Post Editorial

শিল্পায়ন ও উন্নয়নের উলটো পথে সরকার

সম্পাদকীয় বিভাগ

অসীমেশ গোস্বামী
পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক বিকাশ পাট শিল্পকে বাদ দিয়ে হয় না। কয়েক লক্ষ পাটচাষি ও শ্রমিক যেমন জড়িয়ে আছে তেমনি উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে ভারত সরকার বিদেশি মুদ্রা অর্জন করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্প হয় সঙ্কট নয় অতি সঙ্কটে ভোগে। ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে পাটের পণ্য আমদানি করায় অনেক মিল বন্ধ অথবা রাতের শিফ্ট বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে কাজ হারাচ্ছে শ্রমিক। পাট চাষিরা পাটের লাভজনক দাম না পেয়ে পাট চাষ ছেড়ে ভুট্টা, তিল ইত্যাদি অন্যান্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। গত এক দশকে পাট চাষের জমি কমেছে ১ লক্ষ ৭০ হাজার হেক্টর। আবার চড়া দামে পাট কিনতে না পেরে চটকলগুলি দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে কাজ করছে কালোবাজারি। চাষিকে ঠকিয়ে কম দামে কিনে অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধ গুদামে কাঁচা পাট রেখে কৃত্রিম উপায়ে দাম বাড়াচ্ছে। প্রতি বছরে পাটের বস্তা জোগানে ঘাটতি হচ্ছে ২৫-৩০ শতাংশ যা খেয়ে নিচ্ছে প্লাস্টিক থলে। ক্ষতি হচ্ছে পাট চাষিদের, শ্রমিকদের, সরকার ও অন্যান্যদের।
দেশের বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী রাজ্য আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গ। জাতীয় উৎপাদনের ৭৫ শতাংশ এই রাজ্য থেকে আসে। পাটশিল্প থেকে বছরে টাকার অঙ্কে আয় কুড়ি হাজার কোটি টাকা। হেসিয়ান, বস্তা এবং অন্যান্য পণ্য থেকে রাজস্ব আদায় হয় বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাপী পাটের পণ্য নজর কেড়েছে কারণ, এটা পরিবেশ বান্ধব, প্লাস্টিক যা নয়। বস্তা থেকে প্যাকেজিং ও অন্যান্য পাটপণ্য ব্যবহার আজ দেশে বিদেশে একটি ফ্যাশন। কিন্তু পাটশিল্পকে আরও উন্নত না করতে পারলে সবার ক্ষতি। রক্ষা ও উন্নয়ন সব এখন নির্ভর করছে ডাবল ইঞ্জিন সরকারের কর্তব্য বোধের উপরে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও অগ্রাধিকার লক্ষ্য করা যায়নি। বরং নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির উলটো পথে হাঁটছে সরকার।
ক্ষুদ্র ছোট ও মাঝারি শিল্প পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে সবাই মনে করেন। কারণ, বর্তমানে রাজ্যের মোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৯ শতাংশ এই শিল্প, বড় শিল্প নেই, কবে হবে কেউ জানে না। প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গুর সহ একাধিক জায়গায় একাধিক বার এসেছেন কিন্তু বড় শিল্প নিয়ে কোনও কথা বলেননি। ঢাক ঢোল পিটিয়ে সিঙ্গুর গিয়েছিলেন কিন্তু উন্মুখ মানুষদের হতাশ করেছেন।
             আলোচ্য শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও রপ্তানিতে লক্ষণীয় অবদান রাখে। এ রাজ্যে এইসব ইউনিটের সংখা প্রায় ৮৯ লক্ষ, কর্মসংস্থান প্রায় ১.৩৬ কোটি। তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই মাইক্রো বা অতি ক্ষুদ্র। প্রধান শিল্প ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে তাঁতশিল্প, চামড়া, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, হালকা প্রকৌশল, হস্তশিল্প, টেরাকোটা, চা, আইটি ও পরিষেবা। ভৌগোলিক সুবিধাও আছে যেমন কলকাতা ও হলদিয়া বন্দর যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করা যায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার এই বঙ্গ। আর সবচেয়ে বড় কথা এখানে কম খরচে আজো দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যায়। অসুবিধাও প্রচুর যেমন, উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা এবং সুলভে প্রয়োজনীয় সময়মতো ঋণ সংগ্রহ করা।
এবারে বাজেট পেশ করে অর্থ মন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, টেক্সটাইল সহ এই শিল্পের উন্নয়নে মোট ১৮১৪.৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী যদি কাজ হয় তাতেও এই বরাদ্দ মোটেও পর্যাপ্ত নয় কারণ তাঁর নিজের হিসাবে এই শিল্পের সংখ্যা ৯৩ লক্ষ। এই সাহায্য আসলে ছিটেফোঁটা। বড় শিল্প যদি আসত, তা এইসব শিল্পে কার্যকরী প্রেরণার উৎস হয়ে উঠত। কিন্তু নব্য বিজেপি শিল্প মন্ত্রী অনেক বাগাড়ম্বর ও লম্ফঝম্ফ করলেও আজ পর্যন্ত কোনও আশার আলো দেখাতে পারেননি। তবে বলছেন তিনি টাটার হাতে পায়ে ধরবেন। কিন্তু এইভাবে কাউকে এনে বিনিয়োগে রাজি করানো যায় কি? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একযোগে উনি এবং ওনার বিজেপি নেতারা যেভাবে টাটার প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া কারখানাটি ধ্বংস করেছেন সেই চরম ক্ষতি কি কেউ ভুলতে পারে? এই অপকর্মের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন পশ্চিমবঙ্গের জনগণ ও শিল্পপতিদের কাছে ওদের সকলের ক্ষমা চাওয়া।
একথাও বলতে হচ্ছে যে বড় শিল্প না হলে রাজ্যের এবং আলোচ্য সেক্টরের বিশেষ উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। মুখ্যমন্ত্রীর হাবভাব দেখে মনে হয় যে উনি শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন দমন করে শিল্পপতিদের পজিটিভ বার্তা দিয়ে তাদের রাজ্যে আনবেন।  টাটা কোম্পানি বিশাল বিনিয়োগ করবে। উনি ভুলে গেছেন যে কারখানায় শ্রমিক আন্দোলন কখনো বন্ধ করে শিল্পে উৎসাহ বাড়ানো যায় না। কোনও গণতান্ত্রিক দেশে শ্রমিকদের আন্দোলন বা মানুষের গণতান্ত্রিক আন্দোলন সরকারের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয় না। কিন্তু বিজেপি সরকার এখানে ভয় ও সন্ত্রাসের আবহ তৈরি করে মনে করছেন যে এটা বড় বড় শিল্পপতিদের আকৃষ্ট করবে। যত দ্রুত এই ধরনের ব্যবস্থা দূর হয়, শিল্প ও রাজ্যবাসীর তত‌ই মঙ্গল হবে।
নির্বাচনের সময় বিজেপি নেতারা বলেন যে, শিল্পায়ন ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হলো কেন্দ্র ও রাজ্যে এক‌ই দলের সরকার যাকে ওরা আখ্যায়িত করেন ডাবল ইঞ্জিন সরকার বলে। কিন্তু দক্ষিণ ভারতের রাজ্য যেমন কর্নাটক, কেরল, তেলেঙ্গানা তামিলনাড়ু বা মহারাষ্ট্রে ডাবল ইঞ্জিন সরকার আসার আগেই শিল্পায়নে উন্নতি হলো কি করে? একথা অনস্বীকার্য যে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা পেলে রাজ্যগুলোর সুবিধা হয় এবং বহু যুগ ধরে কেন্দ্র এই রাজ্যের সঙ্গে বিমাতৃসুলভ ব্যবহার করে এসেছে, বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করেছে। এবারে সেই রাজনৈতিক কারণে বৈষম্যের অবসান হবে। ভালো কথা। কিন্তু সরকার চাইলেই কি শিল্পায়ন হয়?
মোটের ওপর, তৃণমূলের রাজত্বে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প উৎপাদন মোটামুটি একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। কোনও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। সম্প্রতি সিএজি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তা থেকে জানা গেছে যে রাজ্যের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নির্মিত নোডাল এজেন্সিগুলোর অ্যাকাউন্টে ২০২৪-২৫ অর্থ বর্ষের শেষে রয়েছে ৮২৯৬ কোটি টাকা। নানা বিভাগের বেশ কিছু খাতে বাজেট বরাদ্দের পরেও বাড়তি টাকা বরাদ্দ করেছিল রাজ্য, অথচ খরচ হয়নি বাজেট বরাদ্দ। সিএজি মন্তব্য করেছেন যে, এতে আর্থিক পরিকল্পনার অদক্ষতা ও টাকা খরচের ক্ষমতা, দুটো বিষয়েই সন্দেহ জাগে।
তেমনি, রাজস্বে ঘাটতি (৩৯৭২৭ কোটি টাকা), রাজকোষ ঘাটতি (৬৪৪৮৮ কোটি টাকা) এবং রাজ্যের ঋণের বোঝা (৭.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা) উদ্বেগজনক। ২০২৪-২৫ অর্থ বর্ষে যেখানে বিজিপি রাজ্য ওডিশা প্রায় ৪-৫ শতাংশ স্থায়ী ও উৎপাদনশীল সম্পদ তৈরিতে ব্যয় করেছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ করেছে ১.১৯ শতাংশ। এই রিপোর্টে বিগত তৃণমূল সরকারের কাজ কর্মের করুণ ব্যর্থতা তুলে ধরা হয়েছে। এই সবকিছু বুঝে নিয়ে নতুন সরকারকে কাজে নামতে হবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু সরকার সে পথে হাঁটছে কি?
বিগত ১৫ বছরে দেশের শিল্প ক্ষেত্রের পুঁজিতে পশ্চিমবঙ্গের অবদান বদলায়নি, মোটামুটি ৪ শতাংশের সামান্য নিচে ঘোরাফেরা করেছে। আগেই বলা হয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প - মানচিত্রের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি সাইজের শিল্প। বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা দুই কম। বড় বিনিয়োগ না এলে কম আয়ের সমস্যা মেটে না। বড় বিনিয়োগের সঙ্গে আসে অনুসারী শিল্প, নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের বর্ধিত চাহিদা। ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তারাও তার সুবিধা পান। একমাত্র তখন‌ই তাদের আয় বৃদ্ধি হতে পারে। বামফ্রন্টের সময়ে বড় শিল্প আনার আন্তরিক প্রচেষ্টাকে তৃণমূল, বিজেপি ও নানা অপশক্তি একযোগে প্রতিহত করে দেয়। এরপর তৃণমূলের সরকার কোনও বড় শিল্প আনতে পারেনি। বিনিয়োগ আর্থিক উৎসাহ দেওয়ার বদলে বছর বছর শুধু বিজনেস সামিট করা হয়েছে যাতে কোনও লাভ হয়নি। বিনিয়োগ আকর্ষণে তৃণমূল সরকারের কোনও আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল না। খেলা মেলা আর অনুদানের নীতি নিয়ে চলে রাজ্যকে বিভিন্ন দিক থেকে নিচে নামানো হলো।
বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে গেলে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক উৎসাহ দিতেই হবে, সামাজিক প্রকল্পগুলো চালু রাখতে হবে। প্রশ্ন হলঃ এই অর্থ আসবে কোত্থেকে? এর উৎস হতে পারে প্রথমত, আটকে রাখা টাকা মিটিয়ে দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত অর্থ নিয়ে রাজ্যের কোষাগারে রাখা। ন‌ইলে আর ডাবল ইঞ্জিন সরকারের কি মাহাত্ম্য র‌ইলো! কিন্তু বর্তমানে যা চলছে তা শিল্পায়ন বা উন্নয়ন— কোনটাই ন‌য়, গরিব মানুষ আরও বিপদে পড়ছে। অভিযান চলছে দিকে দিকে গরিব মানুষ ও হকারদের উচ্ছেদ যার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে দৈত্যকায় বুলডোজার।
তৃণমূলের মতোই এ রাজ্যে বিজেপি সরকার পরিচয় ভিত্তিক ও জনমোহিনী রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেয় সেটা আখেরে সুফল দেবে কিনা সন্দেহ। সম্পদ ও আয়— ক্রমশ‌ই জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থানের প্রধান ভরকেন্দ্র অসংগঠিত ক্ষেত্র হ‌ওয়া সত্ত্বেও সেই ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিকরা চাকরির নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পেনশনের মতো মৌলিক সুরক্ষা পায় না। সেটা নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার প্রথম থেকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হুমকি দিচ্ছে যা উন্নয়নের পক্ষে কখনো ভালো হতে পারে না।  উন্নয়ন করতে গেলে সমাজকে ভয় মুক্ত করতে হবে, সব পক্ষের সহযোগিতা আহ্বান করতে হবে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। তবেই তো রাজ্যের অগ্রগতি হবে। কিন্তু বিজেপি সরকার সেপথে হাঁটছে কি? বরং বলা যায় বিপরীত পথে চলছে নতুন সরকার।
 

Comments :0

Login to leave a comment