Aquib Nabi

জাতীয় দলের দড়জায় কড়া নাড়ছেন আকিব নবি

খেলা

—কঠোর আবহাওয়া, প্রবল শীত, রাজনৈতিক সমস্যা। একেকটা প্রজন্ম শুধু বিমান হামলা আর কার্ফুতে দিন কাটিয়েছে। তাও থেমে থাকেনি জম্মু-কাশ্মীর। বাদবাকি ভারতের মত সেখানেও ক্রিকেট হয়েছে। বন্ধ হলেও আবার চালু হয়েছে। তবেই উঠে এসেছেন আকিব নবির মতো পেসার। 
আকিবের বাবা গুলাম একসময় ক্রিকেট খেলতেন। যদিও তিনি বিয়ে পর খেলা ছেড়ে দেন। সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘আমার স্ত্রী ক্রিকেটের খুবই ভক্ত। তিনি অনেক ক্রিকেটারদের নাম জানতেন। এদের অনেকেরই নাম আমি শুনিনি কোনওদিন।’ তিনি চেয়েছিলেন ছেলে হোক ডাক্তার। গুলাম সরকারি স্কুলের শিক্ষক। ছেলে নবি যখন কর্ণাটকের টপ অর্ডার ভেঙে দিচ্ছেন, তিনি তখন বারামুলা থেকে ৭ কিলোমিটার দুরে স্কুলে পড়াচ্ছিলেন। গুলাম জানান, ‘ক্লাস এইটে আকিব জোনের টপার ছিল। আমি চাইতাম আমার ছেলে ডাক্তার। কিন্তু ওর লক্ষ্য ছিল ক্রিকেট।’ এরপর তিনি যোগ করেন, ‘আমি ওকে বকতাম। ঘরে আটকে রাখতাম। কিন্তু ও চুপ করে থাকতো। তখন ক্রিকেট খেলায় কাশ্মীরে কোনও কেরিয়ার ছিল না। কোনও সুবিধা ছিল না। ও পরিশ্রম করে যেত।
যে মাঠ থেকে শীরি, বারামুলার ক্রিকেটাররা উঠে আসেন, তা নুড়ি পাথরে ভর্তি। গুলাম বলেছেন, ‘এটাকে মাঠ বলা যায় না।’ আকিব রাজ্যের অনূর্ধ্ব-১৯ ট্রায়ালে গিয়েছিলেন। তাঁকে বিবেচনা করা হয়নি। তবে ২০১৪ সালে অনেক কিছু বদলে যায়। গুলাম জানিয়েছেন, ‘ডাউনটাউন প্রিমিয়ার লিগে প্রথম দেখি। ব্যাটিং দারুণ করে। বোলিং ভুলে যান।’ শচিন, সৌরভের ভক্ত গুলাম জানান, আসল সমস্যা অর্থ। তিনি বলেন, ‘আর্থিক সমস্যা ছিল। কিন্তু আমরা ও চাইলে সবসময় দিয়ে দিয়েছি। ও ক্রিকেটের প্রতি খুবই দায়বদ্ধ।’ তার প্রমান হলো প্রতিদিন ৬০ কিলোমিটার দূরে বারামূলা ক্রিকেট ক্লাবে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলের বিপক্ষে চার বলে ৪ উইকেট নেন নবি দলীপ ট্রফিতে। অবশেষে ক্রিকেটকে মেনে নেন গুলাম।
রঞ্জি ট্রফি প্রথমবার শ্রীনগর যাত্রা করেছে নবির হাত ধরে। সেমিফাইনালে মধ্যপ্রদেশের বিরুদ্ধে তাঁর বিধ্বংসী স্পেল দলকে পথ দেখায়। ফাইনালের আগে বাংলার বিপক্ষে ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স ঘোষণা করে দিয়েছিল, এই মরসুম তাঁরই। আর কর্ণাটকের মতো অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষের সামনে শেষ লড়াইয়েও তিনি পিছিয়ে যাননি। টুর্নামেন্ট শেষ করেছেন সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হিসেবে (৬০)। সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ ঘরোয়া মরশুমে তাঁর সংগ্রহ ৯৫টি উইকেট। এই পরিসংখ্যান ধারাবাহিকতার প্রমাণ।
এবারের রঞ্জিতে নবি নক আউট ম্যাচ গুলোয় অপ্রতিরোধ্য ছিলেন। মধ্যপ্রদেশ ম্যাচে ১২ উইকেট নেন। বাংলার বিপক্ষে ৯টি ও ফাইনালে ৫টি। সবমিলিয়ে ২৬ উইকেট নেন ৫ ইনিংসে। এর মধ্য ৪ বার ইনিংসে ৫ উইকেট দখল করেন তিনি। পিচ যেমনই হোক, নবির কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কল্যাণী বা লক্ষ্ণৌয়ের উইকেট খুব একটা বোলার সহায়ক ছিল না। তাতেও ৩ ইনিংসে এসেছে ১৪ উইকেট। শুধু এই মরশুমেই নয়, গত ২০২৪-২৫ মরশুমেও তিনি ৮ ম্যাচে ৪৪ উইকেট নেন।
রঞ্জি ফাইনালে ৫ উইকেট নেওয়ার প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি’র। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘সারা বিশ্বকে জম্মু-কাশ্মীর দেখিয়েছে ইচ্ছা আর প্রচেষ্টা থাকলে কি করা যায়। নিজেদের অঞ্চলকে তারা গর্বিত করেছে। কঠিন আবহাওয়া শক্ত মনের মানুষ তৈরি করে। জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছেন আকিব নবি। ইংল্যান্ডেই কেরিয়ার শুরু করা সব থেকে ভালো হবে তার জন্য।’ সৌরভের এই প্রশংসা অঞ্চলের সংগ্রামী মানসিকতার স্বীকৃতি।
সামনেই আফগানিস্তান আসছে ভারত সফরে। ১টি টেস্ট ও ৩টি একদিনের ম্যাচ খেলবে তারা। এই সিরিজ হয়ে উঠতে নবির অভিষেকের জন্য আদর্শ। তবে তার আগেই নিজের প্রতিভার পরিচয় আরেকবার দিতে হবে আইপিএলে। সেখানে তিনি দিল্লির হয়ে খেলবেন এবার।
প্রাক্তন উইকেটরক্ষক দীনেশ কার্তিক-ও আবেগাপ্লুত প্রশংসা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এবারের রঞ্জিত ট্রফি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আকিব নবির মতন করেই কাজ করতে হয়। এমন কারোর কথা মনে পড়ছে না যে ওর মতন করে দীর্ঘদিন ধরে এই কাজটা করেছে।’ তাঁর আরেকটি মন্তব্য ছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ— ‘শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, গোটা প্রতিযোগিতা জুড়ে চলা ফিটনেস, দলের সঙ্গে এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে থাকা, দলের জন্য প্রতিবার উইকেট দখল করা, ভাবা যায় না।’ এই কথাগুলো নবির মরশুমের সারাংশ। শুধু প্রতিভা নয়, ফিটনেস, একাগ্রতা ও মানসিক দৃঢ়তার সমন্বয়।
আকিবের গল্পটি আসলে সীমানা ভাঙার গল্প। ছোট রাজ্যের ক্রিকেটারদের জন্য জাতীয় দলে জায়গা পাওয়া সবসময়ই কঠিন। কিন্তু তিনি দেখিয়েছেন, দরজা ভাঙতে হলে দরকার অবিরাম চেষ্টা, নিজের দক্ষতার ওপর আস্থা এবং চাপের মুহূর্তে নির্ভীক থাকা। ঘরোয়া ক্রিকেটের দীর্ঘ, প্রায়শই অবহেলিত পরিশ্রমের ফল যে আন্তর্জাতিক স্বপ্নের সিঁড়ি হতে পারে। নবি সেই বিশ্বাসকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছেন।

Comments :0

Login to leave a comment