ফিল অ্যালেন এক ঝড়ের নাম।
৩৩ বলে ৩০৩.০৩ স্ট্রাইক রেটে শতরান। কুড়ি-বিশ ফরম্যাটের বিশ্বকাপে দ্রুততম। ভেঙে দিলেন উইনিভার্স বস ক্রিস গেইলের রেকর্ড। বেধড়ক ঠ্যাঙানি যাকে বলে— অ্যালেনের সামনে মার্কো জানসেন, লুঙ্গি এনগিডি, করবিন বশ ও কেশব মহারাজদের পাড়ার স্তরের মনে হচ্ছিল। বুধবার রাতে অ্যালেনকে দুঃস্বপ্নে দেখবেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটাররা! তাঁকে কোথায় বল করবেন? তা বুঝে উঠতেই বিশ্বকাপ থেকে ছুটি হয়ে গেল দক্ষিণ আফ্রিকার। অ্যালেনের উইনিং শটটা সীমানা ছুঁতেই, নিউজিল্যান্ড ডাগআউটে ড্যারিল মিচেলদের তীব্র উচ্ছ্বাস। পাশের ডাগআউটে শশ্মানের নিঃস্তদ্ধতা। দক্ষিণ আফ্রিকার ডাগআউটে পৌঁছালো সম্প্রচারকারীর ক্যামেরা। দেখা গেল, প্রোটিয়াদের থিঙ্কট্যাঙ্ক শুক্রি কনরাড গালে দিয়ে বসে। অ্যালেন ঝড়ের আফটার শকে তিনি বিপর্যস্ত। শুক্রির ভেতরে তখন নায়াগ্রা জলপ্রপাত। বোঝার চেষ্টা করছিলেন, ‘কী হয়ে গেল!’ অ্যালেনের শতরান, সেইফার্টের অর্ধশতককে (৫৮) ভর করে, ন’উইকেটে জিতে ফাইনালে নিউজিল্যান্ড।
মাঠের চারিদিকে শটের পসরা সাজালেন। উদ্ভাবনী সমস্ত শটে মাতিয়ে দিলেন গ্যালারি। তাঁর ব্যাটিং একেবারেই দৃষ্টিনন্দন নয়। অ্যালেন মানেই ধ্বংসলীলা। আসলে তাঁর মত রেঞ্জের ব্যাটাররা এমনই, যেদিন খেলবেন, বিশ্বের যে কোনও বোলিং লাইন আপকে অবলীলায় ধ্বংস করে দিয়ে যাবেন! ক্রিকেট বিশ্ব দেখেছে, মার্ক গ্রেটব্যাচ, ব্রেন্ডন ম্যাকালাম, মার্টিন গুপ্টিলদের মতো বিধ্বংসী কিউয়ি ব্যাটারদের। এবার সেই তালিকায় নতুন সংযোজন ফিল অ্যালেন। সারা বিশ্বে ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-২০ লিগে চুটিয়ে খেলেন। জগৎজোড়া নাম। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেভাবে নিজেকে ধাতস্থ করতে পারছিলেন না। এবারের টি-২০ বিশ্বকাপে অ্যালেনের পুর্নজন্ম হলো। পরিসংখ্যান সেই কথাই বলছে, সাত ম্যাচে অ্যালেনের ঝুলিতে ২৮৯ রান। দুশোর উপর স্ট্রাইক রেটে। ছয় মেরেছেন কুড়িটি। বুধবারই মারলেন আটটি। ইডেনে বিস্ফোরক শতরান হাঁকিয়ে, নিজের দেশকে বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে গেলেন না। একইসঙ্গে কলকাতা নাইটরাইডার্স সমর্থকদের স্বস্তি দিয়ে গেলেন, ‘আমি আসছি ঝড় তুলতে।’ পাশাপাশি, আগামী ৮ মার্চ বিশ্বকাপের ফাইনালে ফিল অ্যালেন হবেন, বিপক্ষের মাথাব্যাথার কারণ।
দক্ষিণ আফ্রিকা কী ধুঁকতে থাকা নিউজিল্যান্ডকে কী হালকাভাবে নিয়েছিল? প্রশ্নটা থাকবেই! না হলে মাত্র ১৭০ রানের পুঁজি থাকা সত্ত্বেও, আরেকটিু আক্রমণাত্মক হওয়া উচিত ছিল? পাওয়ার প্লে’তে যখন সেইফার্ট-অ্যালেন ঝড় তুললেন, তখন কেশব মহারাজকে এনে তাঁদের জুটি ভাঙার চেষ্টা কেন করলেন আইডেন মার্করাম জুটি? ইডেনে ধারাভাষ্য দিতে আসা, দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট অধিনায়ক তেম্বা বাভুমাকে অবাক করেছে মার্করামের অধিনায়কত্ব! দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস শেষেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, বোর্ডে ১৬৯ রানের পুঁজি নিয়ে জেতা সম্ভব নয়! সিএবি’ লাউঞ্জে তাঁকে কথা বলার অনুরোধ করা হলে, এঁড়িয়ে গেলেন। তাঁর শরীরীচভাষা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তিনি কতটা বিমর্ষ!
দশম টি-২০ বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে দক্ষিণ আ্ফ্রিকাকে হারিয়ে নিউজিল্যান্ড হিস্ট্রি রিপিট করল। আবার হিস্ট্রি ডিফিটও করল।’ ব্যাপারটি একটু খোলসা করি! আইসিসি টুর্নামেন্টের নকআউটে নিউজিল্যান্ডকে একবারও হারাতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। এবারও ব্যত্যয় হলো না। একইসঙ্গে, প্রথমবার টি-২০ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে জিতল কিউয়ি শিবির। আর তাতেই পাঁচ বছর পর, কুড়ি-বিশ ফরম্যাটের বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিট পেল নিউজিল্যান্ড।
ইডেনে টস জেতা মানেই অর্ধেক ম্যাচ জিতে যাওয়া। কারণ, রাতের ম্যাচে ক্রিকেটের নন্দনকাননে রান তাড়া সবসময় সহজ। ১৭০ তাড়া করতে নেমে, ৪৩ বল বাকি থাকতে জয় নিউজিল্যান্ডের। ফুটবলে যা পাঁচ গোলে হারার সমান। চলতি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকাকে অপ্রতিরোধ্য লাগছিল। সব বিভাগেই, তারা বাকি দলগুলির চেয়ে এগিয়ে। ক্রিকেট এমন একটা খেলা, বিশেষ করে কুড়ি-বিশের ফরম্যাটে। সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে, কোনও দলের পক্ষেই অনন্তকাল অপরাজিত থাকা সম্ভব নয়। টানা সাত ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে খেলতে নেমেছিল। এই ম্যাচে ফেভারিট হিসেবে শুরু করেছিল। প্রায়শই, ক্রিকেটাররা বলেন, নকআউটে ফর্ম নয়। ওই দিনে যে ভালো খেলবে, তারাই জিতবে। প্রোটিয়ারা সবচেয়ে বাজে ক্রিকেট খেলল বুধবার। এমন একটা দিনে বাজে ক্রিকেট খেলল, তাদের প্রতিযোগিতা থেকে ছুটি হয়ে গেল। দিন কয়েক আগে, ইংল্যান্ডের কাছে হেরে গিয়ে নিউজিল্যান্ডের সেমিফাইনালে ওঠা জটিল অঙ্কের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে পাকিস্তান ৬৫ রানে জিততে না পারায়, সেমিফাইনালের টিকিট পায় কিউয়িরা। সেখান থেকে, ইডেন উড়ে এসে বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার দক্ষিণ আফ্রিকাকে উড়িয়ে দিল মিচেল স্যান্টনাররা। এই কারণে ক্রিকেট মহান অনিশ্চয়তার খেলা
গুরুত্বপূর্ণ টস হেরে নিউজিল্যান্ডের স্পিনারদের দাপটে প্রথম দশ ওভারেই চার উইকেট হারায় দক্ষিণ আফ্রিকা। প্যাভিলিয়নে ফিরে যান কুইন্টন ডি কক (১৮), রায়ান রিকেলটন (০), আইডেন মার্করাম (১৮) ও ডেভিড মিলার (৬)। কলিন ম্যাককোনহির ঝুলিতে দুই উইকেট। দ্বিতীয় ওভারেই তিনি প্রোটিয়া শিবিরে জোড়া ধাক্কা দেন। সেই ধাক্কা আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। মাঝে মার্করাম ক্যাচ পড়ল, মিলারের ক্যাচ ফেললেন ফিলিপস। যা রীতিমতো বিস্ময়ের সমান। জীবনদান পেয়েও সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ মিলার, মার্করামরা। দু’জনেই ফিরলেন রাচিন রবীন্দ্রের শিকার হয়ে। এরপর ডিওয়াল্ড ব্রেভিস’কে (৩৪) ফেরালেন নিশাম। ব্রেভিস ফিরতেই দেওয়াল লিখন স্পষ্ট হয়ে যায়—এই ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকা হারছেই! ষষ্ঠ উইকেটে স্ট্যাবস (২৯)-জানসেন মিলে সংগ্রাম চালালেন। তাঁদের জুটিতে উঠল ৭৩। সাত নম্বরে নেমে জানসেনের ৫৫ রানের ইনিংসটা না থাকলে, ১৬৯ অবধি পৌঁছাত না প্রোটিয়ারা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর—
দক্ষিণ আফ্রিকা—১৬৯/৮ (২০ ওভার)
জানসেন ৫৫, রাচিন ২/২৯
নিউজিল্যান্ড—১৭৩/১ (১২.৫ ওভার)
অ্যালেন ১০০, সেইফার্ট ৫৮, রাচিন ১৩, রাবাডা ১/২৮
ম্যাচের সেরা—ফিন অ্যালেন
T-20 World Cup
অ্যালেন-সেইফার্ট ঝড়ে ফাইনালে নিউজিল্যান্ড খারাপ ক্রিকেটে বিদায় প্রোটিয়াদের
×
Comments :0