ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন তথা এসআইআর নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে রীতিমতো হতাশ আবেদনকারীরা। যে গুরুতর প্রশ্নটির উত্তর বা ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন আদালত কার্যত সেটা পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে। ফলে সাংবিধানিক সংস্থা হিসাবে নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ সংবিধানের মৌলিক ভাবনা এবং সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের বিষয়টিকে খর্ব বা গুরুত্বহীন করে দিচ্ছে কিনা সেই প্রশ্নটি অমীমাংসিতই থেকে গেল। নির্বাচন কমিশনের কাজ নির্ভুল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটার তালিকা তৈরি করা। সকল প্রাপ্তবয়স্ককে তালিকায় যুক্ত করা প্রধান লক্ষ্য, কোনও অবস্থাতেই কোনও বৈধ ভোটারকে বাদ দেওয়া নয় বা তালিকার বাহিরে রাখা নয়। কোনও বৈধ বা ন্যায্য ভোটারের ভোটাধিকার কাড়া গুরুতর ও ঘোরতর সংবিধাধনবিরোধী কাজ। এসআইআর’র আড়ালে নির্বাচন কমিশন সেই কাজটাই একতরফাভাবে করছে। মানুষ আশা করেছিল সংবিধানের রক্ষক হিসাবে সর্বোচ্চ আদালত নির্বাচন কমিশনকে সংযত করবে এবং সঠিক পথে পরিচালিত হতে সাহায্য করবে। বাস্তবে আদালত মানুষের উদ্বেগ ও প্রশ্নের নিরসন না ঘটিয়ে বিপুল সংখ্যক প্রান্তিক নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার, বাদ দেবার এবং ভয় দেখানোর এক অমানবিক প্রক্রিয়াকেই বৈধতা দিয়ে দিয়েছে।
নাগরিকত্ব যাচাই করা নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়— এটা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেবার পরও আদালত কমিশনের বাদ দেওয়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। সাধারণভাবে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য যে সব নথিপত্রকে মান্যতা দেওয়া হয় নির্বাচন কমিশন সেই নথিপত্রের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গে ২৭ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়েছে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। অর্থাৎ প্রকারান্তরে নির্বাচন কমিশনই নাগরিকত্ব যাচাই করে নিশ্চিত হবার পর ভোটার তালিকা তৈরি করেছে এবং নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকায় ২৭ লক্ষের নাম বাদ দিয়ে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। এখন সর্বোচ্চ আদালত বলছে নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহের কারণে যাদের নাম বাদ গেছে তাদের তালিকা স্বরাষ্ট্র দপ্তরে পাঠাতে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য। যাবতীয় নথিপত্র, তথ্য প্রমাণ হাজির করে এই ২৭ লক্ষ মানুষকে প্রমাণ করতে হবে তারা নাগরিক।
তাহলে ধরে নিতে হবে ২৭ লক্ষ বাদে বাকিদের নাগরিকত্ব কমিশন যাচাই করে নিঃসন্দেহ হয়েছে। তাদের নাগরিকত্ব স্বরাষ্ট্র দপ্তর যাচাই করবে না। করবে সেই ২৭ লক্ষের কমিশনের বিচারে যাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ হয়নি। তাহলে দেশজুড়ে যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচন কমিশনই আদতে এনআরসি’র কাজ নীরবে করে চলেছে। সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কমিশন বৈধ ভোটার তালিকা তৈরির আগে বৈধ নাগরিকত্ব যাচাই করেছে। যেটা কমিশন করতে পারে না। এই জায়গায় সর্বোচ্চ আদালতের ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত ছিল।
যাদের ভোটাধিকার হরণ করা হলো তারা ভুঁইফোর নন। বছরের পর বছর ভোট দিচ্ছেন, আধার কার্ড আছে, অন্যান্য সরকারি পরিচয়পত্র আছে, নানা ধরনের সরকারি পরিষেবা ভাতা পান। যাদের তালিকায় প্রাধান্য দরিদ্র, পরিযায়ী শ্রমিক, সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসী, ভূমিহীন ঝুপড়িবাসী বা ফুটপাতবাসীদের। এই অংশের মানুষের অনেকের কাছে কমিশনের চাওয়া কাগজপত্র নেই। শিক্ষাহীন, অসচেতন প্রান্তিক মানুষের কাছে এসব কাগজ না থাকা অস্বাভাবিক নয়। এই জায়গাতেই বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সবটাই নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি ছিল। তা না করে আমলা সর্বস্ব নিয়মতান্ত্রিকতার জাল বিস্তার করে অপরীক্ষিত সফটওয়ার ও অ্যালগারিদম ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশে সর্বজনীন প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটাধিকারের প্রশ্নে এটা এক বিপজ্জনক ঝোঁক এবং অবশ্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়।
Supreme Court SIR
সুপ্রিম প্রহসন
×
Comments :0