স্কোরবোর্ডে ২৫৫ ওঠার পরেও স্বস্তি ছিল না। কারণ অবশ্যই সেমিফাইনালে দুমদাড়াক্কা ব্যাটিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে দুরমুশ করে ফাইনালে উঠে আসা নিউজিল্যান্ড। ফলে আবার টি-২০ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া নিয়ে একটা টানাপড়েন ছিল। তাও বিশ্বজয়ের অপেক্ষার প্রহর গুনছিল আসমু্দ্রহিমাচল। নিউজিল্যান্ড ইনিংসের ১৯তম ওভারে লং অন বাউন্ডারিতে জেকব ডাফিকে তিলক বর্মা তালুবন্দি করতেই উত্তাল গ্যালারি। আগের টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি ও রোহিত শর্মার মুখে হাসির ঝিলিক।
বিশ্ব জয়ের আনন্দে মোতেরা স্টেডিয়ামের আকাশে আতসবাজির রোশনাই। উৎসবের রেশ ছড়িয়ে পড়ল আনন্দনগরীতেও। কলকাতাতেও ক্রমাগত বাজির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল গভীর রাত অবধি। ২৫ জুন, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২ এপ্রিল এবং ২৯ জুনের রাত ফিরে এল ৮ মার্চ। কপিল দেব, মহেন্দ্র সিং ধোনি, রোহিত শর্মার পর বিশ্বজয়ের ট্রফি সূর্য কুমার যাদবের হাতে।
মাঠে তখন জয়ের আনন্দে বাঁধনহারা ঈশান কিষান, জসপ্রীত বুমরা, মহম্মদ সিরাজরা। গত ১৯ নভেম্বর সিরাজের চোখে ঝরেছিল অঝোর ধারা। তাঁর চোখের জল থামানো যাচ্ছিল না। এদিন ভারতের জয় নিশ্চিত হতেই, শূণ্যে হাত ছুঁড়লেন। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে হুঙ্কার দিলেন। গায়ে দেশের পতাকা জড়িয়ে মাঠে নেমে সতীর্থদের অভিবাদন জানালেন। ইতিহাস তৈরি করে রিঙ্কু সিং, অভিষেক শর্মা, তিলক বর্মা থেকে শিবম দুবে— তেরঙা জড়িয়ে দৌড়ে বেড়ালেন আমেদাবাদের মাঠ।
এরকম একপেশে ফাইনাল হবে কেউ ভেবেছিল! ভাবার কথাও নয়। এতটা একপেশে টি-২০ বিশ্বকাপের ফাইনাল কবে দেখেছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা? তুলনায় আসতে পারে, ২০২১ সালের ফাইনাল। সেবারও নিউজিল্যান্ড উড়ে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। এবার তাঁরা হারল ভারতের নির্মম ক্রিকেটের কাছে। সামান্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছুঁড়ে দিতে ব্যর্থ কিউয়ি শিবির। ৯৬ রানের বিরাট ব্যবধানে জিতে টানা দ্বিতীয়বার টি-২০ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হলো সূর্যকুমার যাদবের ভারত। ঘরের মাঠে প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ জয় ভারতের।
কুড়ি-বিশের ফরম্যাটে তৃতীয়বার বিশ্বজয়ের কারিগর সবাই। দলগত পারফরম্যান্সে সম্ভব হলো বিশ্বজয়। দলের এগারোজন ক্রিকেটার কখনও না কখনও অবদান রেখেছেন। কেউ বল হাতে, কেউ ফিল্ডিং করে, আবার কেউ ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলে। অফস্পিনারের দুর্বলতা প্রকট হয়েছিল। এই বিশ্বকাপে ভারতীয় দল ১৫-১৬ ক্যাচ ফেলেছে। এসব আর কেউ মনে রাখবে না। বড় ম্যাচে ব্যাট হাতে ব্যর্থ সূর্যকুমার যাদব। ভুলে যাবেন সবাই। শুধুমাত্র তাঁর অধিনায়কত্বের জন্য। দক্ষভাবে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রশংসা পাবেন। এদিন ফাইনালে মিড অফে দাঁড়িয়ে ফিন অ্যালেনের সহজ ক্যাচ ফেললেন দুবে। অন্য কোনও অধিনায়ক হলে, তাঁকে শাসাতেন। কিন্তু সূর্য কী করলেন? শিবমের পিঠ চাপড়ে দিয়ে এলেন দক্ষ নেতার মতো। ফাইনালে শূণ্য রানে ফিরলেও, ন’ম্যাচে করেন ২৪২। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চাপের মুখে করেছিলেন ৪৯ বলে ৮৪। ওই চুরাশি না থাকলে, ভারত হারতেই পারতো!
বিশ্বকাপে নকআউটে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স কেরালার ‘চেত্তা’ সঞ্জু স্যামসনের। তাঁর জন্যই চন্দ্রবিন্দুর গানের লাইন ধার করে আনতেই হয়, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়।’ তাঁর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বিশ্বকাপের আগে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই তাঁকে দল থেকে ছূঁড়ে ফেলা দেওয়া হয়। অভিষেক শর্মার অসুস্থতা, রিঙ্কুর সিংয়ের পারিবারিক সমস্যার জন্য দলে ফের জায়গা পান। জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে বলার মতো রান পাননি। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ থেকে অন্য সঞ্জু স্যামসনকে দেখা গেল। ধীর-স্থির অথচ আগ্রাসী, লক্ষ্যে অবিচল। পাওয়ার-টাইমিংয়ে মিশ্রিত ব্যাটিংয়ে তিনটি নকআউট ম্যাচে ৮০-র ওপর রান। ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধে জিততেই হবে ম্যাচে অপরাজিত ৯৭ করে দলকে সেমিফাইনালে তোলাই হোক বা শেষ চারের ম্যাচে আর্চারদের ঠেঙিয়ে ৮৯। ফাইনালেও ফের প্রায় দুশোর স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করে ৮৯ করে নিউজিল্যান্ডকে ম্যাচ থেকে বের করে দিলেন। ভেঙে দিলেন কেন উইলিয়ামসনের রেকর্ড। এখন থেকে টি-২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে সর্বাধিক রানের মালিক তিরুবনন্তপুরমের ছেলেটি। তাঁকে ক্রিকেটার বানানোর জন্য চাকরি ছেড়েছিলেন বাবা বিশ্বনাথ স্যামসন। ছেলের অবদানে দেশ বিশ্বকাপ জিতল। এই দৃশ্য চাক্ষুষ করে আজ বিশ্বনাথের গর্বের বুক ভরে যাচ্ছে। হয়তো অজান্তেই তাঁর চোখ ভিজে গিয়েছে।
আর অভিষেক শর্মা তো ধরা দিলেন বিরাট কোহলি রূপে। গোটা বিশ্বকাপে রান নেই। ২০২৪ টি-২০ বিশ্বকাপের বিরাটের মতোই। জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ৫৫ ছাড়া বলার মতো কিছু নেই। তিনবার শূণ্যে রানে ফিরেছেন। ফাইনালে হাঁকালেন দ্রুততম অর্ধশতরান। মাত্র ১৮ বলে। ক্রিকেট যেমন কেড়ে নেয়, তেমনও ফিরিয়ে দেয়। অভিষেকের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে ফাইনালে পাওয়ার প্লে’তে ভারত পৌঁছায় ৯২।
ঈশান কিষান। হঠাৎ করেই বিশ্বকাপের দলে ঢুকে পড়েন। মুস্তাক আলি ট্রফিতে সর্বাধিক রান স্কোরার। তাঁকে বাদ দিয়ে বিশ্বকাপ দল গড়ার সাহস দেখাতে পারেননি নির্বাচকরা। শুভমন গিলকে বসিয়ে সুযোগ দেওয়া হয় ঈশানকে। ভরসার প্রতিদান দিলেন ঈশান। নয় ম্যাচে ১৯৩ স্ট্রাইক রেট ৩১৭। ছয় মেরেছেন আঠেরোটা। ভারতীয়দের মধ্যে সঞ্জুর পরে ঈশান সর্বাধিক রান স্কোরার। এদিন অভিষেক ফেরার পর, ঈশান শুরু করলেন বেধড়ক মার। করলেন ২৫ বলে ৫৪। তাতেই ভারত পেরিয়ে যায় দুশো। ফিল্ডিংয়ে তাঁর হাতে ধরা পড়লেন রাচিন রবীন্দ্র (১), টিম সেইফার্ট (৫২) ও ড্যারিল মিচেল (১৭) । রবীন্দ্র ও সেইফার্টকে ফেরালেন অবিশ্বাস্য ক্যাচে।
ব্যাটিং লাইন আপে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবের প্রসঙ্গ উঠলেই নাম আসবে শিবম দুবে, তিলক বর্মা, ও হার্দিক পান্ডিয়ার নাম। দুবে যখনই নেমেছেন, তখনই ছোট ছোট ক্যামিও খেলে ম্যাচের রঙ বদলে দিয়েছেন। ইডেনে কার্যত কোয়ার্টার ফাইনালে দু’টো চারই হোক বা সেমিফাইনালে ৪৩ রান। ফাইনালে তাঁর আট বলে ২৬ রানের ইনিংস ২৫৫ অবধি পৌঁছে দেয় ভারতকে। তেমনই কঠিন সময়ে ব্যাট হাতে ভরসা দিয়েছেন হার্দিক ও তিলক বর্মাও। সেমিফাইনালে তিলকের ওই রানের ইনিংস না থাকলে, ফাইনালে ওঠার পথ মসৃণ হত কী না সন্দেহ! ফাইনালে নিলেন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ। তিন বিভাগে অক্ষর প্যাটেল অনায়াসে পাবেন লেটার মার্কস। সেমিফাইনালে তিনটি ক্যাচের পর, ফাইনালে প্যাভিলিয়নের রাস্তা দেখালেন ভয়ঙ্কর অ্যালেনকে। উইকেট ছিটকে দিলেন গ্লেন ফিলিপসের। সর্বোপরি, জসপ্রীত বুমরা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর বিকল্প গোটা বিশ্বে নেই। চলতি বিশ্বকাপে ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখলেন। সেমিফাইনালের পর ফাইনালেও। ধারাভাষ্যকাররা বলেন, ‘অধিনায়কের চিট কোড।’ ফাইনালে বলে এসেই ফেরালেন রাচিনকে। ষোলোতম ওভারে পরপর দু’উইকেট নিয়ে হ্যাটট্রিকের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। হ্যাটট্রিক না হলেও ১৫ রান দিয়ে নিলেন চার উইকেট। গোটা প্রতিযোগিতায় বুমরার ঝুলিতে ১৪ উইকেট।
ফাইনালে ভারতীয় ব্যাটারদের অতি আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের সামনে দাঁড়াতে পারল না নিউজিল্যান্ডের বোলিং লাইপ আপ। যখন তাঁরা লাইন-লেংথ খুঁজে পেয়ে, ভারতের রানের গতি কমালেন ততক্ষণে তাঁদের ম্যাচ থেকে বের করে দিয়েছিলেন সঞ্জুরা। লকি ফার্গুসন, ম্যাট হেনরি, জেকব ডাফিরা কেউ আতিপাতি বোলার নয়। কিন্তু ফাইনালের তাঁদের যা অবস্থা হল! সঞ্জুদের সামনে রীতিমতো অসহায় লাগল তাঁদের। ২৫৫ রানের ইনিংসে ভারত মেরেছে ১৮ ছয়, ১৯ চার।
স্কোরবোর্ডে ২৫৬ রানের চাপের সামনে রীতিমতো খাবি খেল নিউজিল্যান্ড। ভারতের পথের কাঁটা ছিল ফিল অ্যালেন। একবার জীবনদান পেয়ে, মাত্র ন’রানে ফিরলেন অক্ষর প্যাটেলের শিকার হয়ে। শনিবার সাংবাদিক সম্মেলেন কিউয়ি অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার ভারতবর্ষের হৃদয় চুরমার করে দেওয়ার হুঙ্কার ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। হল এর ঠিক উলটো। মাঝরাতে উঠে ফাইনালে চোখ রেখেছিলেন নিউজিল্যান্ডের বহু ক্রিকেটপ্রেমী। মিচেল স্যান্টনারদের জঘন্য ক্রিকেটে হৃদয় ভাঙল তাঁদের দেশের। কিউয়িদের ইনিংসের নবম ওভারে টিম সেইফার্ট ফিরতেই দেওয়াল লিখন স্পষ্ট হয়ে যায়— ফাইনাল আর তাঁদের পক্ষে জেতা সম্ভব নয়। ৭২ রানে পাঁচ উইকেট হারানোর পর, কিছুটা লড়াই চালালেন অধিনায়ক স্যান্টনার (৪৩) ও মিচেল (১৭)। তবুও পুরো কুড়ি খেলতে ব্যর্থ নিউজিল্যান্ড। এই ফাইনালেও নির্ভেজাল আত্মসমর্পণ করে সাদা বলের বিশ্বকাপ জেতা হলো না তাঁদের।
India win T-20 World Cup
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে জয় ভারতের
×
Comments :0