MUKTADHARA | SHOKE SANGBAD | 6 OCTOBER 2026 | 4th YEAR

মুক্তধারা | শোক সংবাদ | ৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

MUKTADHARA  SHOKE SANGBAD  6 OCTOBER 2026  4th YEAR

মুক্তধারা

শোক সংবাদ

৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

বিভা সেনগুপ্ত : যে কণ্ঠ রবীন্দ্রনাথের গানের ভিতর দিয়ে বেঁচে থাকবে

গৌতম রায়

কিছু কিছু শিল্পীর চলে যাওয়া নিছক একটি মানুষের চলে যাওয়া নয়। তাঁদের প্রস্থান যেন একটি বিশেষ ধরনের শ্রুতিস্মৃতি, একটি গানের ঘরানা, একটি সাধনার পরম্পরাকে আরও একটু দূরে সরিয়ে দেয়। বিভা সেনগুপ্তের প্রয়াণ সেই অর্থে বাংলা রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগতে এক গভীর শূন্যতার মুহূর্ত। দীর্ঘ জীবন পেরিয়ে, নবতিপর বয়সেও যিনি গানকে কখনও অতীতের স্মৃতি হতে দেননি, মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগেও যাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান শোনা গিয়েছে, তাঁর চলে যাওয়াকে তাই কেবল একজন প্রবীণ শিল্পীর মৃত্যু বলে দেখলে তাঁর প্রতি সুবিচার করা হবে না।
বিভা সেনগুপ্ত ছিলেন সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁদের কাছে গান ছিল না কেবল মঞ্চে পরিবেশনের বিষয়। গান ছিল; জীবনযাপনের একটি পদ্ধতি, আত্মশিক্ষার একটি পথ। তাঁর শিল্পীসত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেবব্রত বিশ্বাস। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ইতিহাসে দেবব্রত বিশ্বাস যে এক স্বতন্ত্র উচ্চারণ, স্বরক্ষেপণ ও ভাবব্যঞ্জনার পরম্পরা তৈরি করেছিলেন, বিভা সেনগুপ্ত সেই পরম্পরার একজন গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকারী। 
আগরতলার মেয়ে বিভার কলকাতায় আসা ছিল তাঁর শিল্পীজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। পাঁচের দশকে কলকাতায় এসে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিক্ষা শুরু করেন। ‘অ্যাকাডেমি অফ ডান্স ড্রামা মিউজিক’-এ, যা পরবর্তীকালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, সেখানে তিনি মায়া সেনের কাছে তালিম নেন। সেই সূত্রেই তাঁর পৌঁছনো দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে।
          কিন্তু গুরু-শিষ্যের এই সম্পর্ককে শুধু প্রথাগত শিক্ষাগ্রহণের সম্পর্ক বললে ভুল হবে। দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে গান শেখা মানে ছিল গানের অন্তর্গত অর্থকে উপলব্ধি করা। বিভা সেনগুপ্ত নিজেই স্মরণ করেছেন, কীভাবে দেবব্রত তাঁকে শুধু স্বর বা সুর শেখাননি, গানের ভিতরের অনুভূতিকে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছিলেন। ‘মিলাব নয়ন তবে নয়নের সাথে’ শেখানোর সময় তাঁর দিকে তাকিয়ে গান গাইতে বলা—এই আপাত ছোট্ট ঘটনাটিই আসলে দেবব্রতীয় শিক্ষার একটি গভীর দিককে প্রকাশ করে। গান তাঁর কাছে কেবল স্বরলিপি অনুসরণ নয়; গান ছিল অনুভবের শিল্প।
এই কারণেই বিভা সেনগুপ্তের গানে দেবব্রত বিশ্বাসের ছায়া ছিল, কিন্তু অন্ধ অনুকরণ ছিল না। একজন প্রকৃত শিষ্যের সাফল্য এখানেই—সে গুরুর কাছ থেকে ভাষা শেখে, কিন্তু নিজের কণ্ঠে সেই ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি করে। বিভার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান ছিল সংযত, গভীর এবং ভাবনির্ভর। তাঁর গানের মধ্যে অযথা অলঙ্কারের প্রদর্শন ছিল না; বরং শব্দ, সুর ও অনুভূতির সম্পর্ককে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর শিল্পীজীবনের আর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, প্রচারের প্রতি এক ধরনের অনাসক্তি।    
                   আজকের সময়ে যেখানে শিল্পীর পরিচিতি অনেক সময় মঞ্চ, প্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দৃশ্যমান উপস্থিতির উপর নির্ভর করে, সেখানে বিভা সেনগুপ্ত ছিলেন অন্য রকম। একটি সাম্প্রতিক স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে, আকাশবাণী, দূরদর্শন বা রেকর্ড কোম্পানির মোহ তাঁকে বিশেষভাবে টানেনি। তাঁর কাছে গানের সাধনাই ছিল মুখ্য।
এই অনাসক্তির মধ্যেই তাঁর শিল্পীসত্তার একটি বড় শক্তি নিহিত ছিল। তিনি জনপ্রিয়তার পিছনে ছুটে গানকে সহজ করে দেননি। বরং গানকে তার নিজস্ব মর্যাদায় রেখেছেন। ফলে হয়তো বৃহত্তর জনপ্রিয়তার পরিসরে তাঁর নাম অন্য অনেক শিল্পীর মতো উচ্চারিত হয়নি, কিন্তু যাঁরা রবীন্দ্রসঙ্গীতের গভীরে কান পাতেন, তাঁদের কাছে বিভা সেনগুপ্ত ছিলেন এক বিশেষ আশ্রয়।
               তাঁর দীর্ঘ জীবন আমাদের সামনে একটি আশ্চর্য প্রশ্নও রেখে যায়—শিল্পীর বয়স কি সত্যিই শিল্পের বয়স? বিভা সেনগুপ্ত যেন তার উত্তর দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে। নবতিপর বয়সেও তাঁর কণ্ঠে যে স্বচ্ছতা, দৃঢ়তা এবং ভাবের স্থিরতা ছিল, তা নিয়ে সাম্প্রতিক লেখাগুলিতে বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। এমনকি ৩ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে রবীন্দ্রসদনের অনুষ্ঠানে তাঁর ‘তবু মনে রেখো’ পরিবেশনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, তাঁর কণ্ঠে তখনও নির্ভুল স্বরক্ষেপণ এবং ভাবের স্থিরতা ছিল।
এই তথ্যটি আজ বিশেষভাবে মর্মস্পর্শী। কারণ, মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে পর্যন্ত তিনি গান গেয়েছেন। অর্থাৎ ; জীবনের শেষ প্রান্তেও গান তাঁর কাছে স্মৃতি ছিল না—ছিল বর্তমান। তিনি অতীতের কোনও ‘স্মরণীয় শিল্পী’ হয়ে বসে থাকেননি; তিনি শেষ পর্যন্ত শিল্পী হিসেবেই বেঁচেছেন।
দেবব্রত বিশ্বাসের স্মরণানুষ্ঠানেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। তাঁর নিজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে তিনি দেবব্রতীয় গানের একটি পর্ব পরিচালনা করেছিলেন। সেখানে তাঁর পরিবেশনার মধ্যে তাঁর গুরুর গানের স্বরভঙ্গির একটি বিশেষ স্মৃতি ফিরে এসেছিল বলে সমালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই বিভা সেনগুপ্তের গুরুত্ব শুধু একজন গায়িকা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি ছিলেন একটি সেতু—এক প্রজন্মের সঙ্গে আর-এক প্রজন্মের। রবীন্দ্রসঙ্গীতের যে এক বিশেষ ব্যাখ্যাপদ্ধতি দেবব্রত বিশ্বাস নির্মাণ করেছিলেন, তার প্রত্যক্ষ স্মৃতি ও শিক্ষাকে তিনি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। নিজের ছাত্রছাত্রীদের গান শেখানোর মধ্য দিয়ে তিনি শুধু গান শেখাননি; একটি নন্দনবোধ, একটি উচ্চারণরীতি এবং গানকে বোঝার একটি দৃষ্টিভঙ্গিও বহন করেছেন।
তাঁর শিল্পীজীবনের মূল্য এখানেই যে, তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—রবীন্দ্রসঙ্গীত কোনও সাজানো, পালিশ করা ‘সাংস্কৃতিক পণ্য’ নয়। তার ভিতরে আছে জীবন, বেদনা, প্রেম, বিচ্ছেদ, প্রকৃতি, আত্মজিজ্ঞাসা, সমাজ এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। সেই গান গাইতে গেলে কণ্ঠের পাশাপাশি জীবনবোধও দরকার। দীর্ঘ জীবন পেরিয়ে বিভা সেনগুপ্ত সেই জীবনবোধকে নিজের গানের মধ্যে ধারণ করেছিলেন।
              তাঁকে নিয়ে পুরনো একটি সংবর্ধনার প্রতিবেদনে এক শিল্পী-সংগঠক বলেছিলেন, সবাই শিল্পী হন না, অধিকাংশই গায়ক-গায়িকা; বিভা সেনগুপ্ত শিল্পী। কথাটির তাৎপর্য আজ তাঁর প্রয়াণের মুহূর্তে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর পুরস্কার নয়, তাঁর প্রচার নয়, তাঁর ছবির সংখ্যা নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি চলে যাওয়ার পর তাঁর শিল্প আমাদের ভিতরে কতক্ষণ বেঁচে থাকে। বিভা সেনগুপ্তের ক্ষেত্রে সেই উত্তরটি সহজেই অনুমান করা যায়। রবীন্দ্রনাথের কোনও গান যখন তাঁর কণ্ঠের স্মৃতি নিয়ে আবার বাজবে, যখন দেবব্রত বিশ্বাসের গানের কোনও স্বরভঙ্গির মধ্যে তাঁর শিক্ষার প্রতিধ্বনি শোনা যাবে, যখন তাঁর ছাত্রছাত্রীরা তাঁর শেখানো কোনও গান গাইবেন—তখন বিভা সেনগুপ্তও সেখানে থাকবেন।
আজ তাঁর কণ্ঠ থেমে গেল। কিন্তু গান থামল না।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “তবু মনে রেখো”—এই অনুরোধ যেন আজ বিভা সেনগুপ্তের জন্যই প্রযোজ্য। তাঁকে মনে রাখার সবচেয়ে সুন্দর উপায় তাঁর ছবি সংরক্ষণ করা নয়, তাঁর নাম উচ্চারণ করা নয়; তাঁর গাওয়া গান মন দিয়ে শোনা। কারণ ,তিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনের সাধনায় আমাদের কাছে রেখে গেলেন একটি বিশ্বাস—সত্যিকারের গান কখনও বৃদ্ধ হয় না, শিল্পীর শরীর চলে যায়, কিন্তু তার কণ্ঠ মানুষের স্মৃতির ভিতরে থেকে যায়।
বিভা সেনগুপ্ত চলে গেলেন। তাঁর সঙ্গে চলে গেল একটি দীর্ঘ সময়ের জীবন্ত স্মৃতি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান, দেবব্রত বিশ্বাসের শিক্ষার উত্তরাধিকার এবং সেই গানের ভিতর দিয়ে তৈরি হওয়া তাঁর নিজস্ব শিল্পভাষা—এসবের মধ্যে তিনি থেকে যাবেন।

Comments :0

Login to leave a comment