NATUNPATA | MONDA MITHI | GANDHIJI BAPU | SOUMAYDIP JANA | 4 OCTOBER 2026 | 4th YEAR

নতুনপাতা | মণ্ডা মিঠাই | মনুষ্যত্বের অবক্ষয়ের প্রতিরোধে বর্তমান সময় বাপুর প্রাসঙ্গিকতা | সৌম্যদীপ জানা | ৪ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

NATUNPATA  MONDA MITHI  GANDHIJI BAPU  SOUMAYDIP JANA  4 OCTOBER 2026  4th YEAR

নতুনপাতা

মণ্ডা মিঠাই

মনুষ্যত্বের অবক্ষয়ের প্রতিরোধে বর্তমান সময় বাপুর প্রাসঙ্গিকতা

সৌম্যদীপ জানা

৪ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ 

মানবসভ্যতার ইতিহাস যত দীর্ঘ হয়েছে, মানুষের হাতে যেমন জ্ঞানের প্রদীপ জ্বলেছে, তেমনই তার ছায়ায় জন্ম নিয়েছে যুদ্ধ, হিংসা, শোষণ ও ক্ষমতার উন্মত্ততা। একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবী বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতিতে মহাকাশের অন্ধকার ভেদ করতে পেরেছে, অথচ মানুষের অন্তরের অন্ধকারকে এখনও সম্পূর্ণ পরাজিত করতে পারেনি। পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধের অভিঘাত, সাধারণ মানুষের দুর্দশা, সামাজিক বৈষম্য, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার বিস্তার আমাদের বারবার সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি কি কেবল প্রযুক্তির, নাকি মানুষের হৃদয়েরও? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আজও ফিরে আসতে হয় এক শতাব্দী পূর্বের এক ক্ষীণদেহী অথচ প্রবল নৈতিক শক্তির অধিকারী মানুষের কাছে—মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, আমাদের সকলের প্রিয় বাপুর কাছে।

১৮৬৯ সালের ২ অক্টোবর গুজরাটের পোরবন্দরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। পরবর্তীকালে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা এবং বিশ্ব ইতিহাসে অহিংস প্রতিরোধের এক অনন্য প্রতীক। কিন্তু বাপুকে কেবল স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অত্যন্ত সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ করা হয়। তাঁর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক মুক্তির স্বপ্ন দেখা।

বাপুর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘সত্য’ ও ‘অহিংসা’। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর সত্যাগ্রহের ধারণার বিকাশ। ১৯০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় এশিয়াটিক রেজিস্ট্রেশন আইনের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তার মধ্য দিয়ে সত্যাগ্রহ একটি সুসংবদ্ধ রাজনৈতিক পদ্ধতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরে ভারতে চম্পারণ সত্যাগ্রহ (১৯১৭), খেদা সত্যাগ্রহ (১৯১৮), অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০), লবণ সত্যাগ্রহ ও আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০) এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২)-এর মতো আন্দোলনের সঙ্গে বাপুর নেতৃত্ব গভীরভাবে যুক্ত হয়। তাঁর কাছে স্বাধীনতা কেবল বিদেশি শাসকের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া ছিল না; স্বাধীনতা ছিল আত্মমর্যাদা, ন্যায়, সত্য এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠারও নাম।

বাপুর অহিংসা তাই নিছক নিষ্ক্রিয়তা ছিল না। অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা তাঁর আদর্শ নয়। সত্যাগ্রহের মাধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, অথচ প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই সেই প্রতিরোধের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে না। তাঁর দর্শনের নৈতিক ভিত্তি ছিল—অন্যায়ের বিরোধিতা করতে গিয়ে যেন মানুষ নিজেই অন্যায়ের প্রতিমূর্তি হয়ে না ওঠে।

বাপুর মানবতাবাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সমাজের প্রান্তিক মানুষের প্রতি তাঁর গভীর মনোযোগ। অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম, গ্রামকেন্দ্রিক সমাজভাবনা, স্বনির্ভরতার উপর জোর, চরকা ও খাদির প্রসার এবং সর্বসাধারণের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। যদিও বাপুর বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক মত নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে এবং তাঁর চিন্তার সবকটি দিককে সমকালীন সমাজের সঙ্গে অপরিবর্তিতভাবে প্রয়োগ করা যায় না, তবুও মানুষের মর্যাদা ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান আজও আলোচনার দাবি রাখে।

আজকের পৃথিবীতে বাপুর প্রাসঙ্গিকতা এখানেই। যুদ্ধের আগুন কেবল সীমান্তে জ্বলে না; তার উত্তাপ পৌঁছে যায় ঘরহারা মানুষ, শিশু, শ্রমজীবী পরিবার এবং সাধারণ নাগরিকের জীবনে। সামাজিক জীবনে যখন মতের অমিল ক্রমশ শত্রুতায় পরিণত হয়, তখন বাপুর সত্যাগ্রহ আমাদের শেখায়—মতের বিরোধিতা ও মানুষের প্রতি বিদ্বেষ এক বিষয় নয়। গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে নয়, বরং ভিন্নমতকে সহ্য করার নৈতিক ক্ষমতার মধ্যে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাপুর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এই—মানুষকে জয় করার চেয়ে মানুষের প্রতি মানবিক থাকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু নৈতিকতার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। প্রযুক্তি আমাদের হাতে অসীম ক্ষমতা তুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ব্যবহারকে মানবিক করে তুলতে পারে কেবল বিবেক।

তাই ২ অক্টোবর কেবল একটি জন্মদিনের স্মরণ নয়; এটি আত্মসমীক্ষারও দিন। আমরা কী ধরনের পৃথিবী নির্মাণ করতে চাই—অস্ত্রের শক্তিতে ভীত পৃথিবী, নাকি সত্য, সহিষ্ণুতা ও মানবমর্যাদার উপর দাঁড়ানো পৃথিবী? বাপু হয়তো আমাদের হয়ে সেই সিদ্ধান্ত নেননি; বরং তিনি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটি নৈতিক প্রশ্ন। সেই প্রশ্ন আজও অনুরণিত—মানুষ কি সত্যিই সভ্য হবে, যদি তার হৃদয়ে মানবতা না থাকে?

মনুষ্যত্বের অবক্ষয়ের এই সন্ধিক্ষণে বাপু তাই অতীতের কোনো জাদুঘরবন্দি প্রতিকৃতি নন। তিনি এক চলমান প্রশ্ন, এক নৈতিক আহ্বান—মানুষের বিরুদ্ধে নয়, মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান। তাঁর উত্তরাধিকারকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করার অর্থ তাঁর প্রতিকৃতি বহন করা নয়; বরং নিজের আচরণে সত্য, অহিংসা, সহমর্মিতা ও মানবমর্যাদার মূল্যকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা। কারণ পৃথিবীকে বদলানোর আগে মানুষের অন্তরকে বদলানোর যে প্রয়োজন, বাপুর জীবন সেই চিরন্তন সত্যটিরই এক দীর্ঘ, অসমাপ্ত পাঠ।
        

Comments :0

Login to leave a comment