FIFA WORLD CUP SEMI-FINAL

স্পেনের শিল্পের স্পর্শে থামল ফ্রান্স — বিশ্বকাপ ফাইনালে ‘লা রোহা’

খেলা বিশ্বকাপ ২০২৬

ফুটবল শুধু গোলের খেলা নয়, ফুটবল সৌন্দর্যেরও খেলা। আর সেই সৌন্দর্যের সবচেয়ে নিখুঁত প্রদর্শনীই যেন দেখা গেল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। শক্তিশালী ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠলো স্পেন। কিন্তু এই জয়কে শুধু স্কোরলাইনে বিচার করলে ভুল হবে। এটি ছিল বলের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত ছোট ছোট পাস, অবস্থানগত বুদ্ধিমত্তা এবং দলগত সমন্বয়ের এক অনবদ্য ফুটবল-প্রদর্শনী। আর স্পেনের এই খেলার কারণেই ১৬ বছর পর ফাইনালে তারা।
পুরো বিশ্বকাপ জুড়েই স্পেন নিজেদের আলাদা করে তুলেছে তাদের শৈল্পিক ফুটবলের জন্য। প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার জন্য অকারণ তাড়াহুড়ো নয়, বরং ধৈর্য ধরে বল নিজেদের দখলে রাখা, একের পর এক নিখুঁত পাসে রক্ষণভাগকে ভেঙে ফেলা এবং সুযোগ তৈরি করাই ছিল তাদের মূল অস্ত্র। ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নরা এই বিশ্বকাপে প্রমাণ করেছে। আধুনিক ফুটবলেও নান্দনিকতা এবং কার্যকারিতা একসঙ্গেই সম্ভব। তাদের প্রতিটি আক্রমণ যেন ছিল যত্নে আঁকা একটি ছবির মতো।
সেমিফাইনালেও সেই একই ছন্দ দেখা গেল। শুরু থেকেই স্পেন বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে ফ্রান্সকে ছুটিয়েছে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে কিংবা মাইকেল অলিসের মতো তারকাদের কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ এবং মিডফিল্ড। ফ্রান্সের আক্রমণভাগ ম্যাচের বেশিরভাগ সময়ই নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পায়নি।
স্পেনের জয়ের ভিত গড়ে দেন মিকেল ওয়ারজাবাল। লামিন ইয়ামালের ওপর হওয়া ফাউল থেকে পাওয়া পেনাল্টি নিখুঁতভাবে জালে জড়িয়ে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। দ্বিতীয়ার্ধে পেদ্রো পোরোর গোল ম্যাচের ভাগ্য কার্যত নির্ধারণ করে দেয়। তবে গোলদাতাদের বাইরে থেকেও ম্যাচের অন্যতম বড় নায়ক ছিলেন লামিন ইয়ামাল। তার গতি, ড্রিবলিং এবং একের পর এক সৃজনশীল দৌড় ফরাসি রক্ষণকে সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্ত রেখেছিল। একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হলেও, পুরো ম্যাচে তিনিই ছিলেন স্পেনের আক্রমণের প্রধান চালিকাশক্তি।
মিডফিল্ডে দানি ওলমো আবারও দেখিয়ে দিলেন কেন তিনি এই দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার। তার পাস, খেলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এবং আক্রমণ তৈরির দক্ষতা স্পেনকে বারবার এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। পোরোর গোলেও তার বুদ্ধিদীপ্ত ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে রক্ষণে মার্ক কুকুরেয়া এবং তার সতীর্থরা এতটাই শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিলেন যে ফ্রান্সের তারকা আক্রমণভাগ খুব কম সুযোগই তৈরি করতে পেরেছে।
এই বিশ্বকাপে স্পেনের সাফল্যের বড় কারণ শুধু তারকা ফুটবলারদের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য নয়, বরং পুরো দলের সমন্বিত ফুটবল। একজনের ভুল আরেকজন ঢেকে দিয়েছেন, একজনের দৌড় অন্যজনের জন্য জায়গা তৈরি করেছে। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই তা পুনরুদ্ধারের যে তীব্র মানসিকতা, সেটিও স্পেনকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই স্পেন একের পর এক প্রতিপক্ষকে নিজেদের ফুটবল-দর্শনের সামনে অসহায় করে তুলেছে। নকআউটে অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে দেওয়া, পর্তুগালকে হারানো, কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে নিয়ন্ত্রিত জয় এবং শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে পরাস্ত করা প্রতিটি ম্যাচেই তারা নিজেদের পরিচয় অটুট রেখেছে। ফলের জন্য ফুটবল নয়, বরং ফুটবল খেলেই ফল আদায় করার যে দর্শন, সেটিই স্পেনকে আজ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পেন যেন আবার মনে করিয়ে দিল, সুন্দর ফুটবল কখনও পুরোনো হয় না। টিকি-তাকার আধুনিক রূপ, তরুণ ও অভিজ্ঞদের অসাধারণ মিশেল এবং নিখুঁত দলগত বোঝাপড়া নিয়ে ‘লা রোহা’ এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার আর মাত্র এক ধাপ দূরে।

Comments :0

Login to leave a comment