ক্রমশ ফিকে হতে থাকা ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই ময়দানে নেমে পড়েছেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হবার পর থেকে মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পদে টানা ২৫ বছর অতিক্রম উপলক্ষে বিজেপি’র তরফে নানা আয়োজনের পাশাপাশি মোদীর প্রচারে বিপুল উদ্দীপনায় ঝাঁপিয়েছে মোদীর নিজের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্যে রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিনের সরকারগুলি। তার জন্য কেন্দ্রীয় রাজ্য সরকারের তহবিল থেকে পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে বরাদ্দ হচ্ছে বিপুল টাকা। কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির সরকারের অধীন ও আধা সরকারি বা সরকার পোষিত ও অনুপ্রাপ্ত সংস্থাগুলিকে কার্যত বাধ্যতামূলকভাবে নামানো হয়েছে মোদী স্তূতি ও মোদী বন্দনার হাজারো কর্মসূচিতে। ছাড় পায়নি স্কুল কলেজের পড়ুয়ারাও। মোদীকে মহান সাজানোর জন্য সর্বত্র পালিত হচ্ছে নানান অনুষ্ঠান।
আসলে স্ব-ঘোষিত অজৈবিক প্রধানমন্ত্রী ৫৬ ইঞ্চি ছাতিওয়ালা বিশ্বগুরু সাজার দিবাস্বপ্ন মাঠে মারা যাবার পর তিনি প্রবল ভাবমূর্তির সঙ্কটে পড়েছে। মুখে যত ভাষণই দিন না কেন আর তথ্য পরিসংখ্যানে গোঁজামিল দিয়ে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার উচ্চ যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকলেও কাজ করতে হচ্ছে সামান্য মজুরির সাধারণ কাজে। দ্বিতীয় সত্য হলো ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি। নিত্য ব্যবহারের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পণ্যের দাম নিরন্তর বেড়েই চলেছে। রির্জাভ ব্যাঙ্কের তথ্যই বলছে গত এক বছর ধরে পণ্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী। ফলে সাধারণ ভারতবাসীর জীবন-জীবিকার মান উন্নয়ন দূরের কথা উলটে অবনতি ঘটছে। সরকারি কাগুজে পরিসংখ্যানে উচ্চ বৃদ্ধির হার হলেও তার অংশ বা সুফল সাধারণ মানুষের কাছে আসে না। সেটা জমা হয় আদানি-আম্বানিদের মতো শিল্পপতি ও বিত্তবানদের ঘরে। তাই প্রধান প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত চনমনে ও শক্তিশালী ভিত্তির অর্থনীতি আদতে সাধারণ মানুষের হোমেও লাগে না, যজ্ঞেও লাগে না। তৃতীয় সত্য হলো পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা, ইউক্রেনে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, আমেরিকার একতরফা শুল্ক সন্ত্রাস ইত্যাদি প্রবল ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে ভারতের অর্থনীতির প্রবল নেতিবাচক চাপ তৈরি করেছে। ফলে উচ্চ মূল্যে অশোধিত তেল আমদানি এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তীব্র বাণিজ্য সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই সঙ্কটই ডলারের তুলনায় টাকার মূল্য কমাতে কমাতে ৯৭ টাকায় পৌঁছে দিয়েছে। ভারতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে দীর্ঘস্থায়ী খরা। গত দু’বছর ধরে শেয়ার বাজারে চলছে অবনমন। বিদেশি লগ্নিকারীরা লাগাতার তাদের লগ্নি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ভারতীয় বেসরকারি পুঁজিও লগ্নি হচ্ছে না। ভারতে কর্পোরেট ভারতের বদলে অন্য দেশে লগ্নিতে ইদানীং বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছে। অর্থাৎ মোদীর ‘শক্তিশালী ভারতে উদ্দীপনায় অর্থনীতিতে’ দেশি-বিদেশি কোনও বেসরকারি লগ্নিই আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারছেন না।
এরই মধ্যে পরীক্ষায় ও নিয়োগে দুর্নীতি, নির্বাচন কমিশনের স্বেচ্ছাচারিতা, গণতন্ত্রের বিপন্নতা, বেকারি ইত্যাদি জ্বলন্ত বিষয় নিয়ে বিরোধী দল, ছাত্র-যুব সংগঠন, সিজেপি সহ নানা সংগঠন লাগাতার বিক্ষোভ প্রতিবাদ সংগঠিত করে সরকারের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। মোদী কেন্দ্রিক সরকারের বিরুদ্ধে যাবতীয় আন্দোলন শেষ পর্যন্ত মোদীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এখন আর কেউ বলে না মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। তথাকথিত মোদীর জনপ্রিয়তা, মোদী ম্যাজিক, মোদী ঝড় এখন অতীত। মোদীর ভাবমূর্তি এখন দ্রুত ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তাই কোনও একটা উপলক্ষ হাজির করে মোদীর ভাবমূর্তি ফেরানোই সরকার ও বিজেপি’র লক্ষ্য।
Editorial
মোদী বিড়ম্বনা
×
Comments :0