নতুনপাতা
জানা অজানা
বিদ্যাসাগরের জীবনে কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়
তপন কুমার বৈরাগ্য
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে সেপ্টেম্বর।
তিনি ছিলেন জ্ঞানের সমুদ্র।তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়,
বুদ্ধিমান,শ্রুতিধর। প্রত্যেক শিশুর প্রথম জীবন শুরু হয় বাবা,
মা এবং প্রথম শিক্ষকের অনুপ্রেরণায়।বিদ্যাসাগরকে বিদ্যাসাগর
করার পিছনে বাবা মায়ের পর তার প্রথম শিক্ষকমহাশয় কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নাম অবশ্য স্বীকার্য। কালীকান্ত
চট্টোপাধ্যায় ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকেই
একজন সমাজসংস্কারক।তিনি শিক্ষাবিস্তারের জন্য অগ্রণী
ভূমিকা পালন করেন। নিজের জন্মভূমি বীরসিংহ গ্রামে
একটা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটা ছিল মাটির দেওয়াল,খড়ের ছাওনি দেওয়া ঘর।
এইখানে দূরদূরান্ত থেকে ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করতে আসতো।
যে যা দিতো তিনি তাতেই সন্তুষ্ট থাকতেন।কতো গরিব ছেলেমেয়েদের তিনি বিনা পয়সায় পড়াতেন। তখন ওই অঞ্চলের
প্রতিটা ছেলেমেয়েই তার হাতে মানুষ হয়েছিল।।বিদ্যাসাগরের বয়েস তখন চারবছর পাঁচমাস।মা ভগবতীদেবী এবং পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় একগুঁয়ে ছেলের দ্বারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। কিছুতেই ওইটুকু বাচ্চাকে বাগে আনতে পারছেন না। অনেক ভেবেচিন্তে তারা ঠিক করলেন কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালায় তাকে ভর্তি করে দেবেন।একদিন ঠাকুরদাস
ছোট্ট বিদ্যাসাগরকে কালীকান্তবাবুর পাঠশালায় নিয়ে এলেন।
কালীকান্তবাবু ঠাকুরদাসের বন্ধু ছিলেন। ঠাকুরদাস কালীকান্তবাবুকেকে বললেন---আমার এই দূরন্ত ছেলেকে আপনাকে মানুষ করে দিতে হবে।
কালীকান্তবাবু ঈশ্বরকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বললেন-- এই
ছেলে পৃথিবীর একজন অদ্বিতীয় পুরুষ হবে।কালীকান্তের
ভবিষ্যৎবাণী বিদ্যাসাগরের জীবনে পুরোপুরি সফল হয়েছিল।
কালীকান্তবাবু সেদিন বিদ্যাসাগরকে অ,আ,ই,ঈ লিখতে দিলেন।
বিদ্যাসাগর সেদিন একবার দেখার সাথে সাথেই অ,আ,ই,ঈ
লিখে ফেললেন। এরপর ক, খ,লিখতে দিলেন।এবারও তিনি
বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন।তার চোখে ঈশ্বর সত্যিই এক
বিস্ময় বালক।কালীকান্তবাবু সেদিন তার মাথায় হাত দিয়ে
আশীর্বাদ করে বলেছিলেন--সত্যিই তুই একদিন বিদ্যাসাগর হ'বি।
সালটা ছিল ১৮২৫।ঈশ্বরচন্দ্র এই বিদ্যালয়ে আটবছর বয়েস
পর্যন্ত শিক্ষালাভ করেছিলেন।কালীকান্তবাবু একদিন ঈশ্বরের
বাবাকে বললেন--আমার কাছে আর কিছু নেই যে আপনার
ছেলেকে আমি শিক্ষা দেবো।ওকে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায়
নিয়ে চলুন।এখানে ওর আর শিক্ষালাভের কিছুই অবশিষ্ট নেই।
ঠাকুরদাস কালীকান্তবাবুকে বললেন-- আপনাকেও আমার
সাথে যেতে হবে। কালীকান্তবাবু ঈশ্বরের জন্য সবকিছু করতেই
রাজি।তাই ২৬ক্রোশ দূরে ঈশ্বরচন্দ্র,ঠাকুরদাস এবং কালীকান্তবাবু
পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করলেন।এই যাবার পথেই মাইলস্টোনের
মধ্যে লিখে রাখা ইংরেজি এক থেকে দশ পর্যন্ত সংখ্যাগুলো
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শিখে নিয়েছিলেন।কালীকান্তবাবু ছিলেন
একজন কুলীন ব্রাহ্মণ।এই মহান শিক্ষককে বিদ্যাসাগর কোনদিন
ভুলেন নি।তাই বিদ্যাসাগর তার বিভিন্ন রচনায় কালীকান্তবাবুর
স্মৃতিচারণ করেছেন। কালীকান্তবাবু এক দূরন্ত ছেলেকে তার
স্নেহের পরশে অনায়াসে অনুগত করতে পেরেছিলেন।এখানেই
কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের সার্থকতা।
Comments :0