নতুনপাতা
গল্প
প্যাঁচা
সৌরীশ মিশ্র
৩ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
"আঁকছিস, বাঃ ভালো। কুম্ভকর্ণ যে চান্স পেয়েও ঘুমোয় নি আজ, দেখে ভালো লাগছে।" নিজের ঘরে পা রেখেই বাবাইকে কথাকটা বলল ওর মামাতো দিদি মাম।
মামের ঘরের বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আঁকছিল বাবাই। আজ শনিবার। এখন বিকেলবেলা। দুপুরে এসেছে মামাবাড়িতে বাবাই। ওর বাবা-ই পৌঁছে দিয়ে গেছেন ওকে। আজ থাকবে বাবাই এখানে। কাল সন্ধ্যেবেলা ফের ওর বাবা এসে নিয়ে যাবেন ওকে বাড়ি।
বাবাই যখন দুপুরে এল তখন তো মাম কলেজে। বাড়িতে মামা ছিল, মামি ছিল, তবু ওর মামদিদি না থাকলে কেন যেন কিছুই ভালো লাগেনা ওর এই বাড়িতে। কেমন যেন খালি-খালি লাগে গোটা বাড়িটাই! মামদিদি যে বাবাই-এর খুউব খুউব প্রিয়। তাই, মামকে দেখেই বাবাই এক গাল হেসে বলল, "এসে গেছো মামদিদি!"
"এই কারণেই তোর উপর রাগ হয় জানিস! এমন গাধার মতোন মাঝে-মাঝে কথা বলিস না! তোর কি মনে হচ্ছে, আমি এখনো আসি নি বাড়িতে? যত বড় হচ্ছিস তত কোথায় স্মার্ট হবি, না হচ্ছিস ঠিক উল্টো!" কাঁধের ঢাউস ব্যাগটা টেবিলে রাখতে-রাখতে বলল মাম।
ওর মামদিদির কাছ থেকে এই ধরনের মন্তব্য শুনতে অভ্যস্ত বাবাই। বাবাই ভালোই জানে, মামদিদি ওকে ভীষণ ভালোবাসে। সে ছোটো এখনও, তবু সে এইটুকু বোঝে, এই সব কথার মধ্যে মামদিদির ওর প্রতি আদর মেশানো থাকে।
"কি রে রাগ করলি আমার কথায়?" বিছানায় বাবাই-এর পাশটায় বসতে-বসতে বলল মাম।
"না, না, রাগ করবো কেন! তুমি তো ওসব কথা মজা করে বলো।" বলে বাবাই।
"বা-বা, বুঝতে পেরে গেছিস এ কথা! তা, কি আঁকছিস, দেখি?" বলে মাম।
ড্রইং খাতাটা মামের দিকে এগিয়ে দেয় বাবাই। দিতে দিতেই, বলতে থাকে, " প্যাঁচার ছবি আঁকছি, মামদিদি?"
"হঠাৎ প্যাঁচা?" না শুধিয়ে পারে না মাম।
"আরে, কি হয়েছে পরশুদিন তুমি জানো না মামদিদি, শোনো তবে," বলে গোল-গোল চোখ দুটো করে মাম-কে বলে চলল বাবাই, "ওদিন তো সকাল থেকেই বৃষ্টি। সন্ধ্যেবেলা, আমি পড়তে বসতে যাবো, মা বলল, বাবাই, চল্ তো ছাদে। জামাকাপড় কটা আছে তুলব। সেই সকালে স্নান করে মেলেছিলাম, ভেবেছিলাম বৃষ্টি ধরবে বোধহয়। তা তো ধরলো না। এদিকে মনেও ছিল না আমার যে ওগুলো ছাদে মেলা আছে। চল্, ওগুলো তুলবো।
আমি সাথে সাথেই বললাম, চলো মা, আমি আর তুমি একসঙ্গে তুললে ঝটপট তোলা হয় যাবে ওগুলো। চলো।
মা বলল, না, না, তোকে জামাকাপড় তুলতে হবে না।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তবে!
মা বলল, তুই দরজার সামনে থাকবি।
আমি জিজ্ঞেস করি, কেন?
মা তখন বলল, সন্ধ্যে হয়ে গেছে। ছাদে তো আমি কাপড় তুলবো, এদিকে আবার যদি বাদুর ঢুকে যায় ঘরে সেইদিনের মতো, তখন ফের মুশকিল হবে। তাই, তুই দরজার মুখটায় দাঁড়াবি, বাদুর-চামচিকে ওসব আসছে দেখলেই ঝটপট দরজা বন্ধ করে দিবি। দরজাটা যে ছাদ থেকে ভেজিয়ে দেবো, তারও উপায় নেই। যা হাওয়া দিচ্ছে। তার সাথে আবার বৃষ্টির জলে ভিজে-ভিজে ছাদের দরজার কাঠটাও বেড়ে গিয়ে যা টাইট হয়ে গেছে, একবার বেকায়দায় আটকে গেলে ছাদ থেকে খোলাই মুশকিল। তাই তোকে নিয়ে যাচ্ছি, বুঝলি? চল্ এবার।"
একমনে ছোট্ট ভাইটার কথা শুনছিল মাম। ও এটা আগেও লক্ষ্য করেছে, গুছিয়ে গল্প বলতে ওস্তাদ ওর ভাইটা। বেশ লাগছিল ওর গল্পটা শুনতে, কিন্তু একটা কথা মাথায় আসতেই বাবাইকে ওর কথার মধ্যিখানেই বলে উঠলো সে। "স্যরি, তোকে ইন্টারাপ্ট করছি। তা হঠাৎ, এর মধ্যে বাদুর, চামচিকে এসব আসছে কোথা থেকে?"
"ও, তুমি তো এটাও জানো না মামদিদি, তোমাকে বলতে একদম ভুলে গেছি গো, এর আগের সপ্তাহে একদিন সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ একটা বাদুর ঢুকে পড়েছিল আমাদের বাড়ি। তারপর শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে ওটা এঘর থেকে সেঘর। তারপর বাবা কতো কষ্ট করে জানলা-দরজা সব খুলে-টুলে দিয়ে, ওটাকে বের করলো বাড়ি থেকে।" রীতিমত উত্তেজিত হয়ে বলল কথাকটা বাবাই।
"ও, এইবার বুঝলাম। নে, তোর গল্প কন্টিনিউ কর্ আবার।" বলল মাম।
"হ্যাঁ। তা আমি তো মায়ের সাথে গেলাম। তখনও বৃষ্টি হচ্ছে। মা ছাদে একটা ছাতা নিয়ে জামাকাপড় তুলছে। আর আমি ছাদের দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছি। ছাদের উপর দিয়ে একটু বাদে বাদেই বাদুর না চামচিকে কি জানে সব একটা দুটো উড়ে-উড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ দেখি, আমাদের বাড়ির সামনের ঝাঁকড়া নিমগাছটার উপর দিয়ে কি একটা বড় মতোন উড়ে আসছে আমাদের ছাদের উপর দিয়ে। ইয়া বড় তার ডানা দুটো। প্রথমে তো আমি ভেবেছি, বড় সাইজ়ের কাক। তারপর যখন আর একটু কাছে এলো, দেখলাম, না, এতো কাক নয়, ডানাগুলোর ধারগুলো কেমন যেন খাঁজকাটা, খাঁজকাটা। মুখটাও গোল মতোন। তখনই, মাথায় এলো, আরে এটা তো প্যাঁচা। আমি তো তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করতে যাবো যাতে ওটা আবার ঘরে না ঢুকে পরে, দেখি, তার আগেই ওটা ডানা ঝাপটে স্পিডে চলে গেল আমাদের চিলেকোঠার উপর দিয়ে কোথায় যেন!
ঐ প্যাঁচাটা যেমন ভাবে আমার সামনে উড়ে আসছিল সেই ছবিটাই আঁকছিলাম গো। কেমন হচ্ছে মামদিদি ড্রইংটা?" টানা বলে থামে এইবার বাবাই।
মামের হাতে ধরা ড্রইং খাতাটা। সে ওতে আরো একবার চোখ বুলিয়ে বলল, "ছবিটা ভালোই এঁকেছিস। স্পেশালি, প্যাঁচার মুখটা অলমোস্ট এগ্স্যাক্ট্ হয়েছে।"
"তাই!" বলে খাতাখানা মামের হাত থেকে নেয় বাবাই। ফের ভালো করে দেখতে থাকে প্যাঁচার মুখটা কেমন এঁকেছে ও। তাই দেখে মাম এইবার বলে ওঠে, "তুই বুঝবি না। না, না, স্যরি, বুঝবি, বুঝবি। খাতাটা নিয়ে একবার আয়নার সামনে গিয়ে তাকা, তাহলেই বুঝবি।" আর কথাটা বলেই হেসে ফেলে সে।
বাবাই ছোটো, তবে ভালোই ইন্টেলিজেন্ট সে। ওর বুঝতে বাকি রইল না, কি বলতে চাইছে তার মামদিদি। সে-ও ফিক্ করে হেসে বলল, "ধ্যাত্, কি যে বলো না তুমি মামদিদি!"
Comments :0