অরূপ সেন: নয়াদিল্লি
বর্তমান ভারতে ইতিহাসকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র ধ্বংস করার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ধর্মীয় সংখ্যাগুরুর একচেটিয়া দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অতীতের পুনর্লিখনের চেষ্টা চলছে। এমনই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার। রবিবার দিল্লির হরকিষেণ সিং সুরজিৎ ভবনে ‘ইতিহাসতত্ত্ব ও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস’ শীর্ষক সীতারাম ইয়েচুরি স্মারক বক্তৃতায় তিনি প্রধান বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন।
থাপার বলেন, সরকার পোষিত ইতিহাস রচনাকে ক্রমশ হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার হাতিয়ারে পরিণত করা হচ্ছে। ইতিহাসের পেশাদার, প্রমাণনির্ভর, তথ্যনিষ্ঠ চর্চা বন্ধ করে তা সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদকে পুষ্ট করার স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কয়েক দশকের গবেষণার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা পেশাদার ইতিহাসচর্চার ভিত্তি হলো যাচাই করা তথ্যপ্রমাণ, যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ এবং কার্যকারণ সম্পর্কের অনুসন্ধান। কিন্তু সেই পদ্ধতিগত ইতিহাসচর্চাই বর্তমানে আক্রমণের মুখে। একসময় প্রাক্-আধুনিক যুগের ইতিহাসকে নিভৃত বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্র বলে মনে করা হত। তবে বর্তমানে হিন্দুত্ববাদী প্রচারকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখায় ইতিহাসবিদদের সামাজিক মাধ্যমে লাগাতার হেনস্তা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে। ইতিহাসের প্রচলিত ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে গবেষণার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসাবে গ্রহণ করার পরিবর্তে গবেষকদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে।
থাপার বলেন, বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে থেকে ইতিহাসচর্চায় এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। কোন ঘটনা ‘কখন’ এবং ‘কোথায়’ ঘটেছিল তার বিবরণে সীমাবদ্ধ না থেকে তা ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’ ঘটেছিল ইতিহাসবিদরা তার অনুসন্ধান শুরু করেন। এর ফলে ইতিহাসচর্চার সঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব, তুলনামূলক সমাজতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব এবং জিনগত গবেষণার মতো বিভিন্ন শাখার সংযোগ গড়ে ওঠে। অতীতের সমাজব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো, সামাজিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং বিশ্বাসের জগৎকে আরও গভীরভাবে বোঝার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক ও বিশ্লেষণাত্মক ইতিহাসচর্চার পরিবর্তে বর্তমানে এমন এক ধরনের ইতিহাসের প্রচার বাড়ছে, যাকে থাপার ‘পপ হিস্ট্রি’ (জনপ্রিয় ইতিহাস) বলে চিহ্নিত করেন। ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই সমস্ত বয়ানের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রমাণ যাচাই, বিশ্লেষণ পদ্ধতি কিংবা যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা হচ্ছে। ইতিহাসের জটিল ঘটনাবলিকে সরলীকৃত কাহিনীতে পরিণত করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্বেগজনকভাবে তা সরকারি পাঠ্যপুস্তকেও জায়গা করে নিচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদ প্রসারের মাধ্যমে পরিণত করা হচ্ছে।
থাপার বলছেন, হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চা ভারতের অতীতকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাই দেশের সামাজিক ইতিহাসের একমাত্র নির্ধারক বৈশিষ্ট্য। এই ব্যাখ্যায় প্রাচীন ভারতকে এক আদর্শ, অভিন্ন ‘স্বর্ণযুগ’ হিসাবে তুলে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ে মুসলিম শাসকদের আগমনকে সেই স্বর্ণযুগের অবসান হিসাবে দেখানো হয়। মুসলিম শাসকরা শুধুই হিন্দুদের উপর নিপীড়ন চালিয়েছেন বলে দাবি করা হয়। এর ফলে ভারতের দীর্ঘ ইতিহাসের বহুমাত্রিক পরিবর্তনকে এক সরল ধর্মীয় সংঘাতের কাহিনীতে নামিয়ে আনা হয়। পেশাদার ইতিহাসবিদদের সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণ এই একপাক্ষিক বয়ানের সত্যতা প্রশ্নের মুখে ফেলে। কিন্তু প্রমাণের ভিত্তিতে সেই গবেষণার মোকাবিলা করার পরিবর্তে হিন্দুত্ববাদীরা ব্যক্তিগত আক্রমণের পথ বেছে নেয়। যে কোনও সমালোচনামূলক গবেষণাকেই ‘মার্কসবাদী’ তকমা দেওয়া হয়।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বৌদ্ধিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে থাপার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বৈপরীত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চার শিকড় আসলে উনিশ শতকে ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার মধ্যে নিহিত। একদিকে হিন্দুত্ববাদীরা ভারতীয় ইতিহাসকে ঔপনিবেশিক প্রভাব মুক্ত করার কথা বলেন, অন্যদিকে তাঁরা সেই ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদদের প্রবর্তিত বিভাজনমূলক ধারণাকেই নতুন ভাষায় পুনরুৎপাদন করেন।
এই প্রসঙ্গে তিনি জেমস মিলের ‘দ্য হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ (১৮১৭)-র উল্লেখ করেন। মিল ভারতীয় ইতিহাসকে হিন্দু, মুসলিম এবং ব্রিটিশ যুগে ভাগ করেন। এর মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলিমদের দুটি স্ববিরোধী জাতি হিসাবে তিনি চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। এই ভাষ্যই পরবর্তীতে ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের’ অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে, যার জেরে দেশভাগের পথ প্রশস্ত হয়। প্রকৃত অর্থে ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত ইতিহাসচর্চা প্রতিষ্ঠা করতে হলে হিন্দুত্ববাদকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে হবে। অতীত সম্পর্কে ঔপনিবেশিক ব্যাখ্যার বিভাজনমূলক অনুমানকে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে খারিজ করাই তার শর্ত।
ভারতের প্রাক্-আধুনিক ইতিহাসকে চিরস্থায়ী ধর্মীয় যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় উপস্থাপনের প্রবণতাকেও প্রত্যাখ্যান করেন থাপার। তিনি বলেন, বহুক্ষেত্রে সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাই সংঘাতের প্রধান কারণ ছিল। তা ধর্মীয় সংঘাত হিসাবে ব্যাখ্যা করা ঐতিহাসিক বাস্তবতার বিকৃতি। একইভাবে, প্রাচীন ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে বৌদ্ধ, জৈন ও আজীবিকদের মতো শ্রমণ ধারার মতাদর্শগত সংঘাতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মধ্যযুগেও সামরিক সংঘাতের সময় ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে রাজনৈতিক জোট গড়ে ওঠার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে ১৫৭৬ সালের হলদিঘাটির যুদ্ধের উদাহরণ তুলে থাপার বলেন, সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যায় একে প্রায়শই হিন্দু বনাম মুসলিমের ছাঁচে ফেলা হয়। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক কর্তৃত্বই যুদ্ধের কেন্দ্রে ছিল। মহারানা প্রতাপের বাহিনীতে হাকিম খান সুরির নেতৃত্বে আফগান সেনাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। অন্যদিকে, আকবরের মোঘল বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন রাজপুত শাসক রাজা মান সিং। অর্থাৎ, একদিকে হিন্দু রাজার আফগান সেনাপতির বাহিনী, অন্যদিকে মোঘল সম্রাটের রাজপুত সেনাপতির সেনার বাহিনী। ভারতীয়দের ইতিহাস চেতনা ছিল না— ঔপনিবেশিক শাসকদের এই দাবিকেও খণ্ডন করেন থাপার। তিনি বলেন, প্রাক্-ঔপনিবেশিক ভারতে অতীতকে সংরক্ষণ, ব্যাখ্যা এবং ধারাবাহিকভাবে লিপিবদ্ধ করার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল। বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’, সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতম’, ‘রাজতরঙ্গিণী’ কিংবা দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার প্রস্তরলিপি, তাম্রশাসনই তার উদাহরণ।
আর্যদের উৎস এবং ভারতীয় সভ্যতার উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গেও বক্তব্য রাখেন থাপার। হিন্দুত্ববাদীরা ভারতীয় সভ্যতার বিকাশকে সম্পূর্ণ দেশীয় আর্য জনগোষ্ঠীর অবদান হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই দাবির সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক ও জিনগত গবেষণার বিভিন্ন ফলাফলের অসঙ্গতি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে হরপ্পা সভ্যতার নগরজীবন, লিপি ব্যবহারের নিদর্শন এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে বৈদিক সমাজের পশুপালননির্ভর চরিত্রের মৌলিক পার্থক্য দেখা যায়। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক জিনগত গবেষণায় জনগোষ্ঠীর স্থানান্তর ও মিশ্রণের বিভিন্ন প্রমাণ উঠে এসেছে। ফলে ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসকে কোনও একক জনগোষ্ঠীর অবিচ্ছিন্ন ও সম্পূর্ণ দেশীয় বিকাশের কাহিনী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো প্রয়োজন।
ভারতের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে অভিন্ন, অপরিবর্তিত এবং একক পরিচিতির মধ্যে আবদ্ধ করার প্রচেষ্টারও সমালোচনা করেন থাপার। তিনি বলেন, হিন্দু ধর্ম কখনোই একরৈখিক ব্যবস্থা ছিল না। বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়, আঞ্চলিক উপাসনা পদ্ধতি, দার্শনিক মতবাদ, ভিন্নমত এবং পরিবর্তনশীল ভক্তিধারার মধ্য দিয়ে এর বিকাশ ঘটেছে। এই বৈচিত্রের মধ্যে ছিল প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা। ভক্তি আন্দোলনের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ওডিশায় বিষ্ণুর জগন্নাথ রূপে উপাসনা এবং মহারাষ্ট্রে বিঠ্ঠলের উপাসনা বৃহত্তর বৈষ্ণব ও ভক্তি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হলেও তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বহুত্বকে অস্বীকার করে অভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় নির্মাণের প্রচেষ্টা ভারতের ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
শেষের কথায় রোমিলা থাপার ইতিহাসচর্চাকে এক গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক অনুশীলন হিসাবে রক্ষা করার আহ্বান জানান। ইতিহাসের পেশাদার গবেষণার ভিত্তি হলো প্রমাণের নিরপেক্ষ পরীক্ষা, যুক্তির প্রয়োগ এবং প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে ইতিহাসের পুনর্লিখনে কেবল অতীতের ব্যাখ্যাই বিকৃত হয় না, বর্তমান সমাজের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধও বিপন্ন হয়। তবুও পেশাদার গবেষণার ক্ষমতার উপর আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চা ভবিষ্যতেও সংখ্যাগরিষ্ঠ আধিপত্যবাদের অপব্যাখ্যা ও মনগড়া বয়ানের অসারতা উন্মোচন করতে থাকবে।
স্মারক বক্তৃতায় প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ সি পি চন্দ্রশেখর। রোমিলা থাপারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করে সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি বলেন, ‘‘বর্তমানকে বোঝার অন্যতম শর্ত ইতিহাসের সঠিক বিশ্লেষণ। আমরা এমন এক সময়ে রয়েছি যখন সুপ্রিম কোর্টের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান প্রমাণের ভিত্তিতে নয়, এক সম্প্রদায়ের মানুষের বিশ্বাসের কথা মাথায় রেখে তার রায় ঠিক করছে। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিচ্ছে, ন্যায় দিচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে ইতিহাস ও ইতিহাসতত্ত্বে তথ্যপ্রমাণের গুরুত্ব উপলব্ধি করা কতটা জরুরি তা রোমিলা থাপার বিশদে বুঝিয়েছেন।’’
Comments :0