Ganashakti Post Editorial

ব্যর্থতা আড়াল করতেই আক্রমণ

সম্পাদকীয় বিভাগ

মণীন্দ্র চক্রবর্তী
 

রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পরিবর্তে নতুন সরকার দৈত্যাকৃতির বুলডোজার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হকার এবং বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করতে। কিন্তু বামেদের নেতৃত্বে মানুষের প্রতিরোধ সেই ধ্বংসলীলা রুখে দেবার পর, সরকারের যাবতীয় রোষ এসে পড়েছে বামেদের ওপর। যে কারণে, বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের উপস্থিতিতেই বামপন্থীদের ওপর নির্মম তাণ্ডব চালিয়েছে গেরুয়া ঝান্ডাধারীরা। 
বামপন্থীদের পার্টি অফিস ভাঙা থেকে শুরু করে পার্টি তথা শ্রমিক নেতৃত্বকে প্রহার— সব কিছুই রয়েছে এর মধ্যে। কিন্তু সবচাইতে ন্যক্কারজনক ঘটনাটি তারা ঘটিয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশ দ্বারের এম ব্লেম ধ্বংস করার পাশাপাশি যেভাবে তারা বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের পতাকা পুড়িয়েছে, কোনও নিন্দাই তার জন্য যথেষ্ট নয়। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি অমানবিক এবং নিন্দনীয় ঘটনার সাক্ষী হলেন রাজ্যবাসী। অভিযোগ, রাজ্যের এক মন্ত্রী শিশুর জন্য গরম করতে দেওয়া দুধ ফেলে দিয়েছেন। 
       এই ধরনের যাবতীয় ঘটনাগুলিকে যদি একটা বৃত্তের মধ্যে আনা যায়, তাহলে দেখা যাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গরিব কিংবা গরিব মানুষের জন্য কথা বলা মানুষজন বা সংগঠন।
       এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গরিব মানুষের ওপর এই আক্রমণ তারা নামিয়ে আনছে কেন? উত্তর হচ্ছে, মানুষের প্রত্যাশা এবং জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যর্থতাগুলিকে আড়াল করার জন্য। যেহেতু মানুষ এই ব্যর্থতার সদুত্তর চাইছেন। পাশাপাশি, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে তারা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার দাবি তুলছেন। তাই বলপ্রয়োগ করে মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরগুলিকে নীরব করতে চাইছে। যাতে কোনোভাবেই কর্পোরেট পুঁজির শোষণকে সমস্যার সম্মুখীন না হতে হয়।
      পুঁজিবাদী অর্থনীতি কখনোই মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না। উলটে, এই ব্যবস্থা প্রতিদিন কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। শুধু তাই নয়, এই ব্যবস্থায় যেহেতু মানুষের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি হয় না, তাই এই শূন্যগর্ভ ব্যবস্থা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে বাজার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে চাহিদা এবং উৎপাদন দুইই কমতে থাকে। যার ফলে ব্যবস্থার সঙ্কট তীব্র হয়। আর এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যখনই সঙ্কটের মুখে পড়ে, তখন সেই সঙ্কটের যাবতীয় বোঝা শ্রমজীবী এবং গরিব মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সে পরিত্রাণ পেতে চায়। সমস্যা মোকাবিলায় চিরাচরিত অর্থনীতিবিদদের মগজপ্রসূত নতুন নতুন তত্ত্ব তথা ব্যবস্থাপত্র বাজারে হাজির করে।
       দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দায় হাজির করা হয়েছিল ট্রিকল ডাউন বা ‘চুঁইয়ে পড়া অর্থনীতি’। সঙ্কটাপন্ন আমেরিকার পুঁজি, মুক্তির পথ খুঁজে ছিল এই অর্থনৈতিক তত্ত্বের মধ্যে। কিন্তু সেই নীতির অসারতা এতটাই প্রকট ছিল যে, উদ্ভাবনের এক শতক আগেই আজ যাকে নিয়ে দেশ তথা রাজ্য তোলপাড় হচ্ছে সেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বিড়াল’ প্রবন্ধে এর সার সত্য মানুষের সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছিলেন। যে কারণে আমরা দেখি, বিড়ালের মুখ দিয়ে সরাসরি তিনি কমলাকান্তের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন—পাঁচশত দরিদ্রকে বঞ্চিত করে একজনে পাঁচশত লোকের আহার্য সংগ্রহ করবে কেন? যদি করেই থাকে, তবে সে তার খাবারের থালা থেকে যতটুকু বেয়ে পড়ে, সেটা দরিদ্রকে দেবে না কেন? যদি না দেয়, তবে দরিদ্র অবশ্য তার থেকে চুরি করবে; কেন না, অনাহারে মরে যাবার জন্য এ পৃথিবীতে কেউ আসেনি।
      এ ধরনের বেমক্কা প্রশ্নের সম্মুখীন হলে গড়পড়তা বাজার অর্থনীতিবিদেরা পরিস্থিতি সামাল দিতে যে সব কূযুক্তির পশরা সাজিয়ে হাজির হন, কমলাকান্ত সেই ভাষাতেই বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, যার যত ক্ষমতা, সে যদি তত ধন সঞ্চয় করতে না পায়, অথবা সঞ্চয় করে চোরের জ্বালায় নির্ব্বিঘ্নে ভোগ করতে না পায়, তাহলে কেউই আর ধন সঞ্চয়ে যত্ন করবে না। তাতে সমাজেরও ধন বৃদ্ধি হবে না।
        প্রত্যুত্তরে বিড়ালটি সমাজতন্ত্রীদের মতো দৃপ্ত কণ্ঠে খাদ্যের অধিকার কেড়ে নেবার কথা উচ্চারণ করতেই পারত। কিন্তু যুক্তি, পালটা যুক্তি কিংবা অর্থনীতির জটিল কচকচানির মধ্যে না ঢুকে বিড়াল পালটা প্রশ্ন করে, সমাজের ধনবৃদ্ধি না হলে আমার কি? সমাজের ধন বৃদ্ধির অর্থ ধনীর ধন বৃদ্ধি। ধনীর ধন বৃদ্ধি না হলে দরিদ্রের কি এমন ক্ষতি?
        ঝানু সমাজতাত্ত্বিকদের মতো কমলাকান্ত এর উত্তরে বলেন, সামাজিক ধনবৃদ্ধি ব্যতীত সমাজের উন্নতি হয় না। শুনেই বিড়ালের মাথায় রক্ত উঠে গেল। কর্কশ কণ্ঠে সে বলল, আমি যদি খেতেই না পেলাম, তবে সমাজের উন্নতি নিয়ে কি করব? কমলাকান্তও হাল ছাড়বার পাত্র নয়, কৌশল বদলে এবার তিনি সুশীল সমাজের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। মিহি সুরে তিনি বিড়ালকে বোঝাতে লাগলেন, সমাজের উন্নতিতে দরিদ্রের প্রয়োজন না থাকলে না থাকতে পারে, কিন্তু ধনীদের বিশেষ প্রয়োজন।
        তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ধনীদের হয়ে এতক্ষণ যিনি সওয়াল করছেন সেই কমলাকান্ত কিন্তু ধনী নন। তথাপি বিড়াল যখন তাকে প্রশ্ন করল— ‘এ সংসারে ক্ষীর, সর, দুধ, দই, মাছ, মাংস, সকলই তোমরা খাবে, আমরা কিছু পাব না কেন? তোমাদের ক্ষুধা-পিপাসা আছে— আমাদের কি নেই? তোমরা সবেতেই তো আজ শাস্ত্র কথার দোহাই দিচ্ছ। তোমরা খাও, আমাদের আপত্তি নেই; কিন্তু আমরা খেতে চাইলে তোমরা কোন শাস্ত্রানুসারে ঠেঙ্গা লাঠি নিয়ে মারতে আস?’—এ প্রশ্ন কি নিছক বিড়ালের? এ ধরনের চোখা প্রশ্নের মুখে পড়লে শাসক যেমন পিঠটান দেয়। কমলাকান্তকেও তেমনি পিছু হটতে হয়েছিল। ফলে যখন তিনি উপলব্ধি করলেন, যুক্তি তর্কে এ বিড়ালকে পরাস্ত করা যাবে না। তখন তিনি উপদেশ প্রদান করাই শ্রেয় মনে করলেন। যেমন দিল্লির ছাত্র আন্দোলনে পর্যুদস্ত প্রধানমন্ত্রীকে সোশাল মিডিয়ায় উপদেশ বিলাতে দেখা গিয়েছিল।
      আসলে, যুক্তিবাদ এতটাই শক্তিশালী এবং দৃঢ় প্রত্যয়ী যে তাবড় রথী মহারথীরাও এর সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হন। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে যে নিজেকে নেপোলিয়নের জায়গায় বসিয়ে ওয়াটারলুর যুদ্ধের সৈন্য ব্যূহ রচনা করেছিলেন, সামান্যতম বাহ্যিক জ্ঞান যার সেই মুহূর্তে ছিল না, যে সুযোগে বিড়ালটি তাঁর জন্য রাখা একবাটি দুধ সাবাড় করে দিয়েছে, সেই কমলাকান্তের কাছেও কিন্তু আপাত নিরীহ ওই বিড়ালের শরীরী ভাষায় ফুটে ওঠা এ ধরনের সংলাপগুলো তাঁর কাছে যথেষ্ট বিপজ্জনক বলে মনে হয়েছিল। এই মনে হওয়াটা অবশ্য শুধু তাঁর একার নয়, পৃথিবীর দেশে দেশে কর্তৃত্ব হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত শাসকদের চিরকাল এই ধরনের বিপজ্জনক কথাবার্তা সর্বদা তাড়া করে ফেরে। তবে যুক্তি এবং প্রশ্নবোধক সংলাপগুলির উত্তর দিতে অপারগ শাসক চিরকাল চেষ্টা করে বিভিন্ন কায়দায় সেগুলো খারিজ করে দেবার কিংবা দাবিয়ে রাখার। কমলাকান্তও ঠিক সেইভাবেই বিড়ালের কথাগুলিকে সরাসরি ভারি ‘সোশিয়ালিস্টিক’ বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না, এই সোশিয়ালিস্টিক ভাবনাকে কমলাকান্ত যেভাবে অবলীলায় ‘সমাজ বিশৃঙ্খলার মূল’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন, মতাদর্শগতভাবে রাজ্যের সর্বত্র হিন্দুত্ববাদী আধিপত্য কায়েম করার নেশায় বুঁদ এ রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীও যাদবপুরের পড়ুয়াদের ‘সমাজ বিশৃঙ্খলার মূল’-র চাইতেও ঢের হানিকর ‘দেশদ্রোহী’ হিসাবে দাগিয়ে দিয়েছেন। নিজের দাবির সপক্ষে যুক্তি দিতে বিড়াল তবু অনুনয়ের সুরে কমলাকান্তকে বলেছিল— দেখ, আমি এ ওর পাঁচিলে ঘুরে ঘুরে মেও মেও করে বেড়াই, তবু কেউ আমাকে মাছের কাঁটাখানাও ফেলে দেয় না। মাছের কাঁটা, পাতের ভাত, নর্দমায় ফেলে দেয়, জলে ফেলে দেয়, তথাপি আমাকে দেয় না। তোমাদের পেট ভরা, আমার পেটের ক্ষুধা কি ভাবে জানবে! হায়! দরিদ্রের জন্য ব্যথিত হলে তোমাদের কি কিছু অগৌরব আছে? আমার মতো দরিদ্রের ব্যথায় ব্যথিত হওয়া, লজ্জার কথা সন্দেহ নাই। যে কখনও অন্ধকে মুষ্টি-ভিক্ষা দেয় না, সেও একটা বড় রাজা, ফাঁপরে পড়লে রাত্রে ঘুমায় না— সকলেই পরের ব্যথায় ব্যথিত হতে রাজি। তবে ছোটলোকের দুঃখে কাতর!
      রক্ষে! জি টিভি-র মালিক সুভাষচন্দ্র সেই সময় জন্মায়নি, নইলে তার ঋণ মকুবের প্রসঙ্গটিও বিড়াল প্রশ্নাকারে উত্থাপন করত। যে প্রশ্নটি গোটা দেশের মানুষ আজ করছেন। এর সাথে রাজ্যের জনগণ আরও কিছু প্রশ্ন এবং দাবি যুক্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী এবং তার দলের প্রতি। না, ওনার বা ওনাদের মতো রাজকীয় সুখ কেউ দাবি করেছেন না। তাদের চাওয়া অত্যন্ত সীমিত। কৃষক চাইছেন ফসলের ন্যায্য দাম, শ্রমিকের চাহিদা শ্রমের ন্যায্য মজুরি, ছাত্রের চাওয়া আধুনিক শিক্ষা এবং শিক্ষান্তে সম্মানজনক একটি কাজ, মহিলাদের চাহিদা আরও কম। তাঁরা চাইছেন নারীদের ন্যূনতম সম্মান ও মর্যাদা। কিন্তু বাজার অর্থনীতি এর প্রতিটিকেই খারিজ করে। এর জেরে জনগণের অসন্তোষ যাতে তীব্র না হতে পারে, তার জন্য পুঁজিবাদ মাঝে মধ্যেই জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, এক দেশ-এক জাতি’র ধুয়া তুলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। আবেগই প্রশ্ন তুলে চেষ্টা করে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামকে খণ্ডবিখণ্ড করার। পাশাপাশি অকাতরে তারা বিলাতে থাকে রঙবেরঙের নানান প্রতিশ্রুতি। কিন্তু অভিজ্ঞতা হচ্ছে মানুষের সবচাইতে বড় সহায়, বড় শিক্ষক। ঠুনকো কথায় বেশি দিন সে ভোলে না। কমলাকান্তও চেষ্টা করেছিলেন ভুজুংভাজুং দিয়ে, নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিড়ালকে বগলদাবা করতে। যেমন করে আরএসএস কর্মীদের বগলদাবা করেছিল ব্রিটিশরা। বিড়ালের অন্তরে নতুন করে স্বদেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে বঙ্কিমচন্দ্র তো পারতেন বিড়ালকে দিয়ে ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়াতে। তা কিন্তু তিনি করেননি। বরং বিড়ালের মুখ দিয়ে সমাজ রক্ষকদের গাত্রদাহ হবার মতো অপ্রিয় বহু সত্য কথা তিনি বলিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি শেষ চেষ্টায় বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে কমলাকান্ত যখন বিড়ালের থেকে ভবিষ্যতে অন্য কারও হাঁড়ি না ভাঙার মুচলেকা আদায় করতে মরিয়া। বিড়ালের ছোট্ট জবাব ছিল— ক্ষুধানুসারে বিবেচনা করা যাইবে। 
বি:দ্র:  এই ‘মুচলেকা’ শব্দ ব্যবহারের জন্য আরএসএস-বিজেপি কর্মীরা কিন্তু গোঁসা করবেন না।
..........................................................
Highlights
এখন প্রশ্ন হচ্ছে গরিব মানুষের ওপর এই আক্রমণ তারা নামিয়ে আনছে কেন? উত্তর হচ্ছে, মানুষের প্রত্যাশা এবং জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যর্থতাগুলিকে আড়াল করার জন্য। যেহেতু মানুষ এই ব্যর্থতার সদুত্তর চাইছেন। পাশাপাশি, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে তারা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার দাবি তুলছেন।

Comments :0

Login to leave a comment