য সরকারি খরচে মুখ্যমন্ত্রীর মামলা লড়া চলবে না বলে হুঁশিয়ারি দিলেন বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ। সোমবার বিধাননগরে সি বি আই দপ্তরের সামনে বামফ্রন্টের বিক্ষোভ জমায়েতে সি পি আই (এম)-র রাজ্য কমিটির সম্পাদক সূর্য মিশ্র বলেছেন, ‘দলের ঘুষখোরদের বাঁচানোর জন্য তৃণমূল দল সুপ্রিম কোর্টে যেতে চায় যাক অথবা যেখানে খুশি যাক তা নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু রাজ্যের মানুষের করের টাকায় আদালতে মামলা করা চলবে না।’

সারদা মামলায় সি বি আই তদন্ত ঠেকানোর জন্য রাজ্য সরকার প্রায় ১০কোটি টাকা খরচ করেছিল সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়তে গিয়ে। এখন নারদ ঘুষ মামলাতেও কলকাতা হাইকোর্টের সি বি আই তদন্তের নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।

কলকাতা হাইকোর্ট নারদ ঘুষকাণ্ডে সি বি আই তদন্তের নির্দেশ দিলেও এমনিতে তা কার্যকর হবে এমন বিশ্বাস না রেখে রাস্তায় নেমে গণআন্দোলনের মাধ্যমে চাপ তৈরি করার ডাক দিয়েছেন বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ। সূর্য মিশ্র বলেছেন, ‘ঘুষখোরদের বাঁচাতে মুখ্যমন্ত্রী দিল্লি যেতে চান যান, যেখানে লড়তে চান লড়ুন। কিন্তু আমরাও উলটো লড়াইতে থাকবো। ঘুষখোরদের গ্রেপ্তারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আমরা লড়াই করবো, সংসদেও লড়াই করবো। কলকাতা হাইকোর্ট সি বি আই তদন্তের নির্দেশ দিলেও তা যে এমনি কার্যকর হবে এমন কোনো মোহ আমাদের নেই। রাস্তার লড়াইয়ের জোর কতটা হবে তার ওপরেই ওদের ভবিষ্যতের ফয়সালা হবে।’ মুখ্যমন্ত্রীকে নবান্ন অভিযানের হুঁশিয়ারি দিয়ে মিশ্র বলেছেন, ‘সমস্ত জনবিরোধী কাজের চার্জশিট জড়ো করে মানুষ আপনার কাছে জবাব চাইতে যাবেন। তার জন্য তৈরি থাকবেন।’

বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুও বলেছেন, হাইকোর্টের নির্দেশে সি বি আই নারদ ঘুষকাণ্ডে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু অতীতেও আমরা আদালতের নির্দেশে সি বি আই-কে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে তদন্ত শুরু করতে দেখেছি, তারপরে সবকিছু ধামাচাপা দিয়ে রাখতেও দেখেছি। তাই আমাদের দাবি, কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকারের বোঝাপড়ায় সি বি আই-র তদন্তে ঢিলেমি দেওয়া চলবে না। অবিলম্বে অভিযুক্ত মন্ত্রী সাংসদদের গ্রেপ্তার করতে হবে।

সূর্য মিশ্র বলেন, ‘শাসকদলের এই মন্ত্রী সাংসদরা আমাদের রাজ্যের লজ্জা। এঁদের মন্ত্রী-সাংসদের চেয়ারে বসে থাকার কোনো অধিকার নেই। ঘুষ খেয়েও ওঁরা লালবাতি লাগানো গাড়ি চেপে ঘুরছেন, পুলিশ ওঁদের স্যালুট ঠুকছে। আর আমাদের ছেলেমেয়েরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে জেলে পুরে নির্যাতন করবে! এসব চলতে পারে না।’

সারদা নারদ-এ অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা-মন্ত্রী-সাংসদদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিতে এদিন দুপুরে বিধাননগরে সি বি আই-র আঞ্চলিক দপ্তর সি জি ও কমপ্লেক্সের সামনে জমায়েত করে বিক্ষোভ দেখান বামফ্রন্ট কর্মী-সমর্থকরা। উলটোডাঙা থেকে মিছিল করে সি জি ও কমপ্লেক্সের সামনে আসেন চিট ফান্ডে প্রতারিত আমানতকারী ও এজেন্টরা। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গা থেকে বহু মানুষ এসে জড়ো হয়েছিলেন বিক্ষোভ দেখাতে। পরীক্ষা চলার কারণে জমায়েতে কোনো মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যায়নি। একটি ম্যাটাডোরকে অস্থায়ী মঞ্চের মতো ব্যবহার করে ব্যাটারিচালিত মাইকে ভাষণ দেন বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ। গান গেয়ে, পোস্টার তুলে ধরে, স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ দেখান জমায়েতকারীরা।

অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাদের সম্পর্কে সূর্য মিশ্র বলেন, ‘শুধু ঘুষ নেওয়াই নয়, এঁদের বিরুদ্ধে দুটো চার্জশিট হওয়া উচিত। এরা টিভি ক্যামেরার সামনে তো কয়েক বান্ডিল নোট নিয়েছেন। চিট ফান্ডের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটেছেন। সেই টাকা উদ্ধার করে ফেরত দেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আবার এরাজ্যের সরকার। এমন একটা গলদপূর্ণ আইন তৈরি করেছে যে ৬বছর হতে চললো সেই আইনে চিট ফান্ডের টাকা উদ্ধার করে প্রতারিতদের একজনকেও টাকা ফেরত দিতে পারেনি। কলকাতা হাইকোর্ট চিট ফান্ডের প্রতারিতদের টাকা ফেরানোর জন্য যে ব্যবস্থা করে দিয়েছিল তাতেও বাধা দিয়ে চলেছে। এমনই সদিচ্ছা এই সরকারের।’

বিমান বসু বলেছেন, এরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কথায় কোনো সাযুজ্য নেই। নারদ ঘুষকাণ্ডের ছবি প্রকাশিত হওয়ার পরে তিনি বলেছিলেন, ‘এসব চক্রান্ত। হাইকোর্ট সি বি আই তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পরে তিনিই বলেছেন, নির্বাচনের আগে দলের জন্য ডোনেশন নেওয়া হয়েছে। একজন আই পি এস অফিসারকেও টাকা নিতে দেখা গিয়েছে। ওই পুলিশ অফিসারও কি মুখ্যমন্ত্রীর দলের হয়ে টাকা নিচ্ছিলেন?’

গ্রিক কাহিনী অনুসারে বিশাল কাঠের ঘোড়ার ভিতরে লুকিয়ে থেকে গ্রিক সৈন্যবাহিনী কৌশলে ট্রয়ের ভিতরে ঢুকেছিল এবং তারপরে আচমকা বেরিয়ে এসে ট্রয় শহরকে ধ্বংস করেছিল। সূর্য মিশ্র বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল হলো বি জে পি-র ট্রয়ের ঘোড়া। তৃণমূলের সাহায্যেই বি জে পি ঢুকতে চেষ্টা করছে। নইলে ইয়েদুরাপ্পা, জয়ললিতা, শশীকলাদের জেলে যেতে হয়, অথচ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে জেরা করতেও সি বি আই সাহস পায় না কেন? ৫৬ইঞ্চি ছাতির প্রধানমন্ত্রীর সাহসে কুলোচ্ছে না?’ মিশ্র একথাও বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক ভোট বিভাজন করে উত্তর প্রদেশে মোদী জিতেছেন। কিন্তু সব বিরোধীরা, বাম, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষরা একজোট হলে উত্তর প্রদেশে তিনি এভাবে জিততে পারতেন না, ৯০টার বেশি আসন পেতেন না।’

দু’ঘণ্টা ধরে বিক্ষোভ সভায় সি পি আই নেতা স্বপন ব্যানার্জি, আর এস পি নেতা মনোজ ভট্টাচার্য, ডি এস পি নেতা প্রবোধ সিনহা, ওয়ার্কার্স পার্টির নেত্রী শিপ্রা চক্রবর্তী, আমানতকারী ও এজেন্ট সুরক্ষা মঞ্চের নেতা অরিন্দম মজুমদার, সি পি আই (এম) নেতা পলাশ দাশ প্রমুখ ভাষণ দিয়েছেন। অন্য কিছুর ভরসায় বসে না থেকে স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলনের জন্য তাঁরা আবেদন জানিয়েছেন। বিক্ষোভ জমায়েতে সি পি আই (এম) নেতা রবীন দেব, গৌতম দেব, শ্রীদীপ ভট্টাচার্য, নিরঞ্জন চ্যাটার্জি, চিট ফান্ড সাফারার্স ফোরামের নেতা সুবীর দে এবং বামফ্রন্টের বিভিন্ন শরিকদলের নেতৃবৃন্দও অংশ নেন।

মতামত
এই খবরটি সম্পর্কে আপনার মতামত
 

আমাদের এই খবরটি সম্পর্কে আপনার মতামত পেলে বাধিত থাকব। তবে যথাযথ যাচাই না করে ২৪ঘন্টার আগে আপনার মতামত ওয়েবসাইটে দেখা যাবে না।

Top
 
Name
Email
Comment
For verification please enter the security code below