Dr Randall Sequeira Niyamgiri Hills

নিয়ম দেবতার দেশে একটি গ্রেপ্তারি এবং এক অসম লড়াইয়ের আহ্বান

জাতীয় স্পটলাইট

বাসব বসাক

গত এক দশক ধ’রে ওডিশার কালাহান্ডি আর রায়গাড়া জেলার জঙ্গলময় পাহাড়ি প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে নিজের এনফিল্ড মোটরসাইকেলে সওয়ার হয়ে ঘুরে ঘুরে হতদরিদ্র প্রান্তিক আদিবাসী মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছিলেন ৩৯ বছরের তরুণ চিকিৎসক রান্ডাল সেকুইয়েরা। আদিবাসীদের চোখে দেবতুল্য সেই ডাক্তারকে ষষ্ঠীর রাত এগারোটায় তাঁর বাড়ি থেকে কোনও পরোয়ানা ছাড়া, এমনকি কোনও লিখিত অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় ওডিশার ভবানীপাটনা থানার জনা ছয়েক পুলিশ কর্মী। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় নিয়মগিরি-সিজমালি পাহাড় বাঁচানোর লড়াইয়ের নেতা লক্ষণ নায়েককেও। ডাঃ সিকুইয়েরার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি নাকি আদিবাসী জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষদের নিয়মগিরি-সিজমালি খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম উসকানিদাতা। তিনিই নাকি খেপিয়ে তুলেছেন আদিবাসীদের। আসলে সরকার যখন কর্পোরেটের হাতের পুতুলে পরিণত হয়, তখন প্রকৃতি-পরিবেশ-জীববৈচিত্র-জল-জমি-জঙ্গল রক্ষার যাবতীয় দাবিকে দমন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। কর্পোরেট সংস্থার হাতে আদিবাসী জনজাতি গোষ্ঠীর বাসভূমি নিয়মগিরি ও সিজমালির মতো পাহাড়ের জঙ্গল সাফ ক’রে, জীববৈচিত্র ধ্বংস ক’রে, বক্সাইট লুটের অধিকার সঁপে দিতে হাত কাঁপে না সরকারের।

গ্রেপ্তারির প্রেক্ষাপট...

ওডিশার কালাহান্ডি আর রায়গাড়া জেলা জুড়ে পূর্বঘাট পর্বতমালার প্রসারিত অংশটি নিয়মগিরি পাহাড়। ৭০০ থেকে ১৪০০ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট নিয়মগিরির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নিয়মডোঙ্গার উচ্চতা ১৫১৫ মিটার বা ৪৯৭০ ফুট। নিয়মগিরির শরীর জুড়ে বনানীর মায়া। এর উত্তর- পশ্চিম প্রান্‌তে করলাঘাট অভয়ারণ্য এবং উত্তর-পশ্চিমে কোটগড় অভয়ারণ্য। শাল, মহুয়া, কেন্দু, আম, জাম, ধাওয়া বা ধাওড়ার মতো বড় গাছের পাশাপাশি উলট চণ্ডাল, তেজপাতা, সর্পগন্ধার মতো বিরল গুল্মের সম্ভার ছড়িয়ে আছে পাহাড়ময়। শাল-মহুয়া-ধাওড়ার বনবিথী ছায়া ঘেরা নিয়মগিরির পাহাড়ি পথে নিয়ত বুনো হাতিদের নিশ্চিন্ত চলাচল; চিতল হরিণ অথবা শিংহীন খুদে হরিণ বা পিসৌরার লাফালাফি। ডালে ডালে বাঁদর আর অতিকায় কাঠবিড়ালির ছুটোছুটি। উড়ন্ত কাঠবেড়ালি, বুনো শুয়োর, হায়েনা, নাক আর বুকে সাদা দাগওয়ালা কালো ভাল্লুক, চিতাবাঘ এমনকি রয়েল বেঙ্গল টাইগারেরও আবাসভূমি এই পাহাড়। পাখি, উভচর অথবা নানা ধরনের গিরগিটি থেকে সবুজরঙা লাউডগা সমেত আরও কত যে সরীসৃপের বাস এই নিয়মগিরি পাহাড় তার ইয়ত্তা নেই। যুগ যুগ ধরে এই পাহাড়, বন আর বৈচিত্রময় জীবজগতের সঙ্গে পরম আত্মীয়তার বন্ধনে জড়িয়ে আছে ডোঙ্গারিয়া-কোন্ড জনজাতি গোষ্ঠীর হাজার আষ্টেক মানুষ। বংশ পরম্পরায় এরা পড়ু চাষ বা পাহাড়ের ঢালে জায়গা বদলে বদলে চাষাবাদ ক’রে আর জঙ্গল থেকে এটা-ওটা সংগ্রহ ক’রে জীবন নির্বাহ ক’রে চলেছে। এই ডোঙ্গারিয়া-কোন্ড জনজাতির পূর্ব পুরুষরা আর্য, এমন কি দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীরও বহু কাল আগে, আজ থেকে অন্তত চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার বছর আগে ভারত সহ পূর্ব এশিয়ায় বসতি স্থাপন করেছিল। সন্দেহ নেই, এরাই ভারতের অন্যতম আদি বাসিন্দা। এদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মাচরণ সমস্ত কিছুই ভীষণ ভাবে প্রকৃতি কেন্দ্রিক। এদের আরাধ্য দেবতা হলো নিয়মগিরি পাহাড় - নিয়ম রাজা বা নিয়ম পেনু আর ধরণী পেনু। প্রোটো-অস্ট্রালয়েড গোষ্ঠীর এই আদিবাসীরা আজও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে তারা নিয়ম রাজার বংশধর। তাই নিয়মগিরিকে তারা বুক দিয়ে আগলে রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সেই কারণে এই বিশেষ জনজাতি গোষ্ঠীটি সুনির্দিষ্টভাবে সংবেদনশীল জনজাতি গোষ্ঠীগুলির (Particularly Vulnerable Tribal Group) মধ্যে অন্যতম। 
কিন্তু যে পাহাড়কে তাঁরা দেবতা মানেন, যে পাহাড় জীববৈচিত্র্ সদা প্রাণোচ্ছল, সেই নিয়মগিরি পাহাড়ের বুকে লুকিয়ে থাকা মহার্ঘ বক্সাইটের অপর্যাপ্ত ভাণ্ডারের দিকে নজর পড়তেই মুনাফা লোলুপ কর্পোরেটদের চোখ চকচক ক’রে উঠল।  স্টারলাইট ইন্ডাস্ট্রিজের শাখা ভেদান্ত অ্যালুমিনিয়ম কোম্পানি ২০০৩ সালের ৭ই জুন ওডিশা সরকারের সঙ্গে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে নিয়মগিরি পাহাড় খননের জন্য ওডিশা খনি কর্পোরেশনের থেকে পাহাড়ের প্রায় ৬৭০ হেক্টর বনভূমি ধ্বংসের ইজারা পেল ২০০৪ এর অক্টোবরে। ঘোষণা হল ৪০০০ কোটি টাকার বক্সাইট খনি প্রকল্প।  খুব দ্রুততার সঙ্গে পরিবেশ অভিঘাত মূল্যায়ন রিপোর্ট সম্পন্ন করল টাটা-এআইজি। নিয়মগিরি পাহাড়ে মজুত বক্সাইটের পরিমাণ জানা গেল কম ক’রে ৭ কোটি ৩০ লক্ষ টন, যা তোলা যাবে টানা ২৩ বছর ধরে। অর্থাৎ বিনিয়োগের ৪০০০ কোটির কয়েকগুণ উঠে আসবে খুব সহজেই। নিয়ম রাজার রাজ্যে এই অনাচার সেদিন অবশ্য মানেনি নিজেদের নিয়ম দেবতার বংশধর ভাবা ডোঙ্গারিয়া-কোন্ড জনজাতির মানুষগুলি। একদিকে গড়ে তুলেছে দুর্বার প্রতিরোধ, অন্যদিকে লড়াই চলেছে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত। তফসিলি জনজাতিগোষ্ঠীর মানুষের জন্য বিশেষায়িত সংবিধানের পঞ্চম তফসিলের ২৪৪(১) উপধারার উল্লেখ ক’রে মহামান্য আদালত শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালের এপ্রিলে এক ঐতিহাসিক রায়ে নিয়মগিরির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ভার অর্পণ করেন স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষের ওপরেই। আদালতের নির্দেশে খনি প্রকল্প রূপায়ণের পূর্ব শর্ত হিসাবে স্থানীয় মানুষদের নিয়ে যে বারোটি গ্রাম সভার আয়োজন করতে হয়েছিল সেদিন ওডিশা সরকারকে, তার প্রত্যেকটিই দ্ব্যর্থহীন ও স্পষ্ট ভাষায় অরণ্য নিধনের বিরুদ্ধে মতো দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হয় সরকারকে। ২০১৪ সালে তদানীন্তন ওডিশা সরকার ভেদান্তের বক্সাইট খনি প্রকল্পটি বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

যখন বিজেপি সরকার...

ওডিশায় বিজেপি সরকার গড়ার পর থেকেই নতুন ক’রে উৎসাহিত হয়ে ওঠে কর্পোরেট সংস্থাগুলো। গত এপ্রিল, ২০২৬-এ ওই নিয়মগিরি সংলগ্ন যে পাহাড় জুড়ে আছে অন্তত দু’শোটি ছোট বড় জলধারা, যে পাহাড় হাতিদের নিশ্চিন্ত যাতায়াতের করিডর, যে পাহাড় যুগ যুগ ধ’রে ঝরনিয়া-কোন্ড জনজাতির মানুষের বাসভূমি; সেই সিজমালি পাহাড় লাগোয়া জঙ্গল সাফ ক’রে ওই ভেদান্তকেই উপঢৌকন দেয় বিজেপি সরকার নতুন ক’রে বক্সাইট খনি স্থাপনের জন্য। এই সিজমালি পাহাড়ে সঞ্চিত আছে ৩ কোটি ১১ লক্ষ টন বক্সাইট; যা বছরে ৯০ লক্ষ টন করে টানা ৫০ বছর ধরে তুলতে পারবে ভেদান্ত। স্বভাবতই ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ মানুষ। বিশেষত এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে নতুন করে নিয়মগিরি সুরক্ষা সমিতির মতো সংগঠনের নেতৃত্বে যখন মানুষ আবার আন্দোলনে পথে নেমেছে, সেই সময় গত ৮ ডিসেম্বর, ২০২৩ এ হওয়া প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জনশুনানির নামে সরকারের চরম অসততা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে জনজাতি মানুষের মধ্যে। জানা যায় ২০২৩-র ওই গণশুনানিতে মৃত মানুষ, অনুপস্থিত মানুষ এমন কি দুধের শিশুদের নামেও অন্যায়ভাবে জাল সই করা হয়েছে প্রকল্পের পক্ষে ছাড়পত্র আদায় করতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সম্প্রতি অনেকটা একই রকম ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটতে দেখা গেল আমাদের রাজ্যেও। গত ২৮ অক্টোবর পুরুলিয়ায় শাকম্ভরী ইস্পাত অ্যা ন্ড পাওয়ার লিমিটেডের প্রস্তাবিত কারখানার জন্য জন শুনানিকে কি ভাবে খোদ মহকুমা শাসকের উদ্যোগে প্রহসনে পরিণত করা হলো তা দেখলাম আমরা। 
কর্পোরেটদের হাতে যেনতেন প্রকারেণ পাহাড়-জঙ্গল-জল-জমি তুলে দিতে সরকারের এত তাড়া আমাদের আশ্চর্য করে বৈ কি! এরই মধ্যে পুলিশ দিয়ে এলাকা ঘিরে গত ৭ এপ্রিল সিজমালি পাহাড়ের চুড়োর সঙ্গে রাজ্য সড়ককে যুক্ত করতে গ্রিনফিল্ড রোড নির্মাণের কাজ শুরু হতেই আগুনে ঘৃতাহুতি ঘটে যায়। ডোঙ্গরিয়া-কোন্দ জনজাতির আদিবাসী মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। কণ্ঠমাল গ্রামের কাছে পুলিশের বিরুদ্ধেই তারা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সংক্ষুব্ধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে যথেচ্ছ লাঠি, টিয়ার গ্যাস এমনকি গুলিও চালায় পুলিশ। আহত হয় অনেকেই। সেই ঘটনায় তখনই গ্রেপ্তার হয় জনা চল্লিশেক আদিবাসী মানুষ। পরে গত ১০ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয় নিয়মগিরি সুরক্ষা সমিতির সভাপতি ডোঙ্গরিয়া-কোন্ড জনজাতির নেতা লাডা সিকাকাকে। শুধু গ্রেপ্তারই নয় কর্পোরেট-বন্ধু সরকার এই আদিবাসী নেতার বিরুদ্ধে লাগু করে ইউএপিএ বা বেআইনি কার্যক্রম প্রতিরোধ আইনের মতো কালা কানুন।  আরও অদ্ভুত ব্যাপার হলো তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় ২০১২ সালে নিয়মগিরি রক্ষার আন্দোলনের সময়কার একটি মামলার ভিত্তিতে। আন্দোলন দমন করতে তার বিরুদ্ধে আরও অন্তত ডজন খানেক ধারায় মামলা ঋজু করা হয়। এর মধ্যে গত ২৬ সেপ্টেম্বর ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি ও ভেদান্তের লন্ডন নিবাসী কর্ণধার অনিল আগরওয়ালের মধ্যে সিজমালির পাশাপাশি নিয়মগিরি পাহাড়েও খনি সম্প্রসারণের বিষয় নিয়ে আলোচনার অগ্রগতির খবরকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের পারদ চড়তে শুরু করে। এর ঠিক আগে, গত ২৮ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয় সিজমালি প্রকল্প বিরোধী আন্দোলনের আর এক নেতা হীরামল নায়েককে। এখনো পর্যন্ত সর্বশেষ গ্রেপ্তার রান্ডাল সিকুইয়েরা। ডা সিকুইয়েরার বাড়ির লোক, এমনকি তাঁর আইনজীবীকেও জানানো হয় নি ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে। পরদিন সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ বাড়িতে সরকারিভাবে জানানো হয় তাঁর গ্রেপ্তারির কথা। লক্ষণ নায়েকের বাড়িতে খবরটুকু পর্যন্ত দেয় না পুলিশ।  মহকুমা আদালতে তাঁদের তোলা হয় সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায়, যদিও ১৬ তারিখ রাতের কথা অনুল্লেখিতই থাকে। আপাতত জেল হেপাজতে আছেন গরিবের চিকিৎসক। ডাঃ সিকুইয়েরার বিরুদ্ধে হাস্যকরভাবে খুনের চেষ্টা, মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা করা, ডাকাতি, সরকারি কর্মচারীকে কাজে বাধাদান সহ মোট আট টি ধারায় মামলা করেছে পুলিশ।

মরিয়া কেন সরকার?

এখন প্রশ্ন হলো আদিবাসীদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন দমন করতে সরকার এতখানি মরিয়া হয়ে উঠছে কেন! প্রকৃতি, পরিবেশ, জনজাতি আদিবাসীর জমির অধিকার– সমস্ত কিছু উপেক্ষা ক’রে কর্পোরেটদের হাতে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের দেদার ছাড়পত্র তুলে দেওয়াকে, আর যাই হোক উন্নয়ন বলে না। অথচ বিজেপি সরকার ঠিক সেই কাজটাই ক’রে চলেছে কর্পোরেট স্বার্থের কাছে নতজানু হয়ে। ২০১৪ থেকে এ পর্যন্ত ভারত সরকার উন্নয়নের দোহাই দিয়ে কর্পোরেট স্বার্থে ১০৭৩০০০ হেক্টর অরণ্য ধ্বংস করেছে, যা কি না আয়তনে মরিশাসের মতো একটা গোটা দেশের সমান। কেবলমাত্র জুলাই, ২০২৩ থেকে মে, ২০২৬– এই তিন বছরে কেটে ফেলা হয়েছে ২৮ লক্ষ গাছ। শুধু ২০২৩-২৪এঐই  ২৯০০০ হেক্টর অরণ্য ভূমির চরিত্র বদল করা হয়েছে। কোথাও আদানি, কোথাও টোরেন্ট, কোথাও ভেদান্ত – কর্পোরেটদের স্বার্থে গ্রেট নিকোবর থেকে মহারাষ্ট্রের কার্জাত তালুক, হাসদেও আরন্দ থেকে অরুণাচলের সিয়াঙ – বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ধ্বংসের অপেক্ষায় প্রহর গুণছে। ভারতের জঙ্গলমহল জুড়ে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে ইলেকট্রিক করাতের নিরবচ্ছিন্ন তীক্ষ্ণ শব্দ। মধ্য প্রদেশের সিঙ্গরৌলি এলাকায় আদানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ধিরৌলি কয়লা ব্লক; যার দরুন কাটা পড়তে চলেছে অন্তত ছ’ লক্ষ গাছ। হাসদেও আরন্দে আদানিদের খনি সম্প্রসারণ প্রকল্পের বলি হয়েছে কয়েক লক্ষ গাছ, উৎখাত হতে হয়েছে এলাকার জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষকে। গত ২৭ মে, ২০২৬ ওই হাসদেও আরন্দেই রাজস্থান বিদ্যুৎ উৎপাদন নিগম লিমিটেডকে কোনো রকম নিয়মবিধির তোয়াক্কা না ক’রেই কেন্তে কয়লা ব্লকের সম্প্রসারণের জন্য সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যবর্তী ১৭৪২.৬ হেক্টর বনভূমি ধ্বংস করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই ভাবে বক্সাইট খননের উদ্দেশ্যে ওডিশায় ভুবনেশ্বর থেকে ৪৫০ কিলোমিটার দূরবর্তী করলাপত অভয়ারণ্যের ৪.৩২ বর্গ কিলোমিটার বনভূমিকে অভয়ারণ্যের সীমার বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই ওই অঞ্চলের একটি বড় বক্সাইট সমৃদ্ধ খণ্ড বেদান্ত কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। মহারাষ্ট্রে ভীমাশঙ্কর সংরক্ষিত বণাঞ্চলেই শুধু টোরেন্ট পাওয়ারের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ধ্বংস হতে চলেছে ১৯৭ হেক্টর অরণ্য ভূমি; কাটা পড়তে চলেছে ৩২৫০০ টি গাছ। একই ভাবে মুম্বাইয়ের কাছে ভারসোবা ও ভায়ান্দর শহর দু’টিকে যুক্ত করতে যে ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা বানানো হচ্ছে সেই রাস্তা বানাতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হ’তে চলছে ১০৩ হেক্টর অরণ্যভূমি, যার বেশির ভাগটাই বাদাবন বা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের জঙ্গল। সমুদ্র উপকূলের সমান্তরালে এই রাস্তা নির্মাণ করতে গিয়ে ওই অঞ্চলের ৬০ হাজার লবনাম্বু উদ্ভিদের মধ্যে কাটা পড়তে চলেছে ৪৫ হাজার উদ্ভিদ। ২০১৪ থেকে যত অরণ্য হত্যা হয়েছে, তার অর্ধেকই হয়েছৈ আদিবাসী অধ্যুষিত মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওডিশা ও অরুণাচল প্রদেশ – মাত্র এই চারটি রাজ্যে। এই বিপুল অরণ্য নিধন যজ্ঞকে আড়াল করতে জাতীয় সবুজ ভারত মিশনের মত গাল ভরা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বটে, তবে তার অগ্রগতি কার্যত শূন্য। এই গ্রিন ইন্ডিয়া মিশনে ভারতের অরণ্য আচ্ছাদন গত দশ বছরে ১৪ লক্ষ হেক্টর বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, কার্যক্ষেত্রে গত দশ বছরে বনায়ন ঘটেছে মাত্র ৩৪৯০০ হেক্টর; অর্থাৎ কিনা লক্ষমাত্রার মাত্র আড়াই শতাংশেরও কম। তাও আবার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থায় গ্রিন ইন্ডিয়া মিশনে বনায়নের জন্য নির্ধারিত অঞ্চলগুলির ৭০ শতংশ জমিতেই কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নজরে আসেনি গবেষকদের। এই ভাবে কর্পোরেটদের হাতে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ভেট দিতে সরকার যত মরিয়া হচ্ছে ততই দেশ জুড়ে তীব্র হচ্ছে জল-জমি-জঙ্গল রক্ষার আন্দোলন। পুলিশি দমন পীড়ন আর মিথ্যা মামলা দিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে আর রোখা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যেই মেডিকো ফ্রেন্ডস সার্কেল সহ একাধিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ডাক্তার সিকুইয়েরার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার আওয়াজ উঠেছে। যারা দেশ বাঁচানোর স্বার্থে, নিকৃষ্ট কর্পোরেট দালালির বিরুদ্ধে, আদিবাসীদের জল-জমি-জঙ্গলের অধিকারের দাবিতে, প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে, দেশের নানা প্রান্তে ডাঃ সিকুইয়েরার মতো আশিরনখ লড়ে যাচ্ছে, সেই সব দেশপ্রেমিকদের কুর্নিশ। তাদের লড়াইয়ের পাশে দাঁড়ানোই আজ সময়ের আহ্বান।

Comments :0

Login to leave a comment